মক্তব-মাদরাসার শিক্ষকদের জন্যও দরকার শিশু মনস্তত্ত্বের পাঠ, কোমল পরিচর্যা

আবু তাশরীফ ।। 

রাজধানীতে মেয়েদের অভিজাত স্কুল ভিকারুন নিসা নুন- এর এক ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় তোলপাড় ঘটে গেছে। এ ঘটনায় বিচার দাবির পাশাপাশি ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের পক্ষ থেকে প্রকাশ পেয়েছে নানা রকম প্রতিক্রিয়াও।

জানা গেছে, পরীক্ষায় নকল করার অভিযোগে ছাত্রীটির অভিভাবককে স্কুলে ডেকে এনে অভিযোগ  জানানো ও দুর্ব্যবহারের  ফলে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে ওই ছাত্রী।এমন দাবিই করছেন ছাত্রীর অভিভাবক ও সহপাঠীরা। তারা আত্মহত্যার বিচার চাইছেন। এরই মধ্যে একজন কয়েকজনকে বরখাস্ত করার খবর এসেছে।

ছাত্রীদের অভিবাবকরা দাবি করছেন শুধু আত্মহত্যার প্ররোচনার বিচারই বড় কথা নয়, বরং এ জাতীয় ঘটনা যেন বারবার না ঘটে – সেজন্য প্রয়োজন  শিশু কিশোর ছাত্রছাত্রীর মনস্তত্ত্ব নিয়ে শিক্ষকদের বিশেষ পড়াশোনা। আত্মহত্যার ওই ঘটনার বিচার এবং এ জাতীয় ঘটনা প্রতিরোধে দীর্ঘ  মেয়াদী প্রশিক্ষণমূলক প্রস্তুতি গ্রহণের প্রস্তাবটি অনেকের মনোযোগ কেড়েছে।

প্রশ্ন দেখা দিয়েছে,  শিশুকিশোর  ছাত্রের মনস্তত্ত্ব বিষয়ে শিক্ষকদের বিশেষ পাঠগ্রহণ ও ছাত্রদের কাউন্সেলিংয়ের মতো অনুশীলনগুলো কি শুধু স্কুল-কিন্ডার গার্ডেনের জন্য জরুরি না কি মক্তব –মাদারাসার শিশু শিক্ষকদের জন্যও এ সবের চর্চা দরকার?

এ বিষয়ে যোগযোগ করা হলে মারকাযুদ্দাওয়া আল ইসলামিয়া ঢাকার উলুমুল হাদীস বিভাগের শিক্ষক মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া  আবদুল্লাহ বলেন, শিশু –কিশোর ছাত্রদের মাঝে উপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দানে সফল হওয়ার জন্য শিক্ষকের সার্বিক দক্ষতা একটি অপরিহার্য  ব্যাপার। ছাত্রের মেধা , মনোযোগ, মনোভাবের প্রতি লক্ষ্য রাখা শিক্ষকের বিশেষ দায়িত্ব। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজনীয়তা আরো বেশি। এ ক্ষেত্রে তাই শিক্ষকদের মনোযোগী হওয়া দারকার। আর এ মনোযোগ দানে বিশেষ পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ ধৈর্য ও অভিজ্ঞতা সফলতা নিয়ে আসতে পারে।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শিশু মনস্তত্ত্ব বুঝে শাসন-পরিচর্যার সমৃদ্ধ নমুনা আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর সিরাত থেকে পাওয়া যায়।রাসূলের খাদেম সাহাবি আনাস ইবনে মালিক রা.-এর ভাইয়ের একটি পাখি মারা গেল।রাসুল তাকে সমবেদনা জানাতে বললেন-ইয়া আবা উমায়র,মা ফাআলান নুগায়র? ধৈর্য বিষয়ক গুরু গম্ভীর কোনো কথা না বলে শিশু উপযোগী ভাষায় প্রশ্ন করেছেন, সান্ত্বনা দিয়েছেন।শিশুদের জন্য শিশু উপযোগী ভাষা ও আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মকতব-হেফযখানা ও মাদারাসার প্রাথমিক পর্যায়ের শ্রেণিগুলোতে এ বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ বাড়ানো দরকার।

একই বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে মোহাম্মদপুর জামিয়াতুল উলুমের মুহাদ্দিস মাওলানা তাহমীদুল মাওলা বলেন,মক্তব- মাদরাসার শিক্ষকগণ তো শুধু পাঠদানের শিক্ষক না, তারা শিশুদের পরিচর্যাকারী,দাঈ। দ্বীনী অঙ্গনের প্রতি শিশুদের আগ্রহী করে তোলাও তাদের দায়িত্ব। এজন্য শিশুদের যারা শিক্ষক তাদের দায়িত্ব শিশুদের প্রতি কোমল আচরণ করা, শিশু মনস্তত্ত্ব জানা ও শেখা।

মাওলানা তাহমীদুল মাওলা বলেন, আপন অভিভাবক, বাবা ও বন্ধুর মতো ছাত্রদের মনের জগতটাকে পাঠ করতে পারলে শিক্ষকের পক্ষে ছাত্রগড়ার কাজটা সহজেই সফল হতে পারে। শাসন করতে হলে বাবার মন নিয়ে শাসন করতে হবে। এর ফলে দ্বীনী লেখাপড়ার প্রতি অনাগ্রহী হওয়া কিংবা যেকোনো রকম মানসিক দুর্ঘটনা ও বিপর্যয়  থেকে শিশু –কিশোর ছাত্রদের রক্ষা পাওয়ার পথ সুগম হয়। মাদরাসার বেশিরভাগ  শিক্ষকই এদিকটার প্রতি মনোযোগ দিয়ে থাকেন। কিন্তু  এ ক্ষেত্রে আরো নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে মনোযোগ ও সময় বিনিয়োগ করলে এর দ্বারা ভালো সুফল আশা করা যেতে পারে।

মাওলানা যাকারিয়া ও মাওলানা তাহমীদুল মাওলা বলেন, স্বাভাবিকভাবে মাদরাসাগুলোতে ছাত্রদের প্রতি শিক্ষকদের  মনোযোগ ও তারবিয়াতের পরিবেশ সুন্দর। কিন্তু বাইরের জগতের হাতছানি ও পরিস্থিতির অবনতি এ দিকে আরো মনোযোগী হতে আমাদের পরিবেশের শিক্ষক সমাজকে উদ্বুদ্ধ করে। ভবিষ্যতের কোনো আশংকা কিংবা ঝুঁকি থেকে বাঁচার জন্যও শিক্ষকদের শিশু মনস্তত্ত্ব পাঠ ও কোমলতার সঙ্গে শিশুদের সঙ্গে আচরণ করা জরুরি।

পূর্ববর্তি সংবাদনির্বাচনে দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষমতা যাদের কাছে
পরবর্তি সংবাদটঙ্গী ট্র্যাজেডি : মাঠ থেকে সামানাপত্রও লুট