ইসলাম টাইমস প্রতিবেদন: রমযানের শেষে ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে গরীব মুসলমানদেরকে সাদাকাতুল ফিতর, -যাকে যাকাতুল ফিতরও বলা হয়, দেওয়ার যে বিধান রয়েছে, এটা কি হাদিসে উল্লেখিত দ্রব্য বা পণ্যের মাধ্যমে দেওয়া জরুরি? নাকি হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী পণ্যগুলোর মূল্য দিয়েও আদায় করা যেতে পারে? এ প্রশ্নের জবাবে মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার রঈস মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ বলেন, সদকাতুল ফিতর পরিমাণ মতো মূল্য পরিশোধ করলে গরিব মুসলমানের প্রতি অধিকতর সুবিধা প্রদান করা হয়। সদকাতুল ফিতরের প্রাপক তো গরিব মুসলমানরা। তাদের ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজন থাকতে পারে। বেশিরভাগ সময় প্রয়োজনটা ভিন্নই থাকে। এজন্যই নির্দিষ্ট পণ্যের পরিবর্তে সমপরিমাণ নগদ অর্থ দিলে তারা তাদের প্রয়োজন সহজে পূরণ করতে পারে। এতে সদকাতুল ফিতরের উদ্দেশ্য সুন্দরভাবে পূরণ হয়।
সদকাতুল ফিতরের পণ্য এবং গরীব মুসলমানের প্রয়োজনের ভিন্নতার কথা স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, সদকাতুল ফিতরের হাদিসে উল্লেখিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে পনির, কিসমিস, গম, যব ও খেজুর। এখন এদেশে কোনো গরিব মুসলমানকে সদকাতুল ফিতর হিসেবে ৩ কেজির উপরে পনির অথবা কিশমিশ দেওয়া হল, অথচ তার বেশি দরকার চিনি, চাল, ডাল, তেল, সেমাই ইত্যাদি পণ্য। এ পর্যায়ে ওই পনির ও কিসমিস দিয়ে তিনি কী করতে পারবেন? এর পরিবর্তে সমপরিমাণ নগদ অর্থ দিলে তিনি কিন্তু তার প্রয়োজনীয় জিনিসটা বাজার থেকে কিনে নিতে পারবেন।
আর পনির, কিসমিস, খেজুর, যব, গম-এইসব পণ্য দিলে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োজন পূরণে অনেক ক্ষেত্রে তার কোনো কাজেই লাগবে না। বিশেষত পনির, কিসমিস এবং উন্নত খেজুর তার খানা বা প্রয়োজন পূরণের আয়োজনে কোনো ভূমিকাই রাখবে না। এর জন্য সবচেয়ে উপকারী হচ্ছে, সদকাতুল ফিতরের জন্য হাদীস শরীফে বর্ণিত দ্রব্য বা পণ্যের সম পরিমাণ নগদ অর্থ গরিব মানুষের হাতে দিয়ে দেওয়া। এতে তার প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি কেনাকাটা করে ফেলতে পারবেন।
মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার ফিকহ বিভাগীয় প্রধান মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আরো বলেন, হাদীস শরীফে সদকাতুল ফিতরের দুদিক থেকে দুটি উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। একটি হলো, ‘তুহরাতুন লিসসায়েম’। রোযাকে অশ্লীল ও অর্থহীন কথা-কাজের অনিষ্ট থেকে পবিত্র করা। এটা রোযাদারের জন্য। অপর উদ্দেশ্যটি হলো, ‘তু’মাতুন লিল মাসাকীন’ মিসকিনদের খাবারের ব্যবস্থা করা। এটা গরিব মুসলমানের জন্য। তো এই গরীব মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করাটা হচ্ছে, গরিবদের জন্য সদকাতুল ফিতর- এর মূল উদ্দেশ্য। হাদীসে বর্ণিত নির্দিষ্ট পণ্যই দিতে হবে এটা মুখ্য নয়। বরং নির্দিষ্ট পণ্যের সমপরিমাণ নগদ অর্থ দিয়ে তাদের খাদ্যের প্রয়োজন পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। এতেই তাদের স্বার্থ ও সুবিধা সর্বোচ্চভাবে রক্ষা করা যায়।
তিনি বলেন, সদকাতুল ফিতরের দাতার সংখ্যা, দানের পরিমাণ এবং গ্রহীতা গরিবের প্রতি লক্ষ্য করলে এ বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হয়। কোনো পরিবারের প্রধানের ওপর যদি সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হয়, মাসআলা হলো, তাকে তার নিজের পক্ষ থেকেও যেমন, তেমনি তার পরিবারের সব সদস্যের পক্ষ থেকেও সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। এরমধ্যে তার নাবালেগ সন্তানরাও রয়েছে।
তিনি বলেন, এর অন্যতম দর্শন এটা যে, সচ্ছল একটি পরিবারের পক্ষ থেকে গরিব আরেকটি পরিবারের খাদ্যের ব্যবস্থা যেন হয়ে যায়। এখানেও গরিবের খাদ্যের আয়োজনে সহযোগিতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। নগদ অর্থ দিলে গরিবের খাদ্য সহায়তার আয়োজনটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়, নির্ধারিত পণ্য দিলে সেটা হয় না। হাদীসের মাকসাদও সেটা নয়, বরং ওই পরিমাণমতো নগদ অর্থ দান করলে সেটা সম্ভব হয়। বিষয়টি বোঝার জন্য আরেকটি উদাহরণ হলো, যাকাতের নেসাব সাব্যস্ত করতে স্বর্ণ কিংবা রুপার একটি পরিমাণ নির্ধারিত আছে। ওই পরিমাণ অথবা তার চেয়ে বেশি পরিমাণ স্বর্ণ কিংবা রুপা যার মালিকানায় থাকবে, তার যাকাত দিতে হবে। কিন্তু কোনো ফকীহ একথা বলেন না যে, তাকে ওই স্বর্ণ কিংবা রুপার অংশ থেকে বের করেই যাকাত দিতে হবে, বরং সবাই বলেন, হাতে থাকা সম্পদের অনুপাত অনুযায়ী নগদ অর্থ ইত্যাদি দিয়ে যাকাত আদায় করলেই আদায় হয়ে যাবে। এ থেকেও বোঝা যায়, সদকাতুল ফিতরের প্রদেয় বিষয়ের ক্ষেত্রেও একই রকম আমল করা যাবে।
মাসিক আলকাউসার সম্পাদক বলেন, কোনো কোনো আরব দেশের কিছু কিছু জায়গায় হাদিসে বর্ণিত সদকাতুল ফিতরের নির্দিষ্ট দ্রব্য বা পণ্য গম, যব ইত্যাদি স্থানীয় ইমাম সাহেবের কাছে রেখে আসতে দেখা যায়, যা পরে কোনো কাজে লাগে না। এর চেয়ে সুন্দর হলো, রমজানের শেষে ঈদের সময় গরিব মানুষ যেন তার সুবিধা মতো খাতে খরচ করতে পারে এজন্য তাকে সদকাতুল ফিতরের পণ্যের পরিমাণ অর্থ তুলে দেওয়া। নগদ অর্থে সদকাতুল ফিতর আদায় করা বেশি উপযোগী, গরীবের সুবিধার জন্য বেশি সামঞ্জস্যশীল।
















