তারিক মুজিব ।।
রমযান কুরআন নাযিলের মাস। বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াতের মাস। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযানে প্রচুর কুরআন তিলাওয়াত করতেন। প্রতি রমযানেই জীবরীল আলাইহিস সালামের সাথে কুরআনের দাওর পড়তেন। রমযানে কুরআন তিলাওয়াতের অন্যতম একটি উপলক্ষ তারাবী। নানা কারণেই যাদের পক্ষে বেশি তিলাওয়াত করা সম্ভব না তাদের জন্য তারাবীতে কুরআন তিলাওয়াত শুনার ব্যবস্থা বাড়তি নেয়ামত।
রমযানে শহরে-গ্রামে বিশ্বব্যাপীই মসজিদে মসজিদে কুরআনের খতম হয়। ইসলামের প্রাথমিক যামানা থেকে অধ্যাবধি এ সিলসিলা। ইমাম আবু হানিফা রহ. প্রতিরাতে তারাবীতে একবার কুরআন খতম করতেন। ইমাম শাফেয়ী রহ.-এর ব্যাপারেও এমন ঘটনা বর্ণিত আছে। ইমাম আসওয়াদ রহ. তারাবীতে প্রতি তিনদিনে একবার কুরআন খতম করতেন। সুফয়ান ইবনে উয়াইনাহ রহ. প্রতি দশদিনে একবার খতম করতেন। ছোট ছোট জামাতে তিনদিনে, দশদিনে কুরআন খতম হতে বর্তমান সময়েও শহরের কোথাও কোথাও দেখা যেত।
কিন্তু এ বছরের চিত্র ভিন্ন। করোনা সবকিছু পরিবর্তন করে দিয়েছে। দৈনন্দিন জীবনের স্থবিরতার মতো করোনা মানুষের ইবাদতের চিত্রও পাল্টে দিয়েছে। বিশ্বজুড়েই আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় ইবাদতগুলোতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে।
মাতাফে তাওয়াফকারীদের ভীড় নেই। কা’বা চত্বরে উমরা পালনকারীদের চলাচল নেই। মসজিদে নববীতে রোযাদারদের ইফতারের দস্তরখানে মেহমান বানাতে মদীনার শিশুদের হাকডাক নেই। সারাদিনের রোযার ক্লান্তি ঘোচাতে ইফতারের পর তারাবীতে শরিক হতে বিশ্ব মুসলিমের যে আবেগ, উচ্ছ্বাস; চলতি করোনার বছরে তা অনুপস্থিত। তার স্থলে জায়গা করে নিয়েছে, হাহাকার, কাতরতা।
ইসলামের চৌদ্দশত বছরের ইতিহাসে এটাই প্রথম রমযান যে বছর বিশ্বের কোথাও মসজিদে মসজিদে ব্যাপক আকারে তারাবীর জামাত হচ্ছে না। মক্কা থেকে মালয়, কায়রো থেকে কাশগড় সর্বত্রই একই চিত্র। সবাই সবাইকে ঘরে থাকার অনুরোধ করে। পত্রিকা খুললেই চোঁখে পড়ে_ ‘ঘরে থাকুন’। আরবি অনলাইন পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞাপনের মতো সাঁটিয়ে রাখা হয়েছে- ‘আবকু বুয়ূতাকুম’। ইংরেজিতে স্ট্যা হোম।
পত্রিকা মারফত জানা গেলো, সরকারি অনুমতিক্রমে নানা স্বস্থ্যবিধি এবং সীমাবদ্ধতা মেনে শুধুমাত্র আফ্রিকার দেশ মালি এবং উপমহাদেশের পাকিস্তানের মসজিদগুলোতে তুলনামূলক বড় আকারের জামাত হচ্ছে। হারামাইন- বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ যেখানে রমযান কাটানো এবং তারাবীর সালাতে অংশ নিতে যায়; করোনার কারণে এবছর সেখানেও উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। হারামাইনে শুধুমাত্র কর্তৃপক্ষ, খাদেম এবং আর কিছু নির্দিষ্ট লোকের উপস্থিতিতে এ বছরের তারাবী অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ইসলামের প্রাথমিক সময়ের কিবলা এবং হারামাইনের পর সবচেয়ে মর্যাদাবান মসজিদ-কুদসেও এ বছরের তারাবীতে জৌলুস নেই। মসজিদুল আকসায় মাত্র তিনজনে তারাবীর জামাত পড়ছেন বলে জানা গেছে। অন্য বছরগুলোতে দখলদার সন্ত্রাসবাদী ইয়াহুদি সেনাদের নিপীড়নও নিবেদিতপ্রাণ ফিলিস্তিনিদের আবেগ, জযবা ও উচ্ছ্বাসে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া বা তুরস্ক কিংবা মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলো এবং অমুসলিম দেশের মুসলিম কমিউনিটি কোথাও এবছর সরকারিভাবে তারাবীর বড় জামাতের অনুমতি প্রদান করা হয়নি। রমযানের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারাবীর বরকতময় জামাতে উপস্থিত হতে না পেরে স্বভাবতই মুমিন হৃদয় বিষণ্ন।
তবে হতাশার মাঝেও আশার খবর হলো, করোনায় লকডাউনের মধ্যেও মানুষ রমযান বরকতময় সময় হেলায় কাটাচ্ছে না। জরিপে দেখা গেছে বিশ্বব্যাপীই মুসলমানের এ বছরের রমযান কাটছে আরও বেশি ইবাদতে, নিমগ্নতায়। বাড়িতে বাড়িতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে তারাবীর জামাত। কুরআনের খতম।
হাফেজে কুরআন- তারবীতে কুরআন তিলাওয়াত যাদের নিয়মিত চর্চার অংশ; চলতি করোনার বছরেও তারা কুরআনের খতম পড়া বাদ দেননি। একটি জরিপে দেখা গেছে, ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশেই ১০ লাখের বেশি তারাবীর জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশের এ বছরের তারাবি পরিস্থিতি এমন হলে বৈশ্বিক চিত্রটি সহজেয় অনুমেয়।
এবছর রমযানের মুখরিত পরিবেশ নেই তবে কুরআনের সুমধুর সুর এবার গুঞ্জরিত হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি মহল্লা, গলিতে। এটাই বিষাদের মাঝে তৃপ্তির প্রাপ্তি।
















