তরুণদের প্রতি মনোযোগী না হলে তাদের বিপথগামিতার পথ মসৃণ হবে : মাওলানা আবদুর রাজ্জাক নদভী

মাওলানা আবদুর রাজ্জাক নদভী

[সময়ের তরুণরা আগামী দিনে নববী দায়িত্ব পালনের জন্য মেধা ও মননের দরকার। দরকার বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান ও যোগ্যতার। এ বিষয়ে পরামর্শমূলক কথা বলেছেন লেখক ও অনুবাদক, ঢাকার মাদরাসাতুল হুদার পরিচালক হজরত মাওলানা আবদুর রাজ্জাক নদভী। তার সেই কথামালা নিয়ে আমাদের এই মুখকলাম।]

 

আজকের বেশির ভাগ তরুণরা পথ হারিয়ে ফেলছে। এটা শুধু আমাদের মাদরাসার অঙ্গনের জন্যই বলছি না, স্কুল-কলেজ ভার্সিটিগুলোতেও তাই। বরং সেখানে আরও বেশি মাত্রায় তরুণদের সমস্যা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।

একবার আলিগড় ইউনিভার্সিটির ছাত্রসংসদের সভাপতি ও সেক্রেটারিসহ কয়েকজন নেতা সন্ধ্যার দিকে ভারতের নদওয়াতুল উলামায় এলেন হজরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। আমি তখন নদওয়ায় পড়ি। হজরতের রাতের-মজলিসে নিয়মিত বসি। তো হজরতের সঙ্গে তারা কথা বলে বিদায় নেওয়ার সময় বললেন, আমরা ছাত্রসংসদের দায়িত্বে আছি। আলিগড় ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের উদ্দেশে আপনার কোনো পয়গাম থাকলে আমরা তা পৌঁছে দেব। তখন হজরত নদভী রহ. ছাত্রদের উদ্দেশে দুটি নসিহত করলেন। এক. আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। দুই. প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।

তরুণদের জন্য হজরতের এ দুটি নসিহত অত্যন্ত দামি ও মূল্যবান এক পয়গাম। আজকের তরুণদের বিষয়ে কয়েকটি সমস্যা ও সংকট সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রথম বিষয়টি হলো, বর্তমান সময়ের তরুণদের গড়ে তোলার মতো লোকের বড় অভাব। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তরে কিছু একটা বলে দেওয়ার লোক আছে। কিন্তু তরুণদের জন্য ভাবা, তাদের সমস্যা ও সংকটগুলো চিহ্নিত করা, সেগুলো সমাধান করার উপায় বলার লোক কম। তরুণদের জন্য ধারাবাহিকভাবে কিছু বলা, কিছু লেখা, কিছু করার মতো লোক ও চেষ্টা- আমার জানা মতে- আমাদের অঙ্গনে নেই। থেকে থাকলেও সীমিত। সামান্য।
আমি মনে করি, এ ধরনের কিছু লোক থাকা দরকার, যারা নবীন ও তরুণদের গড়ে তুলবেন। তাদের নিয়ে কিছু ভাববেন। কিছু করবেন।

হজরত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.-কে বারবার বলতে শুনেছি, জামাকাপড় পরলেই কেউ মানুষ হয়ে যায় না। মানুষ হওয়ার জন্য কোরআন-হাদিস শিখতে হয়। জ্ঞানচর্চা করতে হয়। নেককার-মনীষীদের সান্নিধ্য অর্জন করতে হয়। এখন আমাদের কারো কারো ধারণা, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে সিলেবাস আছে, এটাতেই ছেলেরা সবকিছু পেরে যাবে। সবকিছু হয়ে যাবে। আসলে কি তাই? প্রস্তুত করা ও গড়ে তোলা ছাড়া আমাদের তরুণদের কাছে আমরা বড় ধরনের আশা কীভাবে করতে পারি!

বর্তমান বিশ্ব যে সময়টা পার করছে এবং আগামী দিনে বিশ্ব পরিস্থিতি যা দাঁড়াবে এ সময়টাকে মোকাবেলা করার জন্য আমাদের তরুণদেরকে কি আমরা প্রস্তুত করছি? এ সময়ে এবং আগামী দিনে নববী দায়িত্ব পালনের জন্য যেই মেধা ও মননের দরকার, যেই বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান ও যোগ্যতার দরকার, সেটা কি আমরা তাদের দিচ্ছি? এটা একটা বড় প্রশ্ন!

আমি মনে করি, তরুণদের থেকে কাজ নেওয়ার আগে তাদের গড়ে তোলা দরকার। ভবিষ্যতের সংকটগুলো মোকাবিলায় তাখাচ্ছুছ পর্যায়ে দুই-তিন বছরের একটি সুচিন্তিত সিলেবাস গঠন করা। বাংলা-আরবি-ইংরেজি এবং আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয়ে। তারপর এর আলোকে অভিজ্ঞ শিক্ষকগণের তত্ত্বাবধানে কিছু মেধাবী তরুণকে গড়ে তোলার কাজ শুরু করা। প্রথমে এক-দুটি প্রতিষ্ঠানই এটা শুরু করতে পারে। আজকে দেখুন, হজরত মাওলানা আবদুল মালেক সাহেবের জন্য ইলমে হাদীসের ওপর কাজ করাটা সহজ। কেন? কারণ, তিনি এর জন্য আগে লোক তৈরি করেছেন।

আমাদের ভবিষ্যতকে আমরা যেভাবে ভাবি ও চিন্তা করি, আমাদের আগামী প্রজন্মকে আমরা যেভাবে দেখতে চাই, তার জন্য একটা সিলেবাস তৈরি করে কিছু কিছু মেধাবীকে আমরা তৈরি করে নিতে পারি। এই সিলেবাস সবাই গ্রহণ করবে না। কিন্তু যখন পাঁচ-দশ বছর যাবে, এর একটা ফলাফল সামনে আসবে তখন তরুণসমাজ এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারবে। নিজেরাই এদিকে এগিয়ে আসবে। প্রতিষ্ঠানগুলোও এদিকে মনোযোগী হবে। সমাজের জন্য ভালো একটা কাজ হবে।

আরেকটা বিষয় হলো, দাওয়াতের লাইনগুলো তাদের সামনে স্পষ্ট করা। দু-চার কথা বলে তাদের ছেড়ে না দেওয়া। বরং ব্যাপক ও স্থায়ীভাবে দাওয়াতের কাজ করার জন্য কী কী প্রস্তুতি নেওয়া দরকার এটা তাদের হাতেকলমে শিক্ষা দেওয়া এবং সেভাবে তাদের প্রস্তুত করা।

মনে রাখতে হবে, আমাদের তরুণরা এ সময়ে বেড়ে উঠছে। এ সময়ের হাওয়া-বাতাস তাদের গায়ে লাগছে। পত্র-পত্রিকাসহ সব ধরনের মিডিয়া এখন তাদের হাতের নাগালে। গোটা জগৎ এখন তাদের সামনে। আমরা যদি এখন তাদের প্রতি মনোযোগী না হই, সর্তকতার সঙ্গে গড়ে না তুলি তাহলে তাদের বিপথগামী হওয়ার পথ মসৃণ হবে। এ জন্য সময় ক্ষেপণ না করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অনুলিখন : সাদ আবদুল্লাহ মামুন