স্মার্টফোনে ‘ব্যক্তিগত’ ছবি: আমাদের আরো দায়িত্বশীল হতে হবে

আবুযর গিফারী ।।

‌মৌলভীবাজা‌রের কুলাউড়া উপজেলার পৌর শহরের ৭নং ওয়ার্ডের উত্তর লস্করপুর এলাকার কলেজ ছাত্রী জরিনার (ছদ্মনাম) সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে পার্শ্ববর্তী এলাকার বিজয় (ছদ্মনাম) নামের এক যুবকের। সেই সুবাদে বিজয় তাদের ছবি ও ভিডিও তুলে রাখে মোবাইলে।

সম্প্রতি তাদের সম্পর্কের টানাপোড়ন চলছিলো। এ নিয়ে বিজয় ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। এতে আত্মসম্মান রক্ষার ভয়ে জেবিন আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এঘটনা এবং এজাতীয় ঘটনা আমাদের সমাজে এখন অহরহ ঘটছে।

বাংলাদেশের আইনে সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে বলা আছে, (এক) কোনো ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।

(দুই) কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বছর এবং অন্যূন সাত বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

বলা বাহুল্য, এই আইনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি বা অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ছড়িয়ে ভিকটিমের যে অপমান হল তা আর উদ্ধার হবে না। এবং সেটি সম্ভবও নয়।

ফেসবুকে দেইনি, মোবাইলে ধারণ করেছি, কী সমস্যা?

ফেসবুকে দেইনি, মোবাইলে ধারণ করেছি। মোবাইলে একান্ত ব্যক্তিগত ছবি ধারণে কী সমস্যা? কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন। এ বিষয়ে একজন আলেম অনলাইন একটিভিস্ট মাওলানা  আবদুল কুদ্দুস বলেছেন, হ্যাঁ, আপনার মোবাইল। আপনার ছবি। আপনি তুলতেই পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হল আপনার নিরাপত্তা নিয়ে, আপনার মানসম্মান এবং আপনার পরিবারের মানসম্মান নিয়ে।

বর্তমানে চলমান একটি হত্যা মামলা নিয়ে আলোচনায় আসা এক নারীর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তার (ওই নারী) ঝামেলায় পড়ার অন্যতম কারণ মোবাইলে বিভিন্ন ‘ব্যক্তিগত’ ছবি ধারণ করা। যারা ওই নারীর ছবি ফেসবুকে দিয়েছে তারা অবশ্যই অপরাধী। তবে এ সব ছবি মোবাইলে ধারণ করাটাকেও বোকামী বলতে হবে। কোনো অন্যায় হওয়ার পর তার প্রতিকার করার চাইতে অন্যায় হতে না দেওয়াই তো উত্তম। আগুন লাগিয়ে নেভানোর চেয়ে  আগুন লাগতে না দেওয়াই কি ভাল না? যোগ করেন আবদুল কুদ্দুস।

নারীপুরুষের বৈধ সম্পর্কের ছবি ধারণ

নারীপুরুষের অবৈধ সম্পর্ক এমনিতেই এক অন্যায়। তার উপর সেটা মোবাইলে ধারণ করা আরেক অন্যায়। অন্যায়ের সাক্ষী রাখছে অন্যায়কারী নিজেই। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, বৈধ সম্পর্ক যেখানে সেখানেও অন্তরঙ্গ মহূর্তের ছবি সংরক্ষণ করেন কেউ কেউ। কেউ আবার নিজের পরিবারের বিভিন্ন ছবি নিজের মোবাইলে সংরক্ষণ করেন।

এ নিয়ে জানতে চাইলে মাওলানা আবদুল কুদ্দুস বলেন, স্বামীস্ত্রীর সম্পর্ক এটা হালাল। বরং সওয়াবের। কিন্তু তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি তোলা, অথবা এমনিতেই নিজের পরিবারের ছবি, পারিবারিক ছবি মোবাইলে সংরক্ষণ করা এটাও অনিরাপদ।

মোবাইল ফোনের ছড়াছড়ির কারণে আজকাল অনেকে এটাকে তেমন কিছু মনে করেন না। এটা শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে কেমন সে প্রশ্ন না করেও বলা যায়-কাজটি খুবেই ঝুকিঁপূর্ণ।কারণ এখন হ্যাকারদের হাত খুবই শক্তিশালি। তারা আপনার মোবাইলে সংরক্ষিত যে কোনো জিনিস চুরি করে টাকা উপার্জন করতে পারে।

‘এমন অনেক ঘটনা আছে। নিজেদের গোপন ছবি তারা অনেক বছর পর হঠাৎ দেখেতে পান বিভিন্ন পর্ন সাইটে, অথবা সোশ্যাল মিডিয়ায়। তখন লজ্জিত হয়ে সেগুলো সরানোর ব্যবস্থা করেছেন কিন্তু ইতিমধ্যে সেগুলো দেখেছে লাখ লাখ মানুষ,’ যোগ করেন আবদুল কুদ্দুস।

তাছাড়া যদি কখনো আপনার ফোনটি চুরি হয়ে যায়, অথাব আপনি আরেকটি ফোন কিনেন তাহলে এই ফোন থেকে আপনি আপনার তথ্যগুলো ডিলিট করবেন। আপনি হয়তো মনে করেছেন, আপনি ডিলিট করে দিয়েছেন। কিন্তু বিষেজ্ঞদের মতে, ফোনে ডিলিট করা জিনিস একটা পর্যায়ে বিভিন্ন সফটওয়ারের মাধ্যমে উদ্ধার করা যায়। ডিভাইস থেকে কোনো ছবি ডিলিট করা অত সহজ নয়।

তাছাড়া স্বামী-স্ত্রীর যদি কখনো সম্পর্ক নষ্ট হয়, যার নজির অহরহ, তাহলে এই অন্তরঙ্গ ছবি আপনার জন্যে কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমন ঘটনাও আমাদের চোখের সামনে অনেক, বলেন তিনি।

ভিডিও কলে কথা বলার ক্ষেত্রে কী ধরণের সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত এ প্রসঙ্গে মাওলানা আবদুল কুদ্দুস নোমানী বলেন, অনেক মানুষ আছে যারা দূরে কারো সাথে ভিডিও কলে কথা বলেন। এক্ষেত্রেও তারা সাবধানতার পরিচয় দেন না।প্রবাসী স্বামীর সাথে ভিডিও কলে কথা বলা স্বাভাবিক। কিন্তু এক্ষেত্রেও মনে রাখা উচিত, ভিডিও কলে কখনো শালীনতা পরহার করে কথা বলা উচিত নয়। কারণ আপনার এই ভিডিও হয়তো রেকর্ড হচ্ছে আপনার অজান্তে। এক্ষেত্রে অসাবধানতাও আপনার ভবিষতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পূর্ববর্তি সংবাদসিনহা হত্যাকাণ্ড: চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা
পরবর্তি সংবাদনির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মালির বিদ্রোহী সেনারা