মির্যা ইশতিয়াক বেগ।।
খ্যাতিমান আলেমে দ্বীন, জামিয়া বিন্নুরিয়া আলআলামিয়া-এর মুহতামিম মুফতী মুহাম্মদ নাঈম রহ. কিছুদিন পূর্বে (২০/৬/২০২০ঈ۔) এ নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর ইন্তেকালের খবর আমার মতো লাখ লাখ মানুষকে ব্যথিত ও শোকাহত করেছে।
মুফতী মুহাম্মাদ নাঈম রহ. ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে করাচীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষদের নিবাস ছিল ভারতের গুজরাটের সুরাট অঞ্চলে। ভারত-পাকিস্তান বিভাগের পূর্বেই তার পরিবার পাকিস্তানে হিজরত করে চলে আসে। মুফতী মুহাম্মদ নাঈম প্রাথমিক দ্বীনী শিক্ষা নিজের পিতা কারী আবদুল হালীমের নিকট এবং উচ্চশিক্ষা জামিয়া উলূমিল ইসলামিয়া বিন্নুরি টাউনে অর্জন করেন। সেখান থেকে ১৯৭৯ সালে তিনি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন।
শিক্ষা সমাপনের পর ১৬ বছর পর্যন্ত তিনি জামিয়া বিন্নুরিয়াতে উস্তাদ হিসেবে খেদমত আঞ্জাম দেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তার পিতা কারী আবদুল হালীম রহ.। মুফতী মুহাম্মদ নাঈম দ্বীনী শিক্ষার পাশাপাশি করাচী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামী স্টাডিজের উপর পিএইচডির ডিগ্রিও অর্জন করেছেন। তবে তিনি ডক্টরের বদলে নিজের জন্য মুফতী নামটাই পছন্দ করতেন।
মুফতী মুহাম্মদ নাঈম ৭টি গ্রন্থের রচয়িতা এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া পাকিস্তানের মজলিসে শুরার রোকনও ছিলেন। পাকিস্তানের অন্যান্য মাদারিসের মুহাতামিমদের চেয়ে মুফতী মুহাম্মদ নাঈম ছিলেন তুলনামূলক ক্লীন ইমেজের (স্বচ্ছ ভাবমূর্তি) অধিকারী। এজন্যই তিনি মিডিয়া অঙ্গনেও সমাদৃত ছিলেন। ধর্মীয় বিষয়াদীর বাইরে সামাজিক নানা ইস্যুতেও মিডিয়ার টকশোগুলোতে তাকে আমন্ত্রণ জানাতে হত।
করাচীর সাইট এরিয়া এলাকায় ১২ হেক্টর জমিতে বিস্মৃত জামিয়া বিন্নুরিয়া আলআলমিয়া পাকিস্তানের শীর্ষ মাদরাসাগুলোর মধ্যে অন্যতম। যেখানে প্রায় ৪ হাজারের অধিক ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষাগ্রহণ ও আবাসনের সুবিধা লাভ করছে। জামিয়া বিন্নুরিয়াতে ছাত্র-ছাত্রীরা প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা থেকে শুরু করে আলেম ও আলেমা হওয়া পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন করে এবং তাদেরকে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি কম্পিউটার ও অন্যান্য আধুনিক শিক্ষাও প্রদান করা হয়। পাকিস্তান ও চীনের অর্থনৈতিক মৈত্রী হবার পর মুফতী মুহাম্মদ নাঈম তার মাদরাসায় চায়না ভাষার সহজ কোর্সের সূচনাও করেছেন।
জামিয়া বিন্নুরিয়াতে একটি বড় সংখ্যক আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, চীন, থাইল্যাণ্ড এবং আফ্রিকার দেশগুলোসহ মোট ৫২টি দেশের ছাত্র-ছাত্রীও রয়েছে। এবং এসব দেশের রাষ্ট্রদূতরা জামিয়া বিন্নুরিয়া পরিদর্শন করতে এবং মুফতী নাঈমের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে নিয়মিত যাতায়াত করত।
মুফতী মুহাম্মদ নাঈমের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ট ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ক ছিল। তার ব্যক্তিত্ব আমার জন্য ভীষণ শ্রদ্ধার পাত্র ছিল। জামিয়া বিন্নুরিয়ার অবস্থান আমার ফ্যাক্টরীর মুখোমুখি হওয়াতে অধিকাংশ জুমার নামায আমি মুফতী নাঈমের সঙ্গেই আদায় করতাম। মুফতী নাঈমের উপর একাধিকবার প্রাণঘাতি হামলা হওয়ার কারণে তার নিজের এবং তার মাদরাসায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকত। এছাড়া জুমার নামাযের সময় সাধারণত মাদরাসার চারপাশে বিভিন্ন নিরাপত্তাকর্মী সতর্ক প্রহরায় থাকতেন। কয়েকবার মানুষ আমাকে এবং আমার ভাই এখতিয়ার বেগকে মুফতী মুহাম্মদ নাঈমের সঙ্গে জুমার নামায না পড়ার পরামর্শ দিয়েছিল; কিন্তু আমরা কখনো তাতে গুরুত্ব দেইনি।
যদি আমরা কখনো সফরের কারণে মুফতী নাঈম সাহেবের সঙ্গে জুমার নামায পড়তে না পারতাম, তাহলে তিনি আমাকে ফোন করে না আসার কারণ জিজ্ঞেস করতেন। আমি প্রায়ই মুফতী নাঈমের কাছ থেকে আমার কলাম লেখা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রসঙ্গে দিকনির্দেশনা গ্রহণ করতাম। মরক্কোর ইযাযী কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে মরক্কোর বাদশাহর মুকুট পরিধানের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হওয়ার পর তিনি প্রতি বছর সেখানে অংশগ্রহণ করতেন। আর প্রায়ই আমাকে বলতেন, তিনি একসময় আমার সঙ্গে অবশ্যই মরক্কো যাবেন। মুফতী মুহাম্মদ নাঈম আমার সেবাসংস্থা ‘মেক এ উইশ পাকিস্তান’ দ্বারাও দারুণ প্রভাবিত ছিলেন।
কয়েক বছর আগে যখন ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত ১২ বছর বয়সী সীমা শাহেদ ‘মেক এ উইশ পাকিস্তানের’ কাছে নিজের জীবনের অন্তিম ইচ্ছা আলেমা হওয়ার কথা ব্যক্ত করে, তখন মুফতী নাঈম সাহেব মেয়েটির স্বপ্ন পূরণের জন্য জামিয়া বিন্নুরিয়াতে এক সংবর্ধনার আয়োজন করেন। এবং মেয়েটিকে নিজ মাদরাসায় আলেমা ছাত্রী হিসেবে ভর্তি করে তার শিক্ষার ব্যাপারে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
মুফতী মুহাম্মদ নাঈম এমন আলেমদের মধ্যে গণ্য হতেন, যাদের হাতে শতশত অমুসলিম ইসলামগ্রহণ করেছে। তাদের মধ্যে একজন অমুসলিমের ইসলামগ্রহণের ব্যাপারে আমি নিজেও সাক্ষী। বেশ কিছুদিন পূর্বে বিদেশে অবস্থানরত আমার এক আত্মীয় জনৈক অমুসলিম মেয়েকে বিয়ে করতে মেয়েটিকে নিয়ে পাকিস্তান চলে আসে। তখন আমি মুফতী নাঈম সাহেবের নিকট অনুরোধ করি, তিনি যেন মেয়েটির আগ্রহে তাকে ইসলামে দীক্ষিত করেন এবং তার বিয়ে পড়িয়ে দেন। মুফতী সাহেব তার সমস্ত ব্যস্ততা সত্ত্বেও পরদিনই এ নেক কাজের জন্য আমাদেরকে সময় দেন। এভাবে তিনি অমুসলিম মেয়েটিকে ইসলামে অন্তর্ভুক্ত করে তার নাম আয়েশা রাখেন এবং তার বিয়ে আমার সেই আত্মীয়ের সঙ্গে পড়িয়ে দেন। মুফতী মুহাম্মদ নাঈম সাহেবের কথার মধ্যে এমন প্রভাব ছিল যে, নওমুসলিম আয়শা ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পরই নামায-রোযার প্রতি পাবন্দির সাথে আমল করতে শুরু করে। সে নিয়মিত রোযা রাখত। যেদিন আমি আয়শাকে ফোন করে মুফতী নাঈম সাহেবের ওফাতের সংবাদ দেই, তখন সে জারজার হয়ে কাঁদতে থাকে।
মুফতী মুহাম্মদ নাঈমের জানাযার নামায বরেণ্য আলেমে দ্বীন মুফতী তকী উসমানী পড়িয়েছেন। আমি যখন জানাযার নামাযে শরীক হওয়ার জন্য সাইট এরিয়াতে পৌঁছি, তখন সেখানে জনতার বিশাল ভীড় লক্ষ্য করে আমি দূরে গাড়ি থামিয়ে জানাযার নামায আদায় করি। মুফতী মুহাম্মদ নাঈমের বড় সাহেবযাদা মাওলানা নোমান নাঈম- যাকে জামিয়া বিন্নুরিয়া আল-আলমিয়ার মুহতামিম করা হয়েছে- তিনি আমাকে জানালেন, তার পিতার জানাযার নামাযে দু’লাখের বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন।
মুফতী মুহাম্মদ নাঈমকে জামিয়া বিন্নুরিয়ার কবরস্থানে তার পিতার পাশে দাফন করা হয়। তিনি তার পরিবারে স্ত্রী, দু’পুত্র মাওলানা নোমান নাঈম, মাওলানা ফরহান নাঈম এবং দু’কন্যা রেখে গেছেন। মুফতী সাহেবের ইন্তেকালে আমরা একজন মহান আলেমে দ্বীন থেকে বঞ্চিত হলাম। যার শূন্যতা সর্বদা অনুভব হবে।
উর্দু ডেইলি জং থেকে ভাষান্তর: সাইফ নূর
















