শায়খ সুদাইসের কাছে মুসলিম উম্মাহর কী প্রত্যাশা ছিল

ড. মুহাম্মদ আল মিসফার।।

আজ থেকে ৩৮ বছর আগের কথা। আবদুর রহমান সুদাইস যখন প্রথম মসজিদুল হারামের ইমাম হন তখন তিনি অল্প সময়ের মধ্যে মানুষের ভালোবাসা লাভে সক্ষম হন। তার কুরআন তিলাওয়াত বিশেষত শেষ রাতে হারামের নামাজে তার তেলাওয়াত যে কোনো শ্রোতাকেই মু্গ্ধ করে। তার তিলাওয়াতের রেকর্ড আরব বিশ্ব ছাড়িয়ে গোটা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। রমজানে যখন তিনি বিতরের নামাজে সুমধুর কণ্ঠে দুআয়ে কুনুত পড়েন, তখন মুসল্লিদের জারজার হয়ে কাঁদতে দেখা যায়। তিনি তার শুক্রবারের খোতবাগুলোতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ফিলিস্তিনকে ইহুদিদের দখল মুক্ত করতে উম্মাহর শক্তি বৃদ্ধি করে এই হারানো ভূখণ্ডকে পুনরায় তার আসল মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার আহবান জানাতেন।

২০১৪ সালে রমযানের কথা। তখন গাজায় ইহুদিদের হামলা হলে মসজিদে নামাজে শায়খ সুদাইস দোয়া করেছিলেন। তার দোয়ার ভাষা ছিল এরকম- হে আল্লাহ, আমাদের মুসলিম ভাইয়েরা ব্যথায় জর্জরিত। তাদেরকে বিজয় দান করুন ফিলিস্তিনে। আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে আপনার মহত্ত ও বড়ত্বের উসিলা দিয়ে ভিক্ষা চাইছি। আপনার মহান নাম ও গুণাবলির মাধ্যমে প্রার্থনা করছি। আপনি দখলদার ইহুদিদের থেকে মসজিদুল আকসাকে রক্ষা করুন। আল্লাহ, মৃত্যুর আগে আমাদেরকে মসজিদুল আকসায় নামাজ পড়ার তাওফীক দান করুন।

ওই বছর তিনি এক জুমার খোতবায় বলেছিলেন, আমাদের মধ্যে এমন লোকও আছে যারা এখনো ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার স্বপ্নে বিভোর। তারা জিহাদকে পরিত্যগ করছে। জিহাদকে তারা বলে বিদ্রোহ, বিশৃংঙ্খলা। তারা মূলত বোকার স্বর্গে বাস করছে। মুসলিম জাতির পবিত্রতা বলতে তাদের কাছে কিছুই নেই। মুসলিম জাতির দুর্দশা তাদের মনে কোনো কিছুর উর্দ্রেক করে না।  তারা অন্যান্য সেক্যুলারদের মত আল আকসা মসজিদকে আর দশটা বিল্ডিংয়ের মত মনে করে। এসকল লোকের ঘুম কবে ভাঙ্গবে? মরীচীকার পেছনে তারা আর কতকাল ছুটবে?

শায়খ সুদাইস তার এসব বক্তব্যকেই অস্বীকার করে দিলেন গত ৪ সেপ্টেম্বর জুমার খোতবায়। তিনি তার অবস্থানকে পুরোই উল্টে দিয়েছেন এবং ইহুদিদের সাথে সহাবস্থানের আহ্বান জানিয়েছেন যেভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় তার ইহুদি প্রতিবেশীদের সাথে সহাবস্থান করেছিলেন। তিনি তার খোতবায়, যা গোটা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে, বলেছেন, কীভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুশরিক নারীর মশক থেকে অজু করেছেন। কীভাবে রাসূল তার বর্ম ইহুদির কাছে বন্ধক রেখেছেন। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন, মদীনার ইহুদিরা তখন আক্রমণকারী ও দখলদার কোনো শক্তি ছিল না। বরং তারা মদীনার অন্যান্য সাধারণ বাসিন্দাদের মতই ছিল। কিন্তু আজ ফিলিস্তিনে যেসব ইহুদি রয়েছে, তারা হচ্ছে আক্রমণকারী দখলদার ইহুদি। তারা পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে অস্ত্র আর অর্থ নিয়ে একত্র হয়েছে। ফিলিস্তিনের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

তারা এসে স্থানীয়দের হত্যা করেছে।  তারা ফিলিস্তিনীদের বাড়িঘর ধ্বংস করেছে, ভূমি ও সম্পদ কেড়ে নিয়েছে। শায়খ সুদাইস, আপনি এখনো বলবেন, তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করা হবে অথচ তারা ফিলিস্তিনে আমাদের ভাইদেরকে কী নিষ্ঠুরভাবেই হত্যা করেছে, তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করেছে, স্থানীয় লোকদেরকে বাস্তুচ্যুত করেছে?

আমাদের আশা ছিল, শায়খ সুদাইস যেহেতু ইসলামী ইতিহাস সম্পর্কে ভাল জ্ঞান রাখেন এবং রাসূলের হিজরতকালে মদীনায় কাদের বসবাস ছিল সে সম্পর্কেও তিনি সম্যক অবগত এবং বর্তমানের যে কঠিন বাস্তবতা সেটিও তার সামনে পরিস্কার। কিন্তু শায়খের বক্তব্য বড় আশাহত করল। তিনি সৌদির আর দশজন রাষ্ট্রীয় কর্মচারীর মতই শাসকদের শিখিয়ে দেওয়া বুলি আওড়ালেন পবিত্র হারাম শরীফের মিম্বারে, যা শায়খের কাছে কখনো কাম্য নয়। আমরা আশা করেছিলাম, শায়খ সুদাইস শাসকবর্গের নিকট তার গ্রহণযোগ্যতা ও নৈকট্যকে সংস্কার আন্দোলনের যে সকল দায়ী কারাগারের  অন্তরীণ হয়ে ধুঁকছেন তাদের উদ্ধারে কাজে লাগাবেন।

আমরা শায়খকে আর কী বলতে পারি! আমরা শুধু এটুকুই বলব, আপনি যা বলেছেন সে ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন।

মিডল ইস্ট মনিটর পরিমার্জিত অনুবাদ: এনাম হাসান জুনাইদ

পূর্ববর্তি সংবাদভারতের রপ্তানি বন্ধের ঘোষণায় বাংলাদেশের পেঁয়াজ বাজারে হুলুস্থুল কাণ্ড
পরবর্তি সংবাদবগি লাইনচ্যুত হওয়ায় সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ