মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া ।।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা এবং বিধি-বিধান। ভাড়া দেওয়া-নেওয়াও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই শরীয়তে যেমন ভাড়াপ্রক্রিয়ার স্বীকৃতি রয়েছে তেমনি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এর বিধিবিধানসমূহ।
কুরআন মাজীদ এবং হাদীস শরীফে ভাড়া তথা ইজারার বৈধতা এবং এর বিধান সম্পর্কে আলোচনা এসেছে। ফিকাহবিদগণ সেগুলোর আলোকে ইজারার বৈধ ও অবৈধ পন্থা, বৈধতার শর্তাবলী এবং অবৈধতার ক্ষেত্রসমূহ ও এক্ষেত্রে করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেগুলো মেনে চললে ভাড়া চুক্তিটি শরীয়তসম্মত হবে এবং উভয় পক্ষ ইহকাল ও পরকালে এর সুফল ভোগ করবে।
অবশ্য দুঃখজনক ব্যাপার হল, অনেক ক্ষেত্রেই শরীয়তের ঐসব বিধানের বাস্তবায়ন হতে দেখা যায় না। ফলে কোনো ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা কর্তৃক ভাড়াটিয়া নিগৃহীত হয়, আবার কোনো ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়ার দ্বারা বাড়িওয়ালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকের ক্ষেত্রে হয়ত এর কারণ এটাই যে, তারা এ সংক্রান্ত শরয়ী আহকাম জানে না। আবার কেউ হয়ত এটাকে শরীয়ত সংশ্লিষ্ট বিষয়ই মনে করে না; বরং আগাগোড়াই জাগতিক বিষয় মনে করে থাকে। তাই এ বিষয়ে শরীয়তের বিধান জানার চেষ্টা করে না। আর কেবল নিজের স্বার্থই সামনে রাখে। অন্যের ক্ষতি হল কি না বা তার প্রতি জুলুম হল কি না তা ভেবেও দেখে না।
তাই ভাড়া দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা এবং ভাড়াটিয়া উভয় পক্ষের করণীয় ও সংশ্লিষ্ট বিধানাবলী সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা হওয়া দরকার। এ লেখায় বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালার যা যা কিছু করা দরকার সেসব বিষয়ে কিছু মাসায়েল ও আলোচনা পেশ করা হলো।
প্রথমেই মৌলিক কয়েকটি বিষয় জেনে নেওয়া দরকার।
১. ভাড়ার পরিমাণ অবশ্যই নির্দিষ্ট হতে হবে।
২. যে বাড়ি বা ফ্ল্যাট ভাড়া হবে এর সকল সুবিধা-অসুবিধা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী ভাড়াটিয়াকে সুস্পষ্টভাবে অবগত করতে হবে।

বাড়িওয়ালাকে প্রধানত যা যা করতে হবে
১. বাড়ি ভাড়া কত তা নির্ধারিত করে জানানো। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ বিল কি ভাড়ার অন্তর্ভুক্ত, না এর বাইরে তাও জানানো। তাছাড়া নাইট গার্ড ও বাড়ির দারোয়ানের বেতন, ময়লা ফেলার বিল কিংবা অ্যাপার্টমেন্টগুলোর সার্ভিস ফি ইত্যাদি মিলে প্রতি মাসে সাধারণত কত টাকা হয় তা চুক্তির সময়ই বলে দেওয়া আবশ্যক।
২. প্রতি মাসের ভাড়া কত তারিখের মধ্যে দিতে হবে তা চুক্তির সময়ই জানিয়ে দিতে হবে।
৩. বাড়ির সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে ভাড়াটিয়াকে পূর্বেই অবহিত করা আবশ্যক। বিশেষত এমন ত্রুটি, যা জানতে পারলে সে হয়ত ভাড়াই নিবে না বা যেটির কারণে ভাড়া আরো কম হবে। যেমন পানি নিয়মিত বা সার্বক্ষণিক না থাকা বা নিয়ম করে পানি দেওয়া। গ্যাসের সমস্যা থাকা বা দারোয়ান না থাকার কারণে গেট নিয়ন্ত্রণের সমস্যা ইত্যাদি। কোনো কোনো বাসার লাইনে এক-দুই বার পানি ছাড়া হয় আর সকলে তখন নিজ নিজ পাত্রে জমা করে রাখে। এমন হলে ভাড়া চুক্তির সময়ই বলে দিতে হবে।
৪. বাড়ির মূল ফটক রাত কয়টায় বন্ধ করা হবে তা নির্ধারিত থাকলে চুক্তির সময়ই বলে দিতে হবে। যেন এ নিয়ে পরবর্তীতে দ্বন্দ্ব না হয়।
৫. প্রত্যেক ফ্ল্যাটে পৃথক পৃথক বিদ্যুৎ মিটার লাগানো উচিত, যেন প্রত্যেক পরিবার নিজ খরচ অনুযায়ী বিল পরিশোধ করতে পারে। কোনো কোনো বাড়িতে সকল ফ্ল্যাটের জন্য একটি মাত্র মিটার থাকে। ফলে সব ফ্ল্যাটের হিসাব একত্রে হয় এবং এক মিটারে অতিরিক্ত খরচ হওয়ার কারণে ইউনিট প্রতি খরচ অনেক বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে আরেকটি ত্রুটি হল, মিটার একটি হওয়ার কারণে সকলের উপর সমহারে বিল চাপানো হয়। এতে করে বিদ্যুতের স্বল্প ব্যবহারের কারণে যাদের বাস্তব খরচ কম হয় তাদের উপর জুলুম হয়ে যায়। এজন্য প্রত্যেক ফ্ল্যাটে ভিন্ন ভিন্ন মিটার লাগানো দরকার।
তদ্রূপ পানির মিটারও ভিন্ন হওয়া উচিত ছিল। যেন যার যার খরচ অনুযায়ী বিল নেওয়া যায়। শোনা গেছে যে, ওয়াসা এভাবে প্রতি ইউনিটের জন্য আলাদা মিটার দেয় না। তাই এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত দু’টি পদ্ধতির কোনো একটি অবলম্বন করা যেতে পারে।
১. প্রত্যেক মাসের পানির বিল সকল ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়াদের মাঝে বণ্টন করে দিবে।
২. বাড়িওয়ালা পানির বিল বাসা ভাড়ার অন্তর্ভুক্ত করে নিবে। পানির নামে ভিন্ন বিল নেবে না।
এক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা পূর্ণ ভাড়ার মালিক হবে। আর পানির বিল সেই আদায় করবে।
দ্বিতীয় পদ্ধতিটি প্রথমটির চেয়ে নিরাপদ ও উত্তম। কিন্তু বর্তমানে কোনো কোনো বাসায় প্রত্যেক ফ্ল্যাটের জন্য তিনশ বা চারশ করে পানির বিল নেওয়া হয়। কোনো কোনো এলাকায় এর চেয়েও বেশি নেওয়া হয়। ফলে কখনো কখনো এ টাকা দ্বারা মোট পানির বিল দিয়েও আরো উদ্বৃত্ত থেকে যায়। বাড়িওয়ালাকে নিজের ফ্লাটে ব্যবহৃত পানির বিল দিতে হয় না। কখনো তো আরো অতিরিক্ত থেকে যায়। অথচ বাড়িওয়ালার জন্য পানির বিলের ক্ষেত্রে ব্যবসা করা বা অতিরিক্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে ওয়াসার পানি দ্বারা ব্যবসা করার অনুমতি নেই। আর এটা ভাড়াটিয়াকে জানিয়েও করা হয় না। বরং কেউ কেউ তো খরচ অনুযায়ী নেওয়ার দাবি করে খরচের চেয়ে বেশি নিয়ে থাকে। তাই এভাবে অতিরিক্ত নেওয়া বৈধ হবে না।
৬. বাড়ি ছেড়ে দিতে হলে কত দিন আগে জানাতে হবে তাও চুক্তির সময় জানিয়ে দিতে হবে। কেউ কেউ দুই মাস পূর্বে জানানোর শর্ত করে। চলতি মাসে বা পূর্বের মাসে জানানোর শর্ত করা দূষণীয় নয়। সুতরাং বাড়ি ছাড়ার সময় চূড়ান্ত করা হলে ভাড়াটিয়া এবং বাড়িওয়ালা উভয়ের জন্যই তা পালনীয় হবে।
লক্ষণীয় হল, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় চলতি মাসের পাঁচ তারিখের মধ্যে জানানোর শর্ত থাকে। তবে ভাড়াটিয়া যদি এর এক বা দুই দিন পরে জানায় তাহলেও পরবর্তী মাসের ভাড়া আদায় করা হয়। কখনো দুই মাস আগে জানানোর কথা থাকে। কিন্তু ভাড়াটিয়া হয়ত সময়মত জানাতে পারেনি। তখন সে বাসা ছেড়ে দেয়ার পরও তার থেকে দুই মাসের ভাড়া কেটে রাখা হয়। এক্ষেত্রে বাড়িওয়ালা বাস্তবেই অন্যত্র ভাড়া দিতে না পারলে পূর্ব শর্ত অনুযায়ী ভাড়াটিয়া থেকে নির্ধারিত টাকা নেয়া বৈধ হতে পারে।
তবে বাড়ির মালিকের কর্তব্য অন্যত্র ভাড়া দেওয়ার চেষ্টা করা। বাসাটি ভাড়া হয়ে গেলে পূর্বের ভাড়াটিয়া থেকে অতিরিক্ত যা নেওয়া হয়েছে তা তাকে ফেরত দেওয়া জরুরি। নতুন ভাড়াটিয়া পেয়ে গেলে পূর্বের ভাড়াটিয়া থেকে এ সময়ের ভাড়া রেখে দেওয়া জায়েয হবে না।
লেখক : নায়েবে মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, মারকাযুদ দাওয়া আলইসলামিয়া ঢাকা
(ভাড়াটিয়ার যা যা করণীয় সেই আলোচনা সামনে আসবে, ইনশাআল্লাহ।)
















