হজের বাইরে হজক্যাম্প

শাহ মুহাম্মাদ খালিদ ।।

রাজধানী ঢাকার অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এখানে আপনি সড়ক, রেল বা আকাশপথ যে কোনো পথে যাতায়াত করুন না কেন, মহাসড়কের পূর্বপাশে একটি সবুজ গম্বুজ ও মিনার আপনার চোখে পড়বে। সুবিশাল এ কম্পাউন্ডটিকে সবাই হজক্যাম্প বলে চিনে। বিমানবন্দর থেকে ঠিক পূর্বদিকে অবস্থিত এই ক্যাম্প প্রতিবছর লাখো হজযাত্রীর হজে আসা-যাওয়ার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সরকারি বা বেসরকারিভাবে নিবন্ধন সম্পন্ন করার পর হজের মৌসুমে হজযাত্রীরা এখানে এসে সমবেত হন। এরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বুঝিয়ে দেয়া, ইমিগ্রেশনসহ যাবতীয় কার্যাবলী সম্পন্ন করার পর এখান থেকে তাঁরা বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

হজের মৌসুমের হজক্যাম্প সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। কিন্তু হজের মৌসুম ছাড়া বাকি নয় মাস এই সুবিশাল কম্পাউন্ডে কী কাজকর্ম হয়- সেটা কৌতূহলের বিষয়।

সপ্তাখানেক আগে একবার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আশকোনার এই হাজিক্যাম্পে। বেলা এগারটার ভর অফিস টাইমেও গিয়ে দেখা যায় সুনসান নিরবতা। নিচতলায় বিশাল মসজিদ। এর বাইরে লম্বা জায়গা খালি পড়ে আছে। হাজিদের রিপোর্ট বুথ, অভ্যর্থনা কক্ষসহ বিভিন্ন কক্ষে তালা ঝুলছে। নিচতলায় হজক্যাম্পের পরিচালকের অফিস। অফিস টাইম হওয়া সত্ত্বেও পরিচালক এখানে নেই। পিয়ন ঘুমুচ্ছে চেয়ারে বসে। ঘুমের মধ্যে মাঝেমাঝে বাঁ হাতে মাছি তাড়াচ্ছে। তার সাথে কথা হল কিছু সময়।

পিয়ন বলল, হজের মৌসুমে স্যার নিয়মিত অফিস করেন। অন্য সময় কখনো আসেন, কখনো আসেন না। কোনো অনুষ্ঠান বা মিটিং থাকলে আসেন। এই সময়ে তেমন কোনো কাজ তো আসলে নাই। তাই স্যারেরও প্রতিদিন আসা লাগে না, বুঝেনই তো!

islamtimes24.com
হজের সময় ছাড়া বিরান হজ ক্যাম্প

হজ ক্যাম্পে সরকার নিয়ন্ত্রিত হজ অফিস আছে। হজের প্রস্তুতিমূলক কর্মকান্ড মৌসুমের বাইরেও কমবেশি চলতে থাকে। বিমান বাংলাদেশের অফিসও দেখা গেল নিচতলায়। অন্য মৌসুমে সেটাও একপ্রকার বন্ধই বলা চলে।

দ্বিতীয় তলায় বিভিন্ন ব্যাংকের বুথ, যা কেবল মৌসুমে চালু থাকে। এই ব্যাংকগুলোর হজকেন্দ্রিক বিভিন্ন ডিপোজিট স্কিম রয়েছে। পাশাপাশি এসব ব্যাংকের দেশব্যাপী বিভিন্ন শাখায় হজের ফি জমা নেয়া হয়। সেসব লেনদেন সহজে সমাধা করতে হজক্যাম্পে তাদের বুথ খোলা হয়েছে। কেবলমাত্র ইসলামী ব্যাংকের ব্যাংকিং শাখা আছে যা স্বাভাবিক ব্যাংকের নিয়মমাফিক খোলা থাকে এবং সমস্ত ব্যাংকিং সুবিধা এখানে পাওয়া যায়।

তৃতীয় তলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় অফিস। এখানে তাদের বড় একটি পুস্তক বিক্রয় কেন্দ্র, অফিসের দিনগুলোতে এটা খোলা থাকে। তৃতীয় তলার অন্য পাশে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমের আবাসন। পরিবার নিয়ে তারা সেখানে থাকেন। একপাশে দেখা গেল তারা সবজির বাগানও করেছেন। লাউয়ের মাচা থেকে শুরু করে সিম, পুঁই শাক, পেঁপেঁ প্রভৃতি গাছ বাঙালি গেরস্তের পরিচয় বহন করছে।

তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম তলার বিশাল অংশজুড়ে ডরমেটরি। পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা ডরমেটরি। এখানে হাজিগণ দু’তিন দিন অবস্থান করেন। এরপর বিমানের ফ্লাইট ধরেন। এভাবে মাসখানেকের মধ্যে লক্ষাধিক হাজি এখানে অবস্থান করে যান। এগুলো এখন খালি পড়ে আছে। প্রতিটি রুমের দরজায় একটি করে তালা ঝুলছে। তালার ওপর আবরণ জমেছে ধুলোবালির।

মাইকে জোহরের আজান পড়ার পর মুসল্লিগণ আসতে শুরু করলেন। ইমাম আসলেন, মুয়াজ্জিন আসলেন। জামাতে আড়াইশোর মত মানুষ। নামাজের পর কথা হল মুয়াজ্জিন জনাব আল আমিনের সাথে।

islamtimes24.com
এত বিশাল হজ ক্যাম্প, হজের মওসুম ছাড়া খালি পড়ে থাকে

তিনি জানালেন, নিচতলায় মুসল্লি ধারণক্ষমতা প্রায় দুই হাজার। হজের সময়কাল ছাড়া সারা বছর মুসল্লির সংখ্যা এমনই থাকে। ফজরে দেড়শো, জোহরে আড়াইশো। মাগরিবে ঢাকার অন্যান্য মসজিদের মত এখানেও বিপুল মুসল্লির সমাগম হয়। ছয় থেকে সাতশো মানুষ মাগরিবে শরিক হয়। শুক্রবার অবশ্য চার-পাঁচ হাজার মানুষ এখানে জুম্মা পড়তে আসে।

তার কাছে জানা গেল, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন ট্রেনিং মাঝেমধ্যে এখানে হয়। এছাড়া পাশেই র‌্যাব হেডকোয়ার্টার। সেখানে বা আশপাশে কোথাও যখন র‌্যাব সদস্যরা সারা দেশ থেকে কোনো প্রশিক্ষণ বা অভিযানে আসে তখন এখানে রাত্রিযাপন করে।

মুয়াজ্জিন বললেন, একবার এখানে স্কুল-কলেজ করার প্রস্তাব উঠেছিল। তাহলে সারা বছর জায়গাটা খালি না থেকে কাজে লাগবে। ধর্মসচিব একবাক্যে তা না করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এখানে স্কুল-কলেজ হলে হাজিদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে। হাজিদের জন্য এই হজক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে। এটা হাজিদের কাজে লাগবে। অন্য সময় প্রয়োজনে খালি পড়ে থাকবে। তবু অন্য কাজে ব্যবহার হবে না।

মুয়াজ্জিন আল আমিনের তথ্যমতে, কোটি টাকার এই সুবিশাল রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ করে পিডব্লিউডি, গণপূর্ত বিভাগ এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়।

হজক্যাম্পের ভেতরে দুই জায়াগায় এবং বাইরে সামনের দিকে কাটছাঁট করে সাজানো ফুলের বাগান। সেখানে দাঁড়ালে রাস্তার ওপাশে চোখে পড়ে হজক্যাম্প কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন দোকানপাট। আবাসিক হোটেল, রেস্তোঁরা, মানি এক্সচেঞ্জ, ট্রাভেল ব্যাগের দোকান এবং বেশ কিছু ট্রাভেল এজেন্সির অফিস। এগুলো সারা বছর ঠিকঠাক চললেও বেকার পড়ে থাকে হজক্যাম্পের সুবিশাল কম্পাউন্ড। মাছি ওড়ে, ধুলো জমে। এখানে সেখানে ঘাপটি মেরে থাকে আলস্য আর উদাসীনতা। ঘুমের মধ্যে হাই তোলে পিয়নেরা। আর মাস শেষে একাউন্ট থেকে বেতন বুঝে নেয় স্যারেরা।

ভয়ানক জনসংখ্যায় নাকাল ঢাকাবাসী। আবাসন ছাড়াও প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, ধর্মীয় ও শালীন অনুষ্ঠান ইত্যাকার কাজের জায়গা পাওয়া দুষ্কর হয়ে গেছে। যা পাওয়া যায় তার খরচও অনেক বেশি। সেই বিবেচনায় চাইলেই এখানে ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন আয়োজন হতে পারে। বয়স্ক কুরআন শিক্ষা, নূরানী ট্রেনিং, আশপাশ ও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রেখে দ্বীনি দরস ও প্রশিক্ষণ— অনেক কিছুই হতে পারে। বিশেষত বছরজুড়ে ওমরায় মানুষের আসা-যাওয়া চলতে থাকে। তাদের জন্য নিয়মতান্ত্রিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এই হজক্যাম্প তাদের যাতায়াতের মনজিলও হতে পারে।

এভাবে একটু চিন্তা করলে আর সামান্য আন্তরিক হলেই বহু কাজে আসতে পারে লক্ষাধিক স্কয়ার ফিটের আশকোনা হজক্যাম্প।

পূর্ববর্তি সংবাদকেন নিজস্ব মিডিয়া হাউস
পরবর্তি সংবাদদুই সপ্তাহের করুণা, দুই হাজার বছরের স্বপ্নসাধ