নতুন মন্ত্রীদের অনভিজ্ঞতা কি সরকারের জন্য সমস্যা হতে পারে?

ইসলাম টাইমস ডেস্ক : বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বারের সরকারে ডাকসাইটে সব নেতাদের বাদ দিয়ে মন্ত্রীসভায় বেশিরভাগ নতুন মুখ আনা হয়েছে। তাদের প্রশাসন চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। অভিজ্ঞতা ছাড়া মন্ত্রীসভায় জায়গা পাওয়া সদস্যরা সরকারের নীতি বাস্তবায়নে কতটা দক্ষতা দেখাতে পারবেন, বিশ্লেষকদের অনেকে এমন প্রশ্ন তুলেছেন। তারা মনে করেন, মন্ত্রীদের অভিজ্ঞতা বা দক্ষতার অভাব থাকলে আমলানির্ভর হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়।

নতুন মন্ত্রীসভা কী পরিস্থিতিতে পড়তে পারে, তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ কী?

নতুন মন্ত্রীরা শপথ নিয়েছেন গত ৭ জানুয়ারি। তাদের অনেকেই দীর্ঘসময় ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীও রয়েছেন। কিন্তু ৩১ জন নতুন মুখের মধ্যে ২৭ জনই এই প্রথম মন্ত্রী হয়েছেন। তারা কতটা দক্ষতা দেখাতে পারবেন, সেই প্রশ্ন অনেকে তুলছেন।

সিনিয়র সাংবাদিক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, মন্ত্রীদের জন্য অভিজ্ঞতার ঘাটতি একটা বড় চ্যালেঞ্জ। একইসাথে হেভিওয়েটরা বাদ পড়ায় দলের ভিতরের এবং বাইরের রাজনীতিও নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে।

তিনি বলেন, “বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিজ্ঞতার চ্যালেঞ্জ। তারা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে আমলাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যেটা ইশতেহারে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে যাবেন। সেখানে আমলারা বা প্রশাসন যদি বাধা হয়ে যায়, তাহলে কাজের গতি কমে যাবে। আরেকটা চ্যালেঞ্জ হলো ভিতরের এবং বাইরের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ভিতরের চ্যালেঞ্জ হলো রাজনীতিক বলতে যাদের বোঝায়, তারা কিন্তু সবাই মন্ত্রীসভা থেকে বাদ পড়েছেন। ”

তিনি আরো বলেন, “তাদের (বাদপড়া মন্ত্রী) একটা অভিমান, ক্ষোভ থাকতে পারে। তারা তো দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাদের থেকে একটু অসহযোগিতা এলে, সেটা একটা চ্যালেঞ্জ হবে”।

রিয়াজউদ্দিন আহমেদ রাজনৈতিক অস্থিতিশীল একটা পরিবেশের হুমকিও দেখছেন। তার কথায়, “একটা বড় বিরোধীদল একেবারে অনুপস্থিত সংসদে। চার-পাঁচজন যে নির্বাচিত হয়েছেন, তারা তো বলেছেন, শপথ নেবেন না। তারা না আসলে এ সরকারের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে একটা দূর্বলতা রয়ে গেলো। তারা কতদূর করতে পারবে, সেটা দেখার বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার একটা হুমকি থেকে গেলো।”

মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সাবেক একজন সচিব আলী ইমাম মজুমদার নতুন মন্ত্রীসভায় পুরোদস্তুর এবং প্রভাবশালী রাজনীতিকের অভাব দেখছেন। এটিও সরকারের কাজে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

মি. মজুমদার বলেন, “রাজনীতিকের সংখ্যা কিন্তু এই মন্ত্রীসভায় কমে গেছে। এ কারণে আমি একটু দ্বিধান্বিত আছি যে, তারা কিভাবে বা কতটা ভূমিকা রাখতে পারবেন। আমাদের দেশে অর্থনীতির মূল উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, আমাদের একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু মানুষের আয়ের বৈষম্য বাড়ছে ব্যাপকভাবে। এই বৈষম্য কমানোর জন্য যে পদক্ষেপ নেয়া দরকার, সেটা কিন্তু ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদের কাছে মুখরোচক হবে না। তারা এদিকে যাবে না। রাজনীতিকরা যদি মুল কতৃত্বে থাকতেন, তাহলে আশাটা বেশি হতো”।

আওয়ামী লীগ টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে আবারও সরকার গঠন করেছে। ফলে নতুন মুখ বেশি এনে মানুষের সামনে একটা বৈচিত্র তুলে ধরা বা নতুনত্ব দেখানোর একটা চেষ্টা ছিল।

তবে নতুন মন্ত্রীরা প্রশাসনকে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেবেন, একইসাথে তাদের প্রধানমন্ত্রীর ওপরই নির্ভরশীলতা বেড়ে যাবে কিনা, এসব প্রশ্ন থেকে যায় বলে উল্লেখ করেছেন মানবাধিকার কর্মি এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুলতানা কামাল।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী দু’দিন আগে বলেছেন যে, মন্ত্রীরা নজরদারিতে থাকবেন। এখন সেটা কি প্রধানমন্ত্রীর নজরদারি, নাকি জনগণের নজরদারিতে থাকবেন, সেটা একটা মৌলিক প্রশ্ন। এখন যারা নতুন মন্ত্রী হলেন, তাদের দায়িত্ব টিম হিসেবে জনগণের জন্য অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটানো, নাকি প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে কাজগুলো করা? এই প্রশ্ন থাকে।”

সুলতানা কামাল বলেন, “আমলাতন্ত্রের যে বিষয় আছে, সামরিক-বেসামরিক আমলা, তাদের ওপর এদের নিয়ন্ত্রণ কেমন হবে? মন্ত্রী হিসেবে সেই জায়গায় তাদের অবস্থান দৃঢ় করতে পারবেন, এই বিষয়টাও কিন্তু আমাদের দেখার আছে।”

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন, নতুনরা নিজেরাই দক্ষতার সাথে প্রশাসন চালাতে পারবেন বলে তারা বিশ্বাস করেন।

তিনি বলেন, “নতুনদের প্রায় সকলেই কোনো না কোনোভাবে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। আর সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমাদের এখানে আমলারা যে খুব বেশি করতে পারেন, তা নয়। এটা ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভর করবে। একটা কালেকটিভ জবাবদিহিতা আছে তো। সেখানে প্রধানমন্ত্রী সাধারণত হস্তক্ষেপ করেন না, মোটেও করেন না। বরং তিনি বলে দেন যে, তোমরাই কাজগুলো করো।

দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে থাকলেও এবারই প্রথম মন্ত্রী হয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, তাদের নতুনদের নিয়ে সন্দেহ বা বিভিন্ন প্রশ্নের কারণ তিনি বুঝতে পারছেন না।

তিনি বলেন, “সন্দেহটা কেন আসবে? মন্ত্রী হিসেবে আমি নতুন। কিন্তু প্রশাসন চালানোর আমার অনেক অভিজ্ঞতা আছে। এই মন্ত্রীসভার নতুনদের সকলের ক্যারিয়ার অনেক বর্ণাঢ্য এবং বহুমুখী প্রতিভার বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা অনেক সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। চ্যালেঞ্জ আছে বটে। কিন্তু তা মোকাবেলা করার যোগ্যতা সবার আছে।”

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, নেত্রী এবার চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তার অভিজ্ঞতার কারণে নতুনরাও গতিশীল হবে।

তিনি বলেন, “যে যত কথাই বলুক, আমি মনে করি, যিনি দক্ষতা অর্জন করেছেন, তিনি এই মন্ত্রীসভার নেতৃত্ব দেবেন। তিনিই পরিচালনা করবেন। তারপরে আমাদের যারা সচিব আছে্ন, তারাও তাদেরকে সহযোগিতা করবেন। ফলে নতুনদের মন্ত্রণালয় পরিচালনায় অসুবিধা হবে বলে আমি মনে করি না।”

তোফায়েল আহমেদ বলেন, “অনেকে প্রশ্ন করে যে, নবীন প্রবীন,যারা এখানে আছে বয়স কিন্তু কারও কম না। ৬০ এর উপরে অনেকেরই বয়স। এমনকি ৭০ এর উপরও আছে। সুতরাং সবকিছু মিলিয়ে নতুনরা দক্ষতার পরিচয় দিতে সক্ষম হবে।”

আওয়ামী লীগের শরিক বিকল্পধারার নেতা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীও বলেছেন যে, এটি শেখ হাসিনার সাহসী পদক্ষেপ।

তবে তোফায়েল আহমেদ তার অতীত তুলে ধরে বলেছেন, তিনি নিজেও মন্ত্রী হওয়ার পরই প্রশাসন চালানোসহ সব বিষয়ে শিখেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুনদের ওপর যে আস্থা রেখেছেন, সেখানে নতুন মন্ত্রীরা তাদের হানিমুনের সময় শেষে যখন কাজ শুরু করবেন, তখন তারা কতটা দক্ষতা দেখাতে পারবেন, সেজন্য এখন অপেক্ষা করতে হবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

পূর্ববর্তি সংবাদমাটির নিচে হারিয়ে যাচ্ছে আরব আমিরাতের যে রহস্যজনক গ্রাম
পরবর্তি সংবাদসিরিয়া থেকে সর্বশেষ ইরানি সেনাকেও তাড়িয়ে দেওয়া হবে : মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী