চীনে মুসলিম নিপীড়ন : যে কারণে মুখ খুলছে না মুসলিম বিশ্ব

তাশা তানিয়া ওবাওয়া ।।

চীন জাতিগত সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালনা করে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনারও মুখোমুখি হচ্ছে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো চীনের এই মুসলিম নিপীড়নের বিরুদ্ধে রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে।

বিশেষজ্ঞরা মতে, মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক, স্থানীয় রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতির সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা এবং উইঘুরদের ব্যাপারে মুসলিম বিশ্বের সঠিক ধারণা না থাকায় মুসলিম বিশ্ব অনাকাঙ্ক্ষিত এই নীরবতা পালন করছে।

জাতিসংঘের বিবৃতি অনুযায়ী ২০১৭ থেকে ১ মিলিয়নের বেশি উইঘুর, কাজাক ও অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুকে চীনের জিংজিয়াং অঞ্চলে আটক করে রাখা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুসলিম জাতি এই পরিস্থিতিতে চুপ থাকতে পারে না। তবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক নীতিমালার মতো অভিন্ন কোনো কারণে তারা হয়তো চুপ করে আছে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক এবং চীন বিশেষজ্ঞ মাইকেল ক্লার্ক বলেন, ‘চীনের অর্থনৈতিক শক্তি এবং কূটনৈতিক সু-সম্পর্ক মুসলিম দেশগুলোর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। যদিও এই পরিস্থিতি উইঘুর মুসলিমদের জন্য একেবারেই অপ্রত্যাশিত।’

উইঘুর বিষয়ে অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশই জিংজিয়াংয়ে চীনের ভূমিকার প্রকাশ্য সমালোচনা করছে। অবশ্য মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কই জাতিগত সংখ্যালঘুদের বন্দী করে রাখার অভিযোগ করেছে। তারা বলেছে, উইঘুরদের ‘শুদ্ধি’ সেন্টারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। যেখানে তাদেরকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতবাদ গ্রহণ, ভিন্ন ভাষা শিক্ষা ও নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস ত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

Two satellite images side-by-side from February and October 2018, showing buildings appearing.

সাম্প্রতিক অনুসন্ধান বলছে, সম্প্রসারণের পর এখন চীনের বন্দী শিবিরের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮টিতে। যার আয়তন ২ মিলিয়ন স্কয়ার ফিটেরও বেশি। এসব বন্দী শিবিরে মুসলিমদের ‘শ্রমদাস’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমেরিকার একটি সফটওয়ার কোম্পানির জন্য কাপড় সেলাই করতে তাদের বাধ্য করার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিবাদ করছে না। পাকিস্তান বরং চীনকে রক্ষার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের ভাষায় উইঘুরদের যে পরিস্থিতি প্রচার পাচ্ছে তা পশ্চিমা মিডিয়ার অতিরঞ্জন ছাড়া কিছুই নয়।

গত সপ্তাহে উইঘুরদের নিপীড়নের বিষয়টি ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্টের আলোচনায় এলে দেশটির সরকার তা এড়িয়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমাদের হস্তক্ষেপ করা উচিৎ নয়।

চীন ইস্যুতে ইন্দোনেশিয়ার এই ভূমিকা মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য ইস্যু থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেমন ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে মুসলিম স্বার্থে সোচ্চার দেশটি। তবে ইন্দোনেশিয়ার ইসলামিক দলগুলোর চাপে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনা রাষ্ট্রদূতকে ডেকেছে এবং উইঘুর মুসলিমদের বিষয় ইন্দোনেশিয়া সতর্ক দৃষ্টি রাখছে বলে জানিয়েছে।

একইভাবে সৌদি আরব, জর্ডান, ইরান, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য মুসলিম দেশ রোহিঙ্গা ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে সরব হলেও চীনের উইঘুর ইস্যুতে নীরব।

ড. ক্লার্ক বলেন, ‘মিয়ানমারের তুলনায় চীনের জাতীয় অর্থনীতি ১৮০ গুণ বড়। যা তাকে সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা করছে। মিয়ানমার একটি দুর্বল আঞ্চলিক রাষ্ট্র। ফলে তার উপর অন্যরা চাপ সৃষ্টি করতে পারছে।’

অন্যদিকে মার্কিন থিঙ্কট্যাংক ‘আমেরিকান ইন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট’-এর তথ্যানুযায়ী   মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় চীনের বর্তমান বিনিয়োগ ১৪৪.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শুধু মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ ১২১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।

এছাড়াও সৌদি আরব ও ইরাকের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল ও গ্যাস খাতে চীনের বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে।‘ওয়ান রোড, ওয়ান বেল্ট’ প্রকল্পের অধীনে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আরও বেশি বিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে চীনের।

বিপুল অর্থের এসব বিনিয়োগ ও সহজ শর্তের ঋণ মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো চীন ইস্যুতে চুপ থাকতে বাধ্য করছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনে আগত বিপুল সংখ্যক মুসলিম পর্যটকদেরও চীনের উইঘুরসহ অন্যান্য মুসলিম জাতি-গোষ্ঠির প্রকৃত অবস্থা জানতে দেয়া হয় না। অথচ চীনে মুসলিম পর্যটকদের বাৎসরিক ব্যয়ের পরিমাণ ১১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা প্রতি বছর ১.৪ বিলিয়ন ডলার হারে বাড়ছে। বাজার নিরীক্ষা কোম্পানি ‘সালাম স্ট্যান্ডার্ট’ এই তথ্য জানিয়েছে।

স্থানীয় ইস্যুতে চীন ও চীনা স্বার্থ জড়িয়ে থাকলেও চীন ‘হস্তক্ষেপ না করা’র পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে দীর্ঘদিন। এমনকি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে চীনকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করা থেকেও বিরত থাকতে দেখা যায়। যদিও মিয়ানমারের ব্যাপারে এ পর্যন্ত একাধিকবার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে দেশটি।

Related image

বিশ্লেষকদের মতে ‘হস্তক্ষেপ না করা’র চীনা নীতিই এখন মুসলিম দেশগুলোর উপর নীরব চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা তাদেরকে চুপ থাকতে বাধ্য করছে।

ড. ক্লার্ক বলেন, ‘অনেক মুসলিম দেশ অভ্যন্তরীণ অনেক সমস্যা এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিয়ে সংকটে রয়েছে। তারা নিজেদেরকে সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা করতে বেইজিংয়ের সমালোচনা থেকে বিরত থাকছে।’

উইঘুর ইস্যুতে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কই সরব ছিলো। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোয়ান চীনের সমালোচনা করে বলেন, চীনের বন্দী শিবিরগুলো যা হচ্ছে তা এক ধরনের গণহত্যা। কিন্তু চীন তুরস্কের মুখ বন্ধ করার উদ্যোগ নিলো। তারা তুরস্কের অর্থনৈতিক সংকটের সময় এগিয়ে এলো এবং সাথে সাথে এটাও বললো, চীন প্রত্যাশা করে তুরস্ক উইঘুর বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের ব্যাপারে ‘দায়িত্বহীন মন্তব্য’ করবেন না। তুরস্ক এই বক্তব্যের প্রকাশ্য কোনো প্রতিবাদ আজ পর্যন্ত করেনি।

লেখক : সাংবাদিক ও প্রডিউসার, এবিসি নিউজ, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল। অনুবাদ : এবিসি নিউজ থেকে আবরার আবদুল্লাহ

পূর্ববর্তি সংবাদধানের শীষ প্রার্থীর স্ত্রী-কন্যাকেও আটক
পরবর্তি সংবাদস্বামীকে হত্যার অভিযোগে নাটোরে স্ত্রীর বিরুদ্ধে মানববন্ধন