সন্তানের মনন বিকাশ ও ধর্মের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টিতে মায়ের ভূমিকা

 উবায়দুল্লাহ তাসনিম।।

আজ আন্তর্জাতিক মা দিবস। এ দিন বিভিন্ন দেশে মায়ের প্রতি বিশেষ সম্মান ও ভালোবসা প্রদর্শ করে (যদিও আলাদা সম্মান ও ভালোবাসা দেখানোর কোন মানে হয় না, ইসলাম তো মাকে সবসময়ই সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করতে অনুপ্রাণিত করেছে) দিবসটি উদযাপন করা হয়৷ এ দিবসটি ১৯১৪ সালে মার্কিন কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালিত হয়ে আসছে। সে হিসেবে আজ মা দিবস।

প্রাচীন গ্রিসে মা দিবসের প্রচলন থাকলেও আধুনিককালে এ দিবসের প্রবর্তন করেন ‘অ্যানা জার্ভিস’ নামে এক মার্কিন নারী। ১৯১৪ সালে ৮ মে মার্কিন কংগ্রেস প্রতি মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী এ দিবসটি উদযাপন করা হয়। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও এ দিনটি পালন করা হয়।

আদর্শ সন্তান গঠনে মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। প্রত্যেক মা-ই সন্তানের জন্য একটা আদর্শের ক্ষেত্র। আদর্শ সন্তান গড়ার পিছনে মায়ের ভূমিকার কোন জুড়ি নেই।

আদর্শ সন্তান গঠনে মায়ের ভূমিকা : সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মানে পারিপার্শ্বিকতার বিশেষ একটা প্রভাব থাকে। পারিপার্শ্বিক অবস্থা যেরকম হয়, সন্তানের ভবিষ্যৎও তেমনি গড়ে উঠে। এক্ষেত্রে সবচে’ বেশি ভূমিকা মা-বাবার। হাদিসে এসেছে, প্রত্যেক নবজাতকই ফিতরাতের (ইসলাম গ্রহণের যোগ্যতা, মানসিকতা ইত্যাদি) উপর জন্ম গ্রহণ করে। পরে, তার মা-বাবা তাকে ইহুদি বা অগ্নিপূজক বানায়। আদর্শ সন্তান ও পরিবার গঠনে মায়ের রয়েছে বিশাল দায়িত্ব। মাকে তার পরিবারের এই দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হতে হবে।

রাসূল সা ইরশাদ করেছেন, ‘নারী নিজ স্বামীর পরিবার পরিজন ও সন্তানদের দায়িত্বশীল, তাদের (অধিকার আদায়ের) ব্যাপারে তাকে কৈফিয়ত দিতে হবে।'(বুখারি, কিতাবুল আহকাম) অন্য হাদিসে এসেছে, তোমাদের প্রত্যেকেই যিম্মাদার এবং প্রত্যেককে তার যিম্মাদারী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। পুরুষ তার পরিবারের যিম্মাদার, কিয়ামতের দিন তাকে তার যিম্মাদারি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। স্ত্রী স্বামীর গৃহের যিম্মাদার, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে৷ (বুখারি,৮৪৪ মুসলিম,৩৪০৮, তিরমিযি, ১৬২৭, আবু দাউদ, ২৫৩৯ আহমদ, ৪৯২০)

এই আবশ্যকীয় দায়িত্ব শুধু সন্তান লালন-পালনেই আদায় হয় না। এর সঙ্গে সন্তানের তালিম ও তরবিয়তও অপরিহার্য। না হয় ‘ শুধু লালন-পালন’ এটা অন্য আর দশটা প্রাণীর মতোই হবে। মায়ের কাছে সন্তানের অধিকার হচ্ছে, (লালন-পালনের সাথে সাথে) সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া এবং দ্বীনের পথে সন্তানের মনন বিকাশে ধর্মের প্রতি তার সন্তানের অনুরাগ সৃষ্টি করা। কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘ পরিবারের মানুষদের নামাযের আদেশ দাও এবং নিজে তাতে যত্নবান থাকো। (তোয়াহা,১৩২)

নবীগন যেভাবে পরিবার গঠন করেছেন: আম্বিয়া আ. নিজের পরিবারের লোকদেরকে দ্বীনি বিষয়ে তা’লিম দিতেন।ঈসমাইল আ. এর ঘটনা প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে, নিজের পরিবারের লোকজনকে নামায ও যাকাতের আদেশ করতেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘সে (ঈসমাইল আ) নিজ পরিবার -পরিজনকে সালাত ও যাকাত আদায়ের হুকুম করত।’ (মারইয়াম, ৫৫)

ইয়াকুব আঃ এর ইন্তিকালের সময় নিকটবর্তী হলে তিনি পরিবার সদস্যদের ডেকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমরা আমার মৃত্যুর পর কার ইবাদত করবে? তারা বলল, আমরা ইবাদত করবো আপনার ইলাহের, আপন পিতৃপুরুষ ইবরাহিম, ইসমাঈল ও ইসহাকের ইলাহের, যিনি একই ইলাহ এবং আমরা তার নিকট আত্মসমর্পনকারী।(সূরা বাকারা, ১৩৩) এখানে তিনি দুনিয়াবী বিষয়, খাওয়া-দাওয়া, রোজগার, বসবাস ইত্যাদির কথা বলেননি। জীবনের শেষ মহূর্তেও তিনি আল্লাহর পথেরই তা’লিম দিয়েছেন।

সন্তানের দীক্ষা ও ধর্মের প্রতি মনন বিকাশে একজন মায়ের কেমন ভূমিকা থাকা চাই, তা আমরা মরিয়ম আঃ এর ঘটনা থেকে শিখতে পারি। সেকালের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তিনি নিজের গর্ভস্থ সন্তানের ব্যাপারে মান্নত করোছিলেন, তিনি তাকে বায়তুল মুকাদ্দাসের খাদেম বানাবেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘ইমরানের স্ত্রী যখন বলল, হে আমার পালনকর্তা, আমার গর্ভে যা রয়েছে, আমি তা তোমার নামে উৎসর্গ করলাম সবার কাছে থেকে মুক্ত রেখে।’ (আল ইমরান ৩৫) এখানে মরিয়ম আ এর মা খেতমতের মাধ্যমে ধর্মীয় কাজে মনন বিকাশের চেষ্টা করেছেন।

সন্তানকে শিক্ষাদানের কিছু মূলনীতি: সাত বছর বয়সে সন্তানকে নামাযের হুকুম প্রদান করা। দশ বছর হলে প্রয়োজনে শাসন করা। এবং এসময় তার বিছানা পৃথক করে দেওয়া। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে সাত বছর বয়সকালে নামাযের আদেশ দাও। আর যখন দশ বছর হয়ে যাবে, তখন নামাযের জন্য তাদের মারো৷ আর তাদের বিছানা থেকে পৃথক করে দাও। (সুনানে আবু দাউদ, ৪১৭ মুসনাদে আহমদ, ৬৪২০)

কোন প্রয়োজনেও মিথ্যার আশ্রয় না নেওয়া। কারণ, মিথ্যায় প্রথমত নিজের গোনাহ হবে। এছাড়া মিথ্যার মাধ্যমে সন্তানের সঠিক মনন বিকাশ নষ্ট হয়। সে মিথ্যা থেকে মিথ্যাই শিখবে। হাদিসে আছে, এক মহিলা তার শিশুকে কোলে নেওয়ার জন্য ডাকছিল। কিন্তু শিশুটি কাছে আসতে না চাওয়ায় শেষে মা তাকে বলল, এসো, আমি তোমাকে একটা জিনিস দেবো। তখন বাচ্চাটি দৌড়ে আসল। বিষয়টা নবীজি সা এর নজরে পড়লে সেই মাকে বলেছিলেন, সত্যিই কি তোমার কিছু দেওয়ার নিয়ত ছিল? উত্তরে সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার হাতে খেজুর ছিল, সেটাই তাকে দিতে চাইছিলাম। তিনি বলেন, তবে তো ঠিক আছে। কিন্তু দেওয়ার নিয়ত না থাকলে এটা তোমার জন্য মিথ্যা হতো এবং তোমার গোনাহ হয়ে যেতো৷(আবু দাউদ, ৪৩৩৯, মুসনাদে আহমদ, ১৫১৪৭)

নবীজি সা যেভাবে শিশুদের শিক্ষা দিয়েছেন: আবু হুরায়রা রা থেকে বর্ণিত, একবার আলী রা এর পুত্র হাসান রা (শৈশবে) সদকার খেজুর থেকে একটা খেজুর মুখে পুড়ে নিলেন। তা দেখে নবীজি বললেন, ‘কাখ কাখ'( আরবরা ঘৃণা জাগানোর জন্য এ শব্দটা ব্যবহার করে থাকে, আমরা যেমন ছিঃ ছিঃ বলি) অর্থাৎ এটা ফেলে দাও। তুমি কি জাননা, আমরা অর্থাৎ বনু হাশেম সদকা খাই না? (বুখারি, ১৩৯৬, মুসলিম, ১৭৭৮)মুসনাদে আহমদ, ১৬২৯, সুনানে দারিমি, ১৫৮৫) অথচ হাসান কেমন আদরের পাত্র ছিলেন। মসজিদে নববীতে নবীজি সা খুতবা দিচ্ছিলেন। মসজিদে ছোট্ট হাসান রা ঢুকলে তিনি তাকে কোলে তুলে নেন। কখনো এমন হতো, তিনি নামায পড়ছেন, ওদিকে হাসান রা ঘাড়ে চড়ে বসেছেন। নবীজি সা সিজদায় যাওয়ার সময় তাকে আস্তে করে নামিয়ে দিতেন। আর এই নাতিকে তিনি আগ্রহ নিয়ে মুখে দেওয়ার পর ছোট্ট একটা খাবার ফেলে দিতে বললেন! এ হাদিসে ইঙ্গিত রয়েছে, যে, ছোট ছোট জিনিশ থেকেই শিশু-সন্তানের তরবিয়ত শুরু এবং তা আদর্শ সন্তান গঠনের জন্য জরুরী।

রাসূল সা এর সৎপুত্র আবু হাফস আমর ইবনে আবু সালামা ( আব্দুল্লাহ ইবনে আবুল আসাদ) বর্ণণা করেন, শৈশবে আমি যখন রাসূল সা এর প্রতিপালনাধীন ছিলাম, তখন একদিন আমি তার সাথে খাচ্ছিলাম। আমার হাত পাত্র ঘুরাঘুরি করছিল। অর্থাৎ কখনো এপাশ কখনো ওপাশ থেকে লোকমা তুলে নিজের পছন্দমতো খাবার নিচ্ছিলাম। তা দেখে তিনি বললেন, খোকা! খাবারের সময় বিসমিল্লাহ প্রথমে পড়বে। তারপর ডান হাত দিয়ে খাবে।এবং পাত্রের যে অংশ তোমার সামনে, সেখান থেকেই খাবে।(সহিহুল বুখারি, ৪৯৫৭,সহিহ মুসলিম, ৩৭৬৭, সুনানে ইবনে মাজাহ, ৩২৫৮) তো, এখানেও একই কথা। ছোট থেকে ছোট বিষয়ের প্রতি নবীজি সা খেয়াল রাখতেন। এবং ছোট্ট ছোট্ট বিষয়েও নবীজি সা শিশুদের তা’লিম দিতেন৷

সন্তানের তরবিয়তের আশ্চর্যজনক ঘটনা: শায়খুল হাদিস যাকারিয়া রহ. আপবীতিতে (আত্মজীবনী) লিখেন, শৈশবে আমার ছোট একটা বালিশ ছিল। এটা ছিল আমার খুবই প্রিয়। একদিন আব্বাজান একটু শোবার জন্য বালিশটা তলব করলেন। আমি বলছিলাম, আব্বা, আমার বালিশটি নিন। আমার বালিশ বলাতে আব্বা প্রচন্ড রাগ করে আমার গালে চড় বসালেন। তিনি লিখেন, তখন আমার খুব খারাপ লাগছিল। আমার এতো প্রিয় একটা বালিশ এতো সুন্দর করে দিয়েও মার খেলাম! কিন্তু এখন এর ফায়দা বুঝছি। আমার পিতা কতো সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমাকে গড়ে তোলার টেষ্টা করেছিলেন। বস্তুত এর মাধ্যমে আমার মন-মানসিকতার বিরাট পরিবর্তন হয়। তো, বুঝা গেলো, সন্তানের তরবিয়তে এ জাতীয় ছোট্ট ছোট্ট জিনিস লক্ষ্য রাখা চাই।

লেখক : শিক্ষার্থী

পূর্ববর্তি সংবাদ১২ মে থেকে দেশে ফিরবেন কুয়েত প্রবাসীরা
পরবর্তি সংবাদদক্ষিণ কোরিয়ায় শিথিলতার পর আবার কঠোরতা: বাড়ছে সংক্রমণ