পতিত জমি নিয়ে ইসলামের দিকনির্দেশনা কী

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: বাংলাদেশে চাষ না করে কৃষি জমি ফেলে রাখলে সরকার নিয়ে নেবে এমর্মে  সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারীর একটি খবর কয়েকদিন আগে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে।   খবরের ভেতরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি চিঠি পাঠিয়েছেন, যাতে বলা  হয়েছে, “…যে সমস্ত ভূমি মালিকগন তাদের জমি অনাবাদী/পতিত ফেলে রাখছেন বা রেখেছেন তাদের জমি ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ত আইনের ৯২ ধারা মোতাবেক ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত করার আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো: আসলাম হোসেন বলছেন, তাদের মূল বিষয় হলো প্রত্যেকটি জায়গা যেন আবাদের আওতায় চলে আসে। মানুষের জমি কেড়ে নেয়া সরকারের উদ্দেশ্য না, উদ্দেশ্য হলো প্রত্যেকটি জমি যেন ফসলের আওতায় চলে আসে। কারণ এ মূহুর্তে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সরকারের পতিত জমি কাজে লাগানোর  এই মনোভাব অবশ্যই  প্রশংসনীয়। সরকারের একটি  প্রধান দায়িত্ব খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।  বলা বাহুল্য, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষিযোগ্য কাজে লাগানোর বিকল্প নেই। তাই ইসলাম কৃষির উপর যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছ।

ইসলাম কী বলে

ইতিহাসের কোনো বর্ণনামতে মানবকুলের আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালামকে পৃথিবীতে প্রেরণের পর আল্লাহ তাআলা এক জোড়া ষাড় পাঠিয়ে দিয়েছেন এবং ফেরেশতার মাধ্যমে চাষাবাদের পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন। সে প্রথম মানব থেকেই খাদ্য-উৎপাদনের পেছনে মানুষ কসরত করে আসছে যুগে যুগে।

আলকুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ বিভিন্নভাবে বহু জায়গায় খাদ্য-শস্য উৎপাদন ও কৃষির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন। কখনো নিজের কুদরত প্রকাশের জন্য, কখনো নিজ নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য, কখনো সম্ভাব্য খাদ্যসংকট মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা প্রসঙ্গে, আবার কোনো কোনো স্থানে উদাহরণ ও উপমা হিসাবে এসেছে খাদ্য ও কৃষিপণ্য উৎপাদনের কথা। পূর্ববর্তী উম্মতের বিভিন্ন কাহিনী বর্ণনায়ও উঠে এসেছে কৃষি প্রসঙ্গ। এভাবেই সৃষ্টিকর্তা তাঁর শ্রেষ্ঠ মাখলুককে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্যের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন।

আর হাদীসের কিতাবসমূহে তো বেশ কয়েকটি পরিচ্ছেদই রয়েছে খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিবিষয়ক। ইহয়াউল মাওয়াত, আলমুযারাআ, আলমুসাকাত, আশশিরব প্রভৃতি পরিচ্ছেদে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এবিষয়ক নির্দেশনাসমূহ বর্ণিত হয়েছে এবং পরবর্তী যুগে মুজতাহিদ-ফকীহগণ বিশাল বিশাল ভলিউম লিখে গেছেন খাদ্য-শস্য তথা কৃষি পণ্য উৎপাদন ও বণ্টন ইত্যাদির নীতিমালার উপর। এখানে শুধু নমুনাস্বরূপ কয়েকটি মৌলিক নীতি ও নির্দেশনার কথা তুলে ধরা হচ্ছে।

 

[১] সকল উর্বর জমিতে ফসল করতে হবে

ইসলামের দৃষ্টিতে সকল উর্বর জমি চাষের আওতায় নিয়ে আসা চাই। জমির মালিক যেই হোক তা যেন অনাবাদ না থাকে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘‘তোমাদের যার জমি আছে সে যেন তাতে চাষাবাদ করে, যদি নিজে না করতে চায় তবে যেন অন্য ভাইকে জমিটি চাষ করার জন্য দান করে দেয়।’’

এটি ইসলামের আখলাকি তথা নৈতিক নির্দেশনা। তবে বিশেষ প্রয়োজনে ইসলামী রাষ্ট্র অস্থায়ীভাবে এমন আপদকালীন আইনও করতে পারে, যাতে করে ফসল উৎপাদনে অনাগ্রহী জমির মালিক আগ্রহী কৃষকদেরকে তা বিনিময় ছাড়া ধার দেয়। এভাবে সকল উর্বর জমিকে চাষের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশনা প্রদান করেছে ইসলাম।

 

[২] অনুর্বর জমিকে উর্বর করা

শুধু উর্বর জমিতে ফসল করার নির্দেশনা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি ইসলাম। বরং মরুভূমি এবং অন্যান্য অনুর্বর জমিকে সেঁচের মাধ্যমে চাষের আওতায় নিয়ে আসার এক অপূর্ব ও যুগান্তকারী ঘোষণাও প্রদান করেছেন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি কোনো মৃত [অনুর্বর] জমিকে জীবিত করবে সেটির মালিক হবে সে নিজে।’’ অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বা পরিত্যাক্ত সম্পত্তি কেউ স্ব-উদ্যোগে আবাদ করে ফসলের উপযুক্ত করলে এর মালিকানা-স্বত্ব সে ভোগ করবে। এমনটি করতে হলে সরকারের পূর্বঅনুমোদন নেওয়া লাগবে কিনা-এ ব্যাপারে মুজাতাহিদীনে কেরামের দু’টি মত রয়েছে। তবে বিষয়টি সকল মাজহাবে স্বীকৃত। ফিকহ ও হাদীসে বিষয়টি ‘ইহয়াউল মাওয়াত’ নামে প্রসিদ্ধ। যার অর্থ হচ্ছে, ‘মৃতদের জীবিত করা।’ এভাবেই ইসলাম সকল খালি ভূমিকে ফসল উৎপাদনের আওতায় এনে খাদ্যসংকট থেকে বাঁচার পথ দেখিয়েছে। সমগ্র বিশ্বে যত জমি খালি পড়ে আছে সেগুলোর কিছু অংশও যদি এভাবে উর্বর করে তাতে খাদ্য উৎপাদন করা হয় তবে সহজেই বর্তমান সংকট দূর করা সম্ভব।

 

[৩] ভূমিহীনদের ভূমি বরাদ্দ দান

হাদীস ও সীরাতের কিতাবসমূহে একটি অধ্যায় রয়েছে ‘আলইক্তা’ নামে। যার অর্থ জমি বরাদ্দ দান। দেশের পরিত্যক্ত ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সরকারের প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমিগুলো ভূমিহীনদের মাঝে বরাদ্দ দেওয়ার বিধান রয়েছে ইসলামে। বর্তমানে দেখা যায় ‘তেলা মাথায় তেল দেওয়া’র অবস্থা কার্যকর। অর্থাৎ সরকারি জমি বরাদ্দ পেয়ে থাকেন প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ। প্রান্তিক কৃষকগণ তার আশাও করতে পারে না। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে তারাই এ ব্যাপারে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। আর তাদের হাতে জমি গেলেই সেটিতে ফসল উৎপাদিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সরকার ইচ্ছা করলে চাষাবাদ করার শর্তেই তা ওদেরকে দিতে পারে।

 

ইসলামের বিভিন্ন দিকনির্দেশনার আলোকে বিশ্বব্যাপী খাদ্য-সংকট দূরীভূত করার জন্য যা যা করা দরকার তা হল-

* শুধু শিল্পের প্রসার নয়, সাথে সাথে কৃষির প্রবৃদ্ধির উপরও নজর দিতে হবে।

* আমাদের মত দরিদ্র দেশে কৃষিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। সময়মত যেন কৃষকরা সার, বীজ পায় এবং সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ পায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

* দেশের সকল উপযুক্ত জমিকে কৃষির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

* কৃষি জমিতে প্রয়োজনের অধিক বিশাল বিশাল বাড়ি, বাগান-বাড়ি করে কৃষি জমি নষ্ট করা বন্ধ করতে হবে।

* প্রয়োজনে কৃষকদেরকে বিনা মুনাফায় ঋণ দিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কারেন্ট একাউন্টে গচ্ছিত টাকার একটি অংশ দ্বারাও এ কাজ করা যেতে পারে।

* উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহার করে এবং গবেষণার মাধ্যমে এক ফসলি জমিকে দু’ফসলি করে উৎপাদন বাড়াতে হবে।

* মানুষের তেমন কোনো কাজে আসে না অথবা শুধুই তথাকথিত বিনোদনের কাজে আসে এমন কোনো কাজের জন্য বা এ ধরনের পণ্য তৈরির জন্য শিল্প-কারখানা করে জমি নষ্ট করা বন্ধ করতে হবে।

* জাতিসংঘ ও ডব্লিউএফসি [বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি]-এর মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বের খালি পড়ে থাকা জমিগুলোর একটি বড় অংশকে ক্রমান্বয়ে কৃষির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এভাবেই খাদ্য উৎপাদন বাড়বে এবং সংকট দূর হবে ইনশাআল্লাহ।

পূর্ববর্তি সংবাদযুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের স্পেশাল টিম থেকে একযোগে ৫৭ জন কর্মকর্তার পদত্যাগ
পরবর্তি সংবাদবগুড়ায় মসজিদের প্রবেশপথে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন আরেক হত্যা মামলার আসামী