‘সারা জীবন তিনি বেফাকের স্বার্থকে বড় করে দেখতেন’ : মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু

শাইখুল হাদিস আল্লামা হাফেজ নূরউদ্দীন গহরপুরী রহ. ছিলেন এ দেশের শীর্ষ আলেম ও অভিভাবক। ছিলেন কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের সভাপতি। বেফাকের উন্নয়ন ও অবদান বিষয়ে ইসলাম টাইমসের পক্ষ থেকে কথা হয় তার ছেলে, বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের সহ-সভাপতি ও জামিয়া ইসলামিয়া হোসাইনিয়া গহরপুর সিলেটের মুহতামিম মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজুর সঙ্গে। তার সেই কথামালা নিয়ে আমাদের এই মুখকলাম।  


 

আল্লামা নূরুদ্দীন গহরপুরী রহ. শুরু থেকেই বেফাক (বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড)-এর সঙ্গে ছিলেন। পরে ১৯৯৬ সালে তিনি বেফাকের সভাপতি নির্বাচিত হন। ইনতেকালের আগ পর্যন্ত তিনি সম্মানের সঙ্গে এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

আব্বাজান থাকতেন সিলেটে। কিন্তু সারা দেশেই ওয়াজ-মাহফিলে তাঁর দাওয়াত থাকত। তিনি যেতেনও। এমনটা খুব কমই হতো, যে কোনো মাহফিলে গিয়ে তিনি বেফাকের কথা বলতেন না। প্রায় দোয়াতেও তিনি বেফাকের কথা বলতেন।

এখন তো বেশির ভাগ মাদরাসাই বেফাকের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু আগে তো এমনটা ছিল না এ কথা সবাই জানেন। আব্বার চেষ্টায় আমাদের থানা এবং আশপাশের সব মাদরাসাই এখন বেফাকের সঙ্গে যুক্ত। তিনি সিলেটসহ সারা দেশের বহু মাদরাসাকে বেফাকের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বেফাককে একটা জাতীয় বোর্ডের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি অবিরাম চেষ্টা করে গেছেন। তিনি চাইতেন, বাংলাদেশের সবগুলো মাদরাসা যেন একটা বোর্ডের অধীনে চলে আসে। পড়ালেখায় শৃঙ্খলা ও মানগত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।

বেফাকের মাধ্যমে আব্বার একটি বড় চেষ্টা ও চাওয়া ছিল, মাদরাসাগুলো একটা বোর্ডের অধীনে চলে এলে প্রতিনিধিত্বকারী আলেমদের একত্রে বসার পরিবেশ হবে। এখান থেকে সারা দেশের আলেমদের একটা ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম তৈরি হবে।

আব্বা বেফাকের জন্য সব সময় আন্তরিক ও উন্নয়নকামী ছিলেন। যাত্রাবাড়ির কাজলায় বেফাকের বর্তমান কার্যালয়ের জায়গাটি কেনার সময় সবার পরামর্শক্রমে তিনি নিজ হাতে বায়না করেন। বেফাকের জন্য তিনি খুব ফিকির করতেন। চেষ্টাও করতেন। আগে বেফাকের স্টাফদের বেতনাদি প্রায় সময়ই বাকি থাকত। অনেক সময় ছাত্রদের বৃত্তির টাকাও বাকি পড়ে থাকত। এগুলো তিনি নিজের পক্ষ থেকে দিতেন। বেফাকে গেলেই শুনতেন, এটা দরকার, ওটা দরকার। একটা বড় অফিস চালাতে যা লাগে আর কি! তিনি সেগুলোর ব্যবস্থা করে দিতেন।

বিভিন্ন সময় বেফাকের কর্মকর্তারা আব্বাজানকে স্মরণ করেন। তারা বলেন, গহরপুরী হুজুর বেফাকে এসে বিভিন্ন বিষয় সমাধান করে যেতেন। বাকি পড়ে থাকা টাকাপয়সা পরিশোধ করে দিতেন। আব্বাজান সব সময় বেফাককে সহযোগিতা দিয়েছেন। কখনো বেফাক থেকে অর্থ-সম্মানী নেননি। এখন তো বেফাকে গিয়ে আমরা টাকা নিয়ে আসি।

আল্লামা নূরউদ্দীন গহরপুরী রহ.

আব্বাজান বেফাক পরিচালনা করেছেন। আর আমরাও এখন পরিচালনায় আছি। আব্বাজানের পরিচালনা বা কোনো কাজের বিষয়েই হোক, সমালোচনা করার সুযোগ ছিল না। তাঁর কাজের বিষয়ে কেউ কোনো কথা বলতে পারত না। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে মিটিংয়ের বাইরে কোনো কথা বলতেন না। কারও আড়ালেও কথা বলতেন না। কারও কানকথাও শুনতেন না। যে কারণে বেফাক সংশ্লিষ্ট উলামায়ে কেরাম আব্বাজানের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতেন।

তা ছাড়া আরেকটা বিষয় হলো, সাধারণত আমাদের প্রত্যেকের কিছু ঘনিষ্ঠ লোকজন থাকে। কারো খাদেম-সহযোগী থাকে। যারা বড়দের থেকে বিভিন্ন কাজ আদায় করে নেয় বা অন্যরা তাদের দিয়ে বিভিন্ন কাজ আদায় করে নেয়। আব্বাজানের এ ধরনের কোনো লোক ছিল না। তাঁর কোনো খাদেমও ছিল না। এ কারণে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন।

আব্বাজান সারা জীবন বেফাকের স্বার্থকে বড় করে দেখতেন। বেফাককে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতেন। উপস্থিত কে কী বলবে, তা আমলে নিতেন না! বরং বেফাকের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যেটা কল্যাণকর হবে তিনি সেটাই ভাবতেন এবং সেটাই করতেন।

আমরা মনে করি, একটি শিক্ষাবোর্ডকে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস থেকে মুক্ত থেকেই পরিচালনা করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে বেফাকের কোনো কোনো সদস্য রাজনীতিমুখী। তারা বেফাককে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়। তাদের কেউ কেউ বর্তমানে কী পেলাম, কী পাব এটা নিয়েই বেশি চর্চা করেন।

অনুলিখন : সাদ আবদুল্লাহ মামুন