
তারিক মুজিব ।।
১. কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে একজন বয়স্ক বাবার মৃতদেহ পড়ে আছে। গায়ে হাসপাতাল থেকে দেওয়া আকাশী রঙের পোষাক। মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা অতিবাহিত হয়ে গেলেও লাশের পাশে কাউকে যেতে দেখা যাচ্ছে না। পরে জানা গেলো হতভাগ্য বাবাটির করোনা শনাক্ত হয়েছে। তাই কেউ ধারে কাছে ঘেষছে না।

সন্তানরা কোনোমতে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েই দায়িত্ব সেরে ফেলেছে। জানা গেছে, সন্তানকে বাবার লাশ পারিবারিকভাবে দাফন করবে কি না জানতে চাইলে তারা সরাসরি না করে দিয়েছিলো। অবশ্য ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের জন্য নির্দয় সন্তানরা বাবার ডেট সার্টিফিকিট ঠিকই নিয়ে গিয়েছিলো করোনা চিকিৎসার হাসপাতাল কুয়েত মৈত্রীতে এসে।
২. স্কুলে পড়ুয়া ছেলেটির করোনা হয়ে গেছে। ডাক্তাররা ঢাকা মেডিকেল থেকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। যাতায়াতের জন্য এম্বুলেন্স ঠিক করা হয়েছে। ওয়ার্ড থেকে এম্বুলেন্সে তোলার পথটুকু স্ট্রেচারে করে অতিক্রম করতে হবে। ধরতে বারণ করে দিয়েছেন ডাক্তারেরা।

কিন্তু স্ট্রেচারটা ঠেলে বা ধরে এম্বুলেন্স পর্যন্ত নেওয়ার জন্য দীর্ঘক্ষণ ডেকেও একজন লোক পেলেন না হতভাগা বাবাটি। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই করোনা আক্রান্ত সন্তানকে পরম মমতাই কোলে তুলে নিলেন। এত দ্রুত কলিজার টুকরো ছেলেকে মরে যেতে দিতে চান না তিনি। এম্বুলেন্সে করে দ্রুত নিয়ে যেতে কুয়েত মৈত্রীতে।
৩. ফরাসী বার্তা সংস্থা এএফপি জানাচ্ছে, এ ঘটনাটি আলেজেরিয়ার। পরিবারের সদস্য মা এবং প্রতিবন্ধী পূর্ণবয়স্ক যুবক। স্থানীয় একটি বস্তিতে তাদের বসবাস। বস্তিতে একজনের করোনা রিপোর্ট পজেটিভ এসেছে। তাই সকলে নিরাপত্তার জন্য বসতি ত্যাগ করছে। সবার তাড়াহুড়ো।

কিন্তু তেইশ বছরের প্রতিবন্ধী যুবকটি তো হাঁটতে পারে না। সে কীভাবে বস্তি ত্যাগ করবে? এবার পূর্ণবয়স্ক প্রতিবন্ধী ছেলেকে কাঁধে তুলে নিলেন আলজেরীয় মা টি। আদরের সন্তানকে কাঁধে বহন করেই তিনি নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে বের হয়েছেন।

৪. এবারের ঘটনা কুমিল্লায়। মায়ের ক’দিন হলো জ্বর, ঠাণ্ডা। সন্তানদের সন্দেহ, হয়তো করোনা হয়েছে মায়ের। তাই ছেলেরা মিলে মাকে একটি বনে নিয়ে বললো, মা, তুমি এই বনে এক রাত থাকো। কাল এসে তোমাকে নিয়ে যাব’—এ কথা বলে ৫০ বছর বয়সী মাকে শাল-গজারির বনে ফেলে যান তার সন্তানেরা।পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় তাকে ঢাকায় পাঠানো হয় এবং করোনা পরীক্ষা করলে রিপোর্টে নেগেটিভ আসে।
উপরের চারটি ছবিই বর্তমান করোনা পরিস্থিতির। সবগুলো ছবিই মোটামুটি পর্যায়ে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। দু’টি ছবি গভীর বিষাদময় অনুভূতির কথা জানায় আমাদের। আর সন্তানের প্রতি বাবা মায়ের অকৃত্রিম ভালবাসা প্রকাশকারী দু’টি ছবি আমাদেরকে গর্বিত করে।
সামগ্রীকভাবে এটা বর্তমান সময়ের স্বাভাবিক চিত্র। বিপরিতও আছে। অর্থাৎ সমাজের সকল সন্তানই জন্মদানকারী বাবা মায়ের প্রতি অবজ্ঞা বা উদাসীনতা দেখায় না। এ সংখ্যাটাই বরং বেশি। তবে এক দুইটি ছবিও আমাদের করোনায় বিধ্বস্ত অন্তরকে বিদীর্ণ করে।
কুরআনে যেখানে বাবা মায়ের প্রতি ‘উঁহু’ শব্দ উচ্চারণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে এবং পিতামাতার হককে আল্লাহর হকের পরেই স্থান দেওয়া হয়েছে, সেখানে পিতামাতার সাথে এমন নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা আমাদের অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে। আমাদেরকে লজ্জিত করে।
বিপরিতে বাবাদের অবদান দেখুন। এবং মায়েদের কুরবানী। হাতের স্পর্শে যেখানে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে সেখানে কত অবলীলায় একজন বয়স্ক বাবা পরম মমতায় নিজের সন্তানকে কোলে তুলে নিলেন। আর মায়ের ছবিটি! রীতিমতো ভড়কে যাওয়ার মতোই। পূর্ণবয়স্ক একজন ছেলেকে কাঁধে বহন করে নিয়ে যাওয়া! এভাবে পরম আদরের সন্তানকে কাঁধে করে আলজেরীয় নারীটি কত কিলো হেঁটে গিয়েছিলেন; এএফপি তার রিপোর্টে সেটি প্রকাশ করেনি। তবে ছবির আলজেরীয় মা কে আমাদের অনেকদিন মনে থাকবে। অনেকদিন পরে ইতিহাসের কোনো পাঠক যখন করোনাকালীন শ্রেষ্ঠ কিছু ছবির হদিস করতে যাবে, এই ছবিটি তাকে নিশ্চিত আন্দোলিদ করবে।
সন্তানের প্রতি বাবা মায়ের স্নেহ, ভালবাসা চিরায়ত। তবে প্রথম দুইটি ছবিতে সাধারণ মানুষের আচরণও যথেষ্ট অমানবিক।
সাধারণ মানুষের এত অমানবিক হওয়াটা হৃদয়বিদারক। বিপদ তো সবারই হতে পারে। সবারই হয়। সবারই কখনো না কখনো অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। আজ আমি আরেকজনের সাহায্যে এগিয়ে না গেলে কাল তো আমার সাহায্যেও কেউ আসার হিম্মত করবে না। আর যারা অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসে আল্লাহ তাদের সাথে থাকেন।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম তো হাদিসে এরশাদ করেছেন, আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার সাহায্য করেন যতক্ষণ বান্দা অন্যের সাহায্যে এগিয়ে যায়।















