শোক মাতম সম্পর্কে শিয়া ইমামগণ কী বলেছেন

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহমান।।

আগামী কাল ১০ মুহাররম, আশুরার দিন। দিনটি বিভিন্ন দিক থেকে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ । এই দিনে আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও তার কওমকে নিরাপদে দরিয়া পার করে দিয়েছিলেন। আর ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়কে দরিয়ায় নিমজ্জিত করেছেন। এটি আল্লাহ তাআলার অপার কুদরতের নিদর্শন। নবীজি এই দিনে রোজা রাখতেন। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে এ দিনের রোজা ফরজ ছিল। রমজানের পর এ রোজাটি নফল হয়ে যায় তবে অন্যান্য নফলের চেয়ে এর গুরুত্ব বেশি।

৬০ হিজরীর এই দিনে হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু পরিবার ও সাথীগণকে নিয়ে মর্মান্তিকভাবে শহীদ হন। এটি তার জন্য তো অনেক মর্যাদা ও গৌরবের বিষয় যে ন্যায় ও সত্যের জন্য এরকম  তাৎপর্যপূর্ণ দিনে আল্লাহর রাস্তায় জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। আমাদের জন্য অবশ্য তা মুসিবতের দিন।

সুতরাং মুসিবতের ক্ষেত্রে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়তের যে সাধারণ শিক্ষা নির্দেশনা আছে এখানে তাই গ্রহণ করতে হবে। বরং রাসুলের সঙ্গে হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু এর সম্পর্কের দাবী হল এ ক্ষেত্রে মোহাম্মদী শরীয়তের নির্দেশনাকে অধিক গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা। তবেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং আহলে বাইতের সাথে মহব্বতের হক আদায় হবে।

কিন্তু আহলে বাইতের তথাকথিত মহব্বতের দাবিদার শিয়া সম্প্রদায় এই দিনটিকে সম্পূর্ণ মাতমের দিনে পরিণত করেছে। এই দিনে এরা মাতম করে। তাজিয়া মিছিল করে। সেখানে আহাজারি চিৎকার করা হয়। বুক চাপড়ানো মুখ চাপড়ানো হয়। কাপড় ছেঁড়া হয়। কালো কাপড় পরিধান করা হয়। কখনো কখনো শরীর রক্তাক্ত করতে দেখা যায়। ঘোড়ার উপর হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু এর প্রতিকৃতি সুসজ্জিত করে তার প্রদক্ষিণ করা হয়।

এগুলো সম্পূর্ণ জাহিলি পদ্ধতি। এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু সালামের শরীয়তের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। শুধু তাই নয়, খোদ আহলে বাইতের নেক ব্যক্তিবর্গের শিক্ষারও বিরোধী। শিয়াদের নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলোতে তাদের ইমামদের থেকে এর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাদের কিতাবগুলোতে এর নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে বেশ কিছু হাদিসও রয়েছে। ওইসব বক্তব্য এবং হাদিস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, শোক মাতম তাজিয় মিছিল এগুলো তাদের নিকটেও অত্যন্ত গর্হিত কর্ম।

শিয়ারা  প্রথম ইমাম হিসাবে মানে আলী র.কে। হযরত আলী রহ. বলেছেন, আমি তোমাদেরকে পাঁচটি জিনিসের অসিয়ত করছি। এগুলোর জন্য যদি বহু দূর সফর করা হয় তাও কম।… এর মধ্যে পঞ্চমটি হল, তোমরা সবরকে আকঁড়ে ধর। সবর ঈমানের জন্য তেমন দেহের জন্য মাথা যেমন। মাথাবিহীন দেহ যেমন মূল্যহীন, তেমনি সবরবিহীন ঈমানের মূল্য নেই। নাহজুল বালাগা পৃ.৪৮২

শিয়ারা ৪র্থ  ইমাম হিসাবে মানে আলী ইবনে হুসাইন যাইনুল আবেদীন রহ. কে। তিনি বলেন, আল্লাহর আনুগত্যের মূল হল সবর ও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি। যে পসন্দ অপসন্দ সব বিষয়ে সবর করবে আল্লাহ তার জন্যে কল্যাণের ফায়সালা করবেন। উসুলুল কাফি ২/ ৪৯-৫০

 

শিয়াদের বিখ্যাত গ্রন্থ উসূলুল কাফিতে আছে, আমর ইবনে নুহাইক থেকে বর্ণিত আবু আবদুল্লাহ বলেন,  আল্লাহ বলেছেন, আমি আমার মুমিন বান্দার জন্য যা কিছু করি তা তার কল্যাণের জন্য করি। সুতরাং সে যেন আমার ফায়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকে।  আমি যে বিপদ দেই তাতে সবর করে। আমার নেয়ামতের শোকর আদায় করে। হে মুহাম্মদ, আমি তাকে সিদ্দীকিনদের মধ্যে লিপিবদ্ধ করব। – উসুলুল কাফি২/৫০-৫১

শিয়াদের আরেক বিখ্যাত কিতাব ফুরুউল কাফিতে আছে,  জাবির থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু জাফরকে জিজ্ঞেস করলাম, অধৈর্য কি? তিনি বললেন, ভয়াবহ অধৈর্য হল, হায় হুতাশ করা, চিৎকার করা। মুখ ও বুক চাপড়ানো। কপালের চুল ছেড়া। যে মাতম আসর করল সে সবর পরিহার করল। এবং ভিন্ন পথ ধরল। আর যে ইন্নলিল্লাহ পড়ল, সে আল্লাহর ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট হয়ে গেল। আল্লাহর যিম্মায় তার পুরস্কার নিশ্চিত হয়ে গেল। আর যে অধৈর্য হল  তাকদিরের লেখনি তার কাছে অবশ্যই আসবে। তবে সে নিন্দিত হল এবং আল্লাহ তাকে প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করবেন।

শিয়াদের দাবি মতে তাদের অষ্টম ইমাম  আলী ইবনে মূসা। তিনি বলেছেন, মুসিবতের সময় হাত উরুর উপর মারা বস্তুত নিজের প্রতিদানকে নষ্ট করা।

বিহারুল আনওয়ারে ইমাম জাফর সাদেক অসিয়ত করে বলেছেন, আমার মৃত্যুর পর যেন আমার জন্য মুখ চাপড়ানো না হয়। কাপড় ছেড়া না হয়। যে কাপড়া ছিড়বে তার জন্য জাহান্নাম।

ইমাম জাফর সাদেক আরো বলেন, সে অভিশপ্ত যে অন্যের মুসিবতে নিজের চাদর খুলে ফেলে। (মান লা ইয়াহদুরুহুল ফকীহ ৭৯-৭১)

আলী র. বলেছেন, জাহিলিয়াতের ৩টি কাজ মানুষ কেয়ামত পর্যন্ত করবে। ১. নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা। বংশ নিয়ে তুহমত দেয়া। মৃতের জন্য বিলাপ করা।

শিয়াদে তাফসীর গ্রন্থ কুম্মীতে (৩/১০৬৫) আছে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের থেকে এ মর্মে বাইআত গ্রহণ করেছেন যে, তারা মুখ খামচাবে না। গালে চাপড় মারবে না। চুল ছিড়বে না। কাপড় ছিড়বে না। এবং কালো করবে না।  হায় হুতাশ করবে না।

কারবালার ময়দানে মর্মান্তিক ঘটনার আগে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। তা শুনে যাইনাব বিনতে আলী (হুসাইন র. এর বোন) কাঁদতে শুরু করলেন। তখন হুসাইন র. বললেন, তুমি আল্লাহকে ভয় কর এবং তার বিধান মোতাবেক তাযিয়া কর।

তিনি আরো বলেন, হে আমার প্রিয় বোন, আমি তোমাকে কসম করে বলছি, তুমি তা রক্ষা কর। তুমি আমার জন্য কাপড় ছিড়বে না। চেহারা চাপড়াবে না। হায় হুতাশ করবে না। যদিও আমি শহীদ হয়ে যাই। ইলামুল ওয়ারা বি আলামিল হুদা১/৪৫৭

হযরত আলী র. যখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গোসল করাচ্ছিলেন, তখন বলেছিলেন, আমার পিতামাতা আপনার উপর কোরবান হোক। আপনার মৃত্যুতে যা বন্ধ হয়ে গেল তা আর কারো মৃত্যুতে বন্ধ হয়নি। আপনার মৃত্যুতে অহী, নবুয়ত, আসমানি সংবাদ বন্ধ হয়ে গেল। আপনি যদি সবরের আদেশ না করতেন এবং অধৈর্য হওয়া থেকে নিষেধ না করতেন তাহলে আমার কান্নায় অশ্রুর বন্যা বয়ে যেত। আমার ব্যাধি হত। দু:খ লেগেই থাকত। তাও আপনাকে হারানোর তুলনায় কম। নাহজুল বালাগা পৃ.৩৫৫

বেদাআত এর নিন্দা বিষয়ে শিয়াদের নির্ভরযোগ্য কিতাবে কঠিন কঠিন বক্তব্য রয়েছে। যদি শিয়া বন্ধুগণ সেগুলো অনুসরণ করেও মাতম-তাজিয়া পালন থেকে ফিরে আসতেন!

লেখক: শিক্ষক, গবেষক আলেম, প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তি সংবাদ“সৌদিসহ উপসাগরীয় দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক করতে মুখিয়ে আছে”
পরবর্তি সংবাদসাভারে বহুতল ভবনে সেফটি ছাড়াই কাজ, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শ্রমিকের মৃত্যু