সমাজের কাজ ও সেবায় আলেমদের অংশগ্রহণের দায় কতোটুকু?

আতাউর রহমান খসরু ।।

আলেমরা মুসলিম সমাজের শুধু নেতা নন; অভিভাবকও। অভিভাবক হিসেবে সমাজের ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখের খবর রাখাও তাদের দায়িত্ব। আলেমদের নেতৃত্ব ও তার প্রভাবের অনেকটাই নির্ভর করে তার সমাজসম্পৃক্ততার উপর। তাদের সেবার মানসিকতার উপর। অনেকেই মনে করেন, বর্তমান সমাজে আলেমদের প্রভাব সামনের দিনগুলিতে আরো বাড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে সমাজমুখিতা। সমাজের সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকা।

সম্প্রতি সমাজ সেবায় বিশেষভাবে মনোযোগী হতে দেখা যাচ্ছে তরুণ আলেমদের। তারা দুস্থ মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র, ঈদসামগ্রী, বন্যার্ত মানুষের মাঝে শুকনো খাবার ইত্যাদি বিতরণ করছেন। বিশেষত গত বছর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিপন্ন মানুষের সেবায় আলেমদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তারুণ্যের এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবেই মনে করছেন সমাজবেত্তারা।

আলেমদের সমাজমুখী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ঢাকার কল্যাণপুরের জামিয়া ইমদাদিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ দেওভোগ মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা আবু তাহের জিহাদি বলেন, ‘একজন আলেম যখন মানুষের সেবকে পরিণত হবেন, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামের হেফাজত ততো সহজ হবে। রাসুলুল্লাহ সা. ফজর ও আসরের নামাজের পর মুসল্লিদের দিকে ঘুরে বসতেন। তাদের খবর নিতেন। কেউ অসুস্থ হলে, অনুপস্থিত থাকলে তাকে দেখতে যেতেন। নবুওয়াত লাভের পূর্বেও ৪০ বছর পর্যন্ত আল্লাহর রাসুল সা. মানুষের সেবা করেছেন। হিলফুল ফুজুল গঠন করে সমাজসেবার নেতৃত্ব দিয়েছেন। এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; আল্লাহ তায়ালা তার নবীকে এভাবেই তৈরি করেছেন।’

মাওলানা জিহাদি হজরত শায়খুল হিন্দ রহ.-কে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘হজরত শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দি রহ. মাল্টার বন্দীজীবন থেকে ফিরে দারুল উলুম দেওবন্দে এক সেমিনারে ভাষণ রাখেন। সেমিনারে আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি, হজরত হুসাইন আহমদ মাদানি, হযরত মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমানি, মুফতি শফি রহ.সহ সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেমরা উপস্থিত ছিলেন। ওই সেমিনারে তিনি বলেছিলেন, বিশ্বব্যাপী মুসলমানের পতন ও লাঞ্ছনার কারণ অনুসন্ধান করে আমি ৩টি বিষয় পেয়েছি। এক. কুরআন ছেড়ে দেওয়া, দুই. আত্মকলহ, তিন. সাধারণ মানুষের সাথে আলেমদের সম্পর্ক ত্যাগ করা।’

‘সুতরাং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী শিক্ষা ও মূল্যবোধের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ সাধারণ মানুষের সাথে আলেমদের দূরত্ব। এই বিপর্যয় কাটাতে হলে সাধারণ মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। আর তার সহজ উপায় হলো মানবসেবা।’ –মাওলানা আবু তাহের জিহাদি।

চট্টগ্রাম ওমর গণি এম ই এস ডিগ্রী কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ‘আলেমদের সমাজ সেবায় মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, এটা নবীদের সুন্নাত। আমাদের নবীও সারা জীবন মানুষের সেবা করেছেন। সমাজসেবায় যুক্ত না হলে দাওয়াত-তাবলিগ, তালিম ও ইসলামের সেবা করা সহজ হবে না। জনসম্পৃক্ততা থাকলে ইসলামের অন্য সেবাগুলো আরও বেশি ফলপ্রসূ হবে বলে আমি মনে করি। সেবা মানুষের মনে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও প্রভাব বৃদ্ধি করে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, আমাদের দেশে ইসলামি রাজনীতির কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে না পারার পেছনে জনবিচ্ছিন্নতা অনেকটা দায়ি। আলেম রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে জনগণের মৌলিক প্রয়োজন ও দাবির বিষয়ে সোচ্চার ও সক্রিয় না হওয়া এবং দুঃসময়ে তাদের পাশে না দাঁড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।

মাওলানা আবু তাহের জিহাদি স্পষ্টতই বললেন, ‘আমাদের দেশে ইসলামি রাজনীতির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। কারণ, আমরা জনগণের দ্বারে দ্বারে যেতে পারিনি। জনগণকে বোঝাতে পারিনি। জনগণ যদি বুঝতো আমরা তাদের বন্ধু তাহলে তারাই আমাদের ক্ষমতায় বসাতো।’

ড. খালিদ এ বিষয়ে ইসলামি দলগুলোকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘দেশের ‘পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে’ ইসলামি দলগুলো জনসেবায় আরও বেশি মনোযোগী হতে পারে। বরং এটাই তাদের দল ও মিশনকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। অতীতেও আমরা দেখেছি, নির্বাচনে সেসব আলেম তুলনামূলক ভালো ফল করেছেন, যারা জনসেবায় মনোযোগী ছিলেন। আসলে সেবা ইসলামের অন্য কাজগুলোর দরজা খুলে দেয়।’

উভয় আলেম সেবামূলক কার্যক্রমে তরুণদের এগিয়ে আসায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা তরুণদের সাফল্য কামনা করে বলেন, তরুণদের এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়োজন ইসলামের পক্ষে বড় বড় অবদান রাখবে ইনশাআল্লাহ!

মাওলানা জিহাদির ভাষায়, ‘আজ যারা ক্ষুদ্রাকারে সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন –এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আল্লাহ তায়ালা তাদের মাধ্যমে ইসলামের বড় ধরনের খেদমত নেবেন। মানুষের সেবা করতে হবে -এই অনুভূতিটাই অনেক বড় জিনিস। দ্বীনদারদের উচিৎ তাদের সহযোগিতা করা।’

ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আলেম; বিশেষত তরুণ আলেমদের উদ্যোগ ও উদ্যমের প্রশংসা করে বলেন, ‘সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিপন্ন মানুষের সেবায় আলেমদের উদ্যোগ ও উদ্যম চোখে পড়ার মতো ছিলো। এটা অত্যন্ত ইতিবাচক। আমরা যারা একটু প্রবীণ –যাদের বয়স হয়েছে এবং একটা অবস্থান হয়েছে- আমাদের উচিৎ এসব তরুণদের সহযোগিতা করা।’

তিনি তরুণদের সেবা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বেশ কিছু পরামর্শও দেন। তিনি বলেন, ‘এই কার্যক্রমগুলোকে আরও গতিশীল ও ফলপ্রসূ করতে আলেমদের উচিৎ একটি সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে আসা। সাংগঠনিক কাঠামো না থাকলে অর্থ ও সময়ের অপচয় হয়। কাজের স্থায়িত্ব থাকে না। আবার কখনও কখনও আইনি অনুমোদন না থাকায় বাধাগ্রস্থও হতে হয়।’

ড. খালিদের পরামর্শ হলো, তরুণ ও উদ্যমী আলেমরা পারেন আন্তর্জাতিক মুসলিম সাহায্য সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের অনুসরণ করতে। তারা কীভাবে অর্থ যোগান এবং তা কীভাবে ব্যয় করেন, কোন সময় কোন সেবাটা দেন, সরকার ও রাষ্ট্রের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ রক্ষা করেন –এসব শেখাও গুরুত্বপূর্ণ।’

মাওলানা জিহাদি এর সঙ্গে যোগ করেন তরুণদের ইসলাহ ও তরবিয়্যাতের বিষয়টিও। তিনি বলেন, সমাজসেবা খুব প্রয়োজন। তবে সেখানে যাওয়ার আগে তরুণদেরও কিছু ইসলাহ ও তরবিয়্যাতের প্রয়োজন। তারা নির্লোভ ও নিষ্ঠাবান না হলে দ্বীনি স্বার্থ ব্যক্তি স্বার্থে পরিণত হবে এবং সমাজ পরিবর্তন করতে গিয়ে নিজেই সমাজের জটিলতায় হারিয়ে যাবে।

এই প্রবীণ আলেম একজন আদর্শ সমাজসেবীর নমুনা তুলে ধরে বলেন, নবুওয়াত লাভের সময় হজরত খাদিজা রা. রাসুল সা.-এর বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেন, ‘নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেন না, দুর্বলের বোঝা বহন করেন, নিঃস্ব মানুষের দায়িত্বগ্রহণ করেন এবং সত্যের পক্ষের মানুষকে সহযোগিতা করেন।’ এই হাদিস থেকে নবীর উত্তরসূরীদের শেখার অনেক কিছু আছে।

পূর্ববর্তি সংবাদহজে অনিয়ম : যে ৩৭ এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলো ধর্ম মন্ত্রণালয়
পরবর্তি সংবাদভূমি নিয়ে বিরোধ : সিলেটে ভাইয়ের হাতে ভাই খুন