নাজমুল হুদা।।
দারুল উলুম মাদানীনগরের সাবেক প্রবীণ উস্তাদ মাওলানা আব্দুল আউয়াল রহ. ও ব্যক্তিগত মুরব্বি মুফতি নূর মোহাম্মদ হাফি.-এর অনুপ্রেরণায় পুণ্যভূমি মক্কায় পা রেখেছি সেই কবে।এরপর বাইতুল্লাহর ছায়া আর এভূমির আলো-বাতাসে কেটে গেল কত বেলা, স্মৃতির ডায়রিতে সঞ্চিত হল কত ভালবাসার গদ্য।
হারামে যাবো, হাঁটবো হারামের পথে, এখন না একটু পর যাবো, হারামে আছি, হারাম হতে আরো পরে যাবো। আজকে হারামে ভিড় কম না বেশি? এসবের দোলাচলে টিকটিক করে পেড়িয়ে গেল সময়।
কখনো একাকী, কখনো কারো সঙ্গ নিয়ে, আবার কখনো দলবেঁধে জুমার নামাজে অংশগ্রহণের আনন্দ অন্য কোন কিছুতে পাইনি আমি। কিন্তু পাঁচ জুমা পার হতে চললো, কাবার পথ এখনো বন্ধ। আজ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হারামের পথে চলা হয় না। প্রশস্ত এ পথটিতে যেন আজ এক সংকোচিত ভাব তৈরি হয়েছে।
একবার পবিত্র এ গৃহ-প্রেমের সুরমা যে মেখেছে, অন্য সব সৌন্দর্য তার কাছে ফিকে হতে বাধ্য। এই ঘরের নান্দনিক ও শৈল্পিক রূপ, সৌন্দর্যমন্ডিত গিলাফ প্রেমিক হৃদয়কে করে মুগ্ধ-অভিভূত। অবাক দৃষ্টি ফেলে কাবার দর্শন পিয়াসু নয়ন বারবার তাকিয়ে দেখে কালো গিলাফের মোহিত করা সৌন্দর্য।
একত্ববাদের চেতনায় বলীয়ান কাবা প্রেমিদের পূণ্যভূমি এ প্রাঙ্গণ। দেহের দুয়ারে নয়, প্রতিটি মুমীনের আত্মার গভীরের সাথে এই কাবার সম্পর্ক। কিন্তু এসবের চর্চা হতে আজ কতোদিন হলো আল্লাহর প্রেমিকদের শূন্যতায় ছেয়ে আছে।
মাঝে মাঝে কিছু ব্যথা নিয়ে, নানা আবদার-চাওয়া নিয়ে বাইতুল্লাহর সামনে নিজেকে আবিষ্কার করলে ভেতরে ভাবের এক তরঙ্গ সৃষ্টি হতো, আমি উদ্বেলিত হতাম , ভাবের সে তরঙ্গ দোলায় আমি আন্দোলিত হতাম। এই দুয়ারে মাঝে মাঝে গিয়ে দাঁড়ালে নিজেকে কেমন যেন অসহায় লাগতো- এই পূণ্যভূমি থেকে যোজন যোজন দূরের অতি সাধারণ পরিবারের এক ছেলে কাবার প্রতিবেশী হয়ে থাকার সৌভাগ্যের কথা ভাবতেই দরবারে ইলাহীতে কৃতজ্ঞতার সেজদায় নুয়ে যেতাম।
সত্যিই, এ কাবা দর্শনে যে অনুভব তৈরি হয়, তা যেন মনের সুপ্ত বাসনার কাঙ্ক্ষিত প্রকাশ। মক্কাতো প্রিয়তমের ‘প্রেম-নগরী’। বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করে, হজরে আসওয়াদে চুমু খেয়ে আত্মা যে প্রশান্তি লাভ করে, তা আর কোথায় পাবো! ভেতরটা তৃপ্ত করে দেয় যমযম, কতো দিন হলো সিক্ত হইনা নবী ইসমাঈলের ভালবাসার আবেশ মাখা যমযমে।
মাঝে মাঝে উমরাহর ইহরাম বেঁধে যখন তাওয়াফে নামতাম, নানা রং-বর্ণের ভীড়ে নিমেষেই মিশে যেতাম।সবাই যেন চাইছে আল্লাহর রঙে নিজেকে রাঙাতে। তাওয়াফের সেই ঘূর্ণিতে হৃদয়ের সরোবরে সুখ তরঙ্গ যেন উথলে উঠতো, কৃতজ্ঞতার অশ্রু যেন মুক্তো-দানা হয়ে ঝরতো।
আজ কতোদিন হলো হারামের এসব অদৃশ্য মুগ্ধকর বিষয় অনুভব করি না! চিত্ত কিভাবে আনন্দে হিল্লোলিত হয়! মুগ্ধ ও অভিভূত হয়। ইহরামের শুভ্র পোশাকের দৃশ্যের অবতারণা যে কতো অপূর্ব, আরো মনোমুগ্ধকর। অনুভবকারী মাত্রই ধরতে পারবেন।
বাইতুল্লাহয় প্রবেশ করা মাত্রই সবটুকু জুড়ে যেন আশার ছায়া, সবার হৃদয়ে আনন্দের জোয়ার । তালবীয়া পাঠে ‘আল্লাহ’ ধ্বনি ছেড়ে সবাই যেন নিজেদের স্নাত করছে। এরূপ আনন্দোচ্ছাসে মাঝে মাঝে আমার হৃদয় আকাশে রংধনুর যে অপরূপ চিত্র ধারণ করেছিলো, তা কীভাবে বুঝাবো আমি। এতো সেই স্থান, যেখানে মুছে যায় সাদা-কালোর তফাৎ। থাকে না আভিজাত্য ও সাধারণ্যের ফারাক। এ কাবাগৃহ পুরো মুসলিম জাতির ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার একক কেন্দ্র। প্রশান্ত চিত্তে ,ভাবগম্ভীর কন্ঠে দোয়া পাঠের সে দৃশ্য কতোদিন হলো দেখি না। লজ্জা, অনুশোচনা ও ক্ষমাপ্রাপ্তির কৃতজ্ঞতাভারে আল্লাহর বান্দাদের অবনত মস্তকের সে চিত্র দেখি না কতো বেলা হলো।
আল্লাহর দরবারে শোকর ও রোনাজারির সূর মূর্চনা – বিনয় কাতর সুমধুর প্রার্থনা। কালো গিলাফের সেই মোহিনীয় রূপ যে দেখেছে, সেই মুগ্ধ হয়েছে। মুমিনের প্রেমতপ্ত হৃদয় শান্ত শীতল হয়েছে কাবার দর্শনে, এই ঘরের ছায়া গ্রহণে। আজ সেই দৃশ্যের অবতারণা কিসে যেন আটকে আছে! ব্যস্ততম শহরে আজ নীরবতা বিরাজ করছে। জাগ্রত নগরীর এই নিস্তব্ধতায় ভেতরটা হাহাকার করে। আজ এই কাবা প্রাঙ্গণে এক শব্দহীন ছায়া বিরাজ করছে। স্তব্ধ হয়ে আছে পৃথিবীর প্রাণকেন্দ্র।
করোনাভাইরাসের ঘনঘটা কেটে আবার সেই সুসময় ফিরে আসুক, নূরাণী এই পরিবেশের আলোছায়ায় এসে সবার ভেতরটা আলোয় ভরে উঠুক। সবার এই আপন ঘর যেন কাছে এসে আরো আপন করে নিতে পারে, খুব দ্রুতই যেন এ পরিস্থিতির অবসান ঘটে। প্রেমনগরীর এ মক্কা যেন তার প্রেমপিয়াসীদের বরণ করে নেয়। অবদমিত এ মিলনের বাসনা শীঘ্রই পূরণ হবে রবের কাছে ভগ্ন হৃদয়ের এই কামনা।
লেখক:শিক্ষার্থী: উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় সৌদী আরব।
















