সবসময় মাদরাসা আর ছাত্র; এই ছিলো তাঁর ব্যস্ততা

দেশের বর্ষীয়ান আলেম, চাঁদপুর খেড়িহর মাদরাসার দীর্ঘদিনের মোহতামিম, মারকাযুদ্দাওয়া আলইসলামিয়া, ঢাকার পরিচালক মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ এবং বাংলাদেশের অন্যতম হাদিস শাস্ত্রবিদ ও মারকাযুদ্দাওয়া আলইসলামিয়া, ঢাকার আমিনুত-তালিম মাওলানা আবদুল মালেক-এর পিতা মাওলানা শামসুল হক রহ. গত ২৬ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন।

তাকে নিয়ে মূল্যবান স্মৃতিচারণ করেছেন তার অন্যতম শাগরিদ, দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, মসজিদুল আকবর কমপ্লেক্সের মহাপরিচালক মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন। প্রিয় শিক্ষকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বার বার আবেগে আপ্লুত হন তিনি। কাঁদেন অঝোরে। বললেন, স্নেহ-মমত-ভালোবাসার অনেক গল্প। তার মমতামাখানো কথাগুলোর লেখ্যরূপ দিয়েছেন আতাউর রহমান খসরু।


আমি খেড়িহর মাদরাসায় কাফিয়া জামাতে ভর্তি হই। হুজুরের (মাওলানা শামসুল হক রহ.) বড় ছেলে মুফতি আবদুল্লাহ ও আমি এক সাথে লেখাপড়া করেছি। হুজুরের কাছে অনেকগুলো কিতাব পড়েছি। আমরা মনে করি, ইলমে নাহু, ইলমে সরফ ও ইলমে মানতিকে হুজুর ইমামের মর্যাদা রাখতেন। অত্যন্ত গভীর জ্ঞান রাখতেন তিনি। এই ৩ শাস্ত্রের কিতাবই আমি হুজুরের কাছে বেশি পড়েছি। তিনি আমাদেরকে কাফিয়া, শরহে জামি, মিরকাত, শরহে তাহজিব, সুল্লামুল উলুম, শরহে বেকায়া সানি, নফহাতুল ইয়ামান, নফহাতুল আরব ইত্যাদি কিতাব পড়িয়েছেন।

হুজুরের পড়ানোর ধরন ছিলো অত্যন্ত সুন্দর। খুব উচ্চ আওয়াজে এবং গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়াতেন তিনি। দুর্বল মেধার ছাত্ররাও হুজুরের পড়া বুঝতো। ক্লাসেই পড়া মুখস্থ হয়ে যেতো। মনের ভেতর গেঁথে যেতো। সংখ্যায় আমরা ছাত্র খুব কম ছিলাম। কিন্তু হুজুরের আওয়াজ শুনলে, মুতাআলা আর প্রস্তুতি দেখলে মনে হতো তিনি একশো ছাত্র পড়াচ্ছেন। যত্ন ও ভালোবাসার কোনো কমতি ছিলো না।

হুজুরের মুতাআলার ধরনও ছিলো চমৎকার। একা একা মুতাআলা করতেন। আমরা জানালা দিয়ে দেখতাম, মানুষ যেভাবে হাত নেড়ে নেড়ে বক্তব্য দেয়, সেভাবে হাত নেড়ে নেড়ে মুতাআলা করতেন তিনি। যেন তিনি দরসেই আছেন। তিনি গভীর মনোযোগে মুতাআলা করতেন আর আমরা জানালা দিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম।

আরও পড়ুন : হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ শামসুল হক রহ. জীবনের এক ঝলক

আমানত ও দিয়ানাতের বিচারে বিরল এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ছাত্রদেরও সেভাবে গড়তে চাইতেন। পড়ার জন্য হুজুর খুব কম মারতেন। আমলের ত্রুটি দেখলে খুব রাগ করতেন। পিটাতেনও। আমি হুজুরের খেদমতে চার বছর ছিলাম। লেখাপড়ার জন্য কাউকে মারতে দেখিনি। কিন্তু আমলের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য মারতে দেখেছি।

আমি বলি, উস্তাজ দুই প্রকার। এক প্রকার হলো উস্তাজে আম। সাধারণ শিক্ষক। তারা মনে করেন, আমাদের দায়িত্ব হলো ছাত্রদের পড়ানো। আরেক প্রকার উস্তাজ হলেন ‘উস্তাজে মুকাওয়িন’। তারা মনে করেন, আমাদের দায়িত্ব হলো ছাত্র গড়া। শুধু পড়ানো নয়। তিনি ছিলেন ছাত্র গড়ার এমনি একজন কারিগর।

ছাত্রদের তিনি নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। একজন ছাত্রের জীবন কীভাবে গড়বেন সারাদিন তা নিয়ে ফিকির করতেন। নিজের ঘর-সংসার নিয়ে খুব একটা ভাবতেন বলে কোনোদিন মনে হয়নি। বাড়িতেও যেতেন খুব কম। সব সময় মাদরাসা আর ছাত্র; এই ছিলো তার ব্যস্ততা।

হুজুর পরিবারকে খুব বেশি সময় দিতেন না। কিন্তু আল্লাহ তার সন্তানদেরকে অনেক বড় করেছেন। মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আমার সহপাঠী। আল্লাহ তাকে মেধা ও যোগ্যতা, ইলম ও বিচক্ষণতা সব দিয়েছেন। তিনি যেমন দ্বীনি বিষয়গুলো ভালো বোঝেন এবং ঠিক তেমনি জাগতিক বিষয়গুলো ভালো বোঝেন। বাংলাদেশের অন্যতম একজন সময় সচেতন আলেম তিনি। মাওলানা আবদুল মালেকের ব্যাপারে আমার মূল্যায়ন হলো, বাংলাদেশে ইলমে হাদিসে তিনি সবার উর্ধ্বে। তাদের ছোট ভাইরাও যোগ্য হয়েছেন বলে জানি।

উপরের ক্লাস না থাকায় মাদরাসার বার্ষিক পরীক্ষার পর যখন আমি খেড়িহর ছেড়ে চলে আসবো, এক সপ্তাহ আগ থেকে আমার চোখের পানি রাখতে পারছিলাম না। মাদরাসার আশ্চর্য এক নুরানি পরিবেশ ছিলো। হুজুরের জন্য মনটা অনেক খারাপ লাগছিলো। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বাড়ি আসলাম, কিন্তু মন টিকছিলো না। হুজুরের বাড়িতে গেলাম শাহরাস্তি। সেখানে হুজুরের সাথে এক-দুই দিন থেকে আসলাম।

আরও পড়ুন : ‘আল্লামা তাকি উসমানি আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, তুমি আমার মন ভরে দিয়েছো’ -মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন

এরপর হুজুরও খোঁজ রাখতেন, আমিও যোগাযোগ রাখতাম। আমি চিঠি দিতাম, হুজুরও উত্তর দিতেন। আমি করাচি যাওয়ার পরও যোগাযোগ ছিলো হুজুরের সাথে। দেশে আসার পর প্রতি বছর মাহফিলে যেতাম। হুজুর আমার উপর পাবন্দি দিয়েছিলেন যে, যতদিন মাহফিল আছে এবং আপনি আছেন মাহফিলে আসতে হবে। আমিও ভালোবাসা ও আনন্দের সাথেই মাহফিলে যেতাম। শারীরিক অসুস্থতার কারণে শেষ দুটি মাহফিলে যেতে পারিনি।

আমি সর্বপ্রথম ঢাকা আসি হুজুরের সাথে। টঙ্গী ইজতেমায়। হুজুরের বড় ছেলে মুফতি আবদুল্লাহ, মাওলানা আবুল কাসেম আর আমি। এই তিনজনকে হুজুর সাথে নিয়ে আসেন। এটাই আমার প্রথম ঢাকায় আসা। এর আগে কখনো সফর করিনি। সফর করতে যে টাকা-পয়সা দরকার হয় সে ধারণাও আমার ছিলো না। হুজুর সাথে নিবেন এই আনন্দে এমনি চলে আসছি। ঢাকায় আসার পর কিছু জায়গা হুজুর নিজেই ঘুরিয়ে দেখান আর কিছু জায়গায় আমরা যাবো। কিন্তু পকেটে তো টাকা নেই। রিকশা ভাড়াও নেই। হুজুরকে বলতাম, টাকা লাগবে। হুজুর দুই হাতে পকেট ফাঁক করে ধরে বলতেন, নাও। আমি নিজের প্রয়োজন মতো নিতাম। কতো নিতাম হিসাব করে নিতাম। ফিরে আসার পর বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে হুজুরকে টাকা দিতে গেলে হুজুর আশ্চর্য হলেন। বললেন, কিসের টাকা? আমি বললাম, ঢাকা গিয়ে যে টাকা নিয়েছিলাম।’ হুজুর বললেন, আমি তো তোমাকে টাকা দেইনি। আমি যদি টাকা ফেরত নেয়ার জন্য তোমাকে টাকা দিতাম, তবে তা হিসেব করেই দিতাম। হুজুর টাকা নিলেন না।

মাঝে মাঝে অসুস্থ হলে হুজুর নিজেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতেন। ছাত্রদের প্রতি খুব খেয়াল রাখতেন। আমাকে তিনি নিজের সন্তানের মতো মহব্বত করতেন।

আমি করাচি থেকে ফিরে হুজুরের সাথে দেখা করতে যাই। গিয়ে দেখি, হুজুর নোয়াখালি গেছেন। আমি রাতে খেয়ে-দেয়ে শুয়ে যাই। দোতলায় আমি শোয়া। তখনও ঘুম আসেনি। হুজুর আসলেন। কেউ একজন জানালেন, আমি দেখা করতে এসেছি। জানতে চাইলেন আমি আছি কী না এবং রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে কীনা? তাদের কাছে জানতে চাইলেন, আমাকে কী দিয়ে মেহমানদারি করানো হয়েছে? আমি সেদিন ডিম ও ঢেড়স ভাজি দিয়ে ভাত খাই। এই কথা শুনে হুজুর একটা চিৎকার দিয়ে উঠলেন। বললেন, দিলাওয়ারের জন্য যদি একটা মুরগি জবাই করতে না পারো কার জন্য করবা? (কাঁদছিলেন মুফতি দিলাওয়ার) পরের দিন আমাকে খুব যত্ন করে খাওয়ালেন।

আমি এক বাড়িতে লজিং থাকতাম। পরের দিন আসার সময় সেই বাড়ি যাই দেখা করতে। সেখান থেকে বের হয়ে হুজুরের সাথে দেখা করে বাড়ি ফেরার ইচ্ছা। জানালা দিয়ে দেখি, হুজুর দ্রুত গতিতে কোথাও যাচ্ছেন। আমি দ্রুত বের হয়ে হুজুরের কাছে গিয়ে বললাম, হুজুর কোথায় যাচ্ছেন? আমি তো চলে যাবো। হুজুর বললেন, আপনার খোঁজেই তো আসলাম। আপনি চলে গেলেন কি না! আমি বললাম, হুজুরের সাথে দেখা না করে আমি যাবো! হুজুর প্রায় আধা কিলোমিটার পায়ে হেঁটে আমার সাথে স্ট্যান্ডে আসলেন। নিজেই রিকশা ঠিক করলেন। ভাড়া দিয়ে দিলেন। আমি ভাড়া আছে বললে, হুজুর বললেন, ভাড়া না দিলে কি এতো দূর হেঁটে আসতাম? রিকশাওয়ালাকে বললেন, খুব সতর্কতার সাথে নিযে যাবে, বড় আলেম। অথচ আমি হুজুরের ছাত্র। আমি তার নখের সমানও নই। (আবারও কেঁদে ফেললেন)

মাঝে মাঝে হুজুরের সাথে দেখা করতে যেতাম। হুজুর ছাত্রদের উদ্দেশে বয়ান করতে দিতেন। আমি বয়ান করতাম আর হুজুর মহব্বতে কাঁদতেন। অন্যের মুখে শুনেছি। হুজুর নাকি বলেছেন, আল্লাহ যদি হাশরের মাঠে জিজ্ঞেস করেন, শামসুল হক কী নিয়ে এসেছো। আমি বলবো, আল্লাহ দিলাওয়ারকে নিয়ে এসেছি। উফ! কতো ভালোবাসতেন। (কাঁদছিলেন তিনি)

আল্লাহ তায়ালা হুজুরের এই নিঃস্বার্থ মহব্বত ও ভালোবাসার উত্তম প্রতিদান দিন। জান্নাতে তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দান করুন।আমিন।

পূর্ববর্তি সংবাদতেহরানে তালেবান-আফগান সরকারের শান্তি আলোচনা
পরবর্তি সংবাদসেলফি তুলতে গিয়ে জলপ্রপাতে পড়ে ছাত্রের মৃত্যু