নুরুদ্দীন তাসলিম।।
মহামারি থেকে সুরক্ষা পেতে ১৭ মার্চ বন্ধ ঘোষণা করা হয় দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কয়েক দফায় ছুটি বাড়িয়ে সর্বশেষ ৬ আগস্ট পর্যন্ত তা বাড়ানো হয়। এদিকে এই ছুটির প্রভাব পড়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করে চলা শিক্ষকদের সংসারে। মহামারি থেকে সুরক্ষায় দফায় দফায় বেড়ে চলা ছুটির কারণে বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের। নামিদামী প্রাইভেট স্কুল- কলেজগুলোতেও বর্তমানে দেখা গেছে একি চিত্র।
রাজধানীর একটি প্রাইভেট কলেজের শিক্ষক মোমিনুর রশিদ। তিনি বলছেন, সময় খুব কঠিন হচ্ছে, সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা পেতে বন্ধ রাখা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকায় সংসার চালাতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে। সত্যিই যদি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে, তবে রাজধানীর ব্যয়বহুল বাড়ি ভাড়া, সংসারের খরচ চালানো আর সম্ভব হবে না। সন্তানদের নিয়ে গ্রামে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।
তিনি বলছেন, সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বন্ধ হয়ে আছে উপার্জনের পথ, এদিকে থেমে নেই জীবনযাত্রার ব্যয়, এোবে চলতে থাকলে রাজধানীতে টিকে থাকা আর সম্ভব হবে না। তার কথায় রাজধানীতে সংসার চালাতে প্রতি মাসে যে পরিমাণ ব্যয় হয়, গ্রামে এর অর্ধেকেরও কমে স্বাচ্ছন্দ্যে কাটিয়ে দেওয়া যাবে।
এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না খোলায় অন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মতো দেশজুড়ে অনেক কওমী মাদরাসার শিক্ষককেও বর্তমানে হতে হচ্ছে আর্থিক সংকটের মুখোমুখি।
মেধাশ্রম ব্যয় করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আদর্শ সমাজ নির্মাণের প্রচেষ্টায় নিজেদের নিয়োজিত রাখেন সমাজে শিক্ষক হিসেবে পরিচিত মানুষগুলো, কিন্তু করোনার প্রভাবে দুশ্চিন্তার ছাপ পড়েছে তাদের জীবনে। শিক্ষার্থীর জীবনকে মূলবান করতে নিজের মেধাশ্রম ব্যয় করা মানুষগুলোকে এখন প্রতি মুহূর্তে ভাবাচ্ছে সামনের দিনগুলোতে পরিবারের সদস্যদের জীবনযাপন স্বাভাবিক রাখতে পারার বিষয়টি।
মহামারির প্রভাব, লকডাউন, এতো সংকটের মাঝেও অন্য সবার মতো থেমে নেই শিক্ষকদের জীবনযাত্রা, প্রতি মুহূর্তে পূরণ করতে হচ্ছে মৌলিক প্রয়োজনগুলো। তাই সাধারণের মতো বিকল্প পথ বেছে নিতে দেখা গেছে অনেক শিক্ষককেই। লজ্জা ভুলে চক ডাস্টার ছেড়ে কেউ বিক্রি করছেন মৌসুমী ফল, কেউবা আবার কৃষিতে সময় দিয়ে স্বনির্ভর হতে হাতে তুলে নিয়েছেন কোদাল, জীবিকার তাগিদে অনেকেই বেছে নিচ্ছেন অনেক হালাল পন্থা।
পেট চালানো হোক কিংবা স্বনির্ভরতা,সময়কে কাজে লাগিয়ে কৃষিসহ বিভিন্ন সম্ভবনাময় উদ্যোগ হাতে নিতে বলছেন বিশেষজ্ঞ আলেমসহ অনেকেই।
এদিকে বৃহত্তর কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া করোনাকালে বেতন বন্ধ হয়ে থাকা মাদরাসা শিক্ষদের জন্য ‘সহায়তা প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে।
বেফাকুল মাদারিসের সহ সভাপতি এবং সিলেটের গহরপুর মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু জানিয়েছেন, ডাটা কালেকশন এবং ভেরিফিকেশনে একটু বিলম্ব হয়ে গেলেও বেফাকের পক্ষ থেকে কয়েকদিনের মধ্যেই প্রয়োজনগ্রস্ত মাদরাসা শিক্ষকদের কাছে সহায়তা প্রকল্প পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
এছাড়া করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নন এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য ৪৬ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার টাকার বিশেষ অনুদান দিয়েছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ অনুদানের অধীনে দেশের ৬৪ জেলার ৮,৪৯২টি শিক্ষা স্কুল ও কলেজের ননএমপিও ৮০,৭৪৭ জন শিক্ষকের প্রত্যেকে ৫ হাজার টাকা হারে এবং ২৫,০৩৮ জন ননএমপিও কর্মচারীর প্রত্যেকে আড়াই হাজার টাকা হারে মোট ১,০৫,৭৮৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীরা পাবেন এই অনুদান। মৌলিক প্রয়োজনপূরণে এই অনুদান কতটা ভূমিকা রাখবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা গেছে অনেককে।
তবে সংক্রমণের এই দুর্যোগকালে বিকল্প পেশা বেছে নেওয়ায় কমতে পারে কিছুটা দুর্ভোগ। এছাড়া এই সময়ে আল্লাহ তায়ার উপর তাওয়াক্কুল, সরব, রোনাজারি মসৃণ করতে পারে আগামীর কন্টকাকীর্ণ পথ- এমন অভিমত-উপদেশই দিয়েছেন দেশের প্রবীণ ও বরেণ্য আলেমরা।
















