আট বছর আগে কাশ্মীরের শাহ ফয়সাল ভারতের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সারা দেশে প্রথম স্থান অধিকার করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। সেই শাহ ফয়সালই গত মঙ্গলবার ভারতে রাষ্ট্রীয়ভাবে উগ্র হিন্দুত্ববাদকে প্রশ্রয় দেওয়া, দেশজুড়ে মুসলিম নিপীড়ণ ও কাশ্মীরের মুসলমানের উপর অব্যাহত অত্যাচারের প্রতিবাদে চাকরি থেকে অব্যহতি দেন। যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত ও নির্যাতিত কাশ্মীরিদের ভাগ্যবদলের প্রত্যয় নিয়ে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে নতুন আলোচনার অবতারণা করেছেন।
সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর শাহ ফয়সাল কাশ্মীরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সাথে সাথে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ৬ মাস পূর্বে সরকারি অফিসারদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ হলে তিনি ছুটি নিয়ে আমেরিকা চলে যান। সেখানে তিনি ‘ফুল ব্রাইড’ স্কলারশিপ পেয়ে ব্যবস্থাপনার উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
আরও পড়ুন : ‘হিন্দুত্ববাদীদের চাপে দেশের ২০ কোটি মুসলিম কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’
দেশে ফেরার ৪ দিনের মাথায় শাহ ফয়সাল বলেন, ভারতে মুসলমানের বিরুদ্ধে কট্টর হিন্দুত্ববাদ এবং কাশ্মীরের ধ্বংসযজ্ঞ আমাকে অস্থির করে তুলছে। তাই আমার পক্ষে সরকারি দায়িত্বের বোঝা বহন করা আর সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘কাশ্মীরিদের হত্যা থামাতে সদিচ্ছা দেখাচ্ছে না কেন্দ্রীয় সরকার। রাজ্যের বিশেষ মর্যাদার উপরেও আঘাত হানার চেষ্টা হচ্ছে। হিন্দুত্ববাদীদের চাপে দেশের ২০ কোটি মুসলিম কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছেন। এর প্রতিবাদে সিভিল সার্ভিস থেকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
২০১০ সালে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড দমনের নামে পরিচালিত অভিযানে শতাধিক যুবক নিহত হয়। এই বছরই আইইএস পরীক্ষায় শাহ ফয়সাল প্রথম স্থান অধিকার করে। ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো তা ফলাও করে প্রচার করে। ফলে কাশ্মীরের হাজার হাজার যুবক সিভিল সার্ভিসের চাকরির প্রতি আকৃষ্ট হয়।

ইতিহাসবেত্তা পিজি রাসুল বলেন, শাহ ফয়সালকে সে সময় ভারত সরকারের দমননীতির বিপরীতে পোস্টার বয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিলো।
শাহ ফয়সাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ মুখর ছিলেন। তিনি ভারতে (মুসলমানকে) গণপিটুনি, গো-রক্ষকদের বাড়াবাড়ি ও কাশ্মীরে চলমান সামরিক কৌশলের বিরুদ্ধে স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করতেন। মুসলিমদের প্রতি জুলুম-নির্যাতনের নানা ঘটনায় প্রতিবাদ জানাতেন। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়।
শাহ ফয়সাল চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর বলেন, পূর্বে আমি প্রশাসনের মাধ্যমে মানুষের সেবা করতাম। এখন আমি রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের সেবা করবো।
রাজনীতিতে কেন আসলেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে ভেবেছিলাম শাহ গিলানির নেতৃত্বাধীন হুরিয়াত কনফারেন্সে যোগ দেব। কিন্তু সেখানে গিয়ে কি করবো? তারা তো নির্বাচন বয়কট করেন। অথচ কাশ্মীরের ভাগ্যপরিবর্তন নির্বাচন ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই সম্ভব। তাই আমি আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাই।
শাহ ফয়সাল ওমর আবদুল্লাহ-এর ন্যাশনাল কনফারেন্সে যোগ দিয়েছেন এবং ভারতের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন।
৩৬ বছর বয়সী শাহ ফয়সাল শ্রীনগর থেকে ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত লুবাব এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন শিক্ষক। অজ্ঞাত ব্যক্তির হাতে তিনি ২৫ বছর আগে খুন হন।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যা কিছু হয় তার প্রভাব আমাদের উপর পড়ে। সেখানে আইন প্রণীত হয়, আইনের সংশোধনও হয়। যদি দেশপ্রেমিকরা সংসদে না যায় তবে জনগণের শত্রুরা আইন ও পরিকল্পনা তৈরি করবে। আমি মনে করি, আমি ঠিক পথেই আছি। তবে এটাই আমার শেষ ঠিকানা নয়। যদি রাজনীতির মাধ্যমেও অবস্থার পরিবর্তন না হয় তবে আমি তাও ছেড়ে দিবো।
বিবিসি উর্দু থেকে আবরার আবদুল্লাহ-এর অনুবাদ
















