মানুষ, বঙ্গবাহাদুর এবং মিডিয়া

শাহ মুহাম্মাদ খালিদ ।।

খুব বেশি পেছনে যাচ্ছি না। এইতো ২০১৬ সালের কথা। সে বছরের আগস্ট মাসে ভারতের আসাম থেকে হঠাৎ করে একটা হাতি পথ ভুলে বাংলাদেশের চলে আসে। জামালপুর, কুড়িগ্রাম, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন চরাঞ্চলে তাকে দেখা যেতে থাকে। দেশের প্রভাবশালী একটি মিডিয়া হাতিটাকে নিয়ে একটা নিউজ করার পর অন্যান্য সমস্ত মিডিয়া ধেই ধেই করে ওই তার দিকে ছুটে যায়। একাধিক মিডিয়ায় ফলাও করে সংবাদ প্রচারের পর রাতারাতি হাতিটি তারকা খ্যাতি পেয়ে যায়। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে তার প্রতিটি নড়াচড়া দেশের মানুষকে দেখাতে থাকে। অল্প সময়ে এটা টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়। হাতি কী করছে, কী খাচ্ছে, কোন দিকে ছুটছে, কতটুকু ওজনের মল ত্যাগ করছে এগুলো ছিলো বিভিন্ন পত্রিকার বিশ্লেষণের বিষয়। মিডিয়া এটাও হিসাব করেছে যে গত একমাসে হাতিটি দেশের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। টানাটানির এক পর্যায়ে বঙ্গবাহাদুর মারাই গিয়েছে।

সম্প্রতি একটি হাঁসের মৃত্যু নিয়ে আবার সরব বিশ্ব ও দেশীয় মিডিয়া। হাঁসটির প্রথম দেখা ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ নিউইতে। একটি বড় আকারের ঝড়ের পর সেই দ্বীপে হাঁসটিকে দেখা যায়। এরপরই এলাকার মানুষের কাছে তা আগ্রহের বস্তু হয়ে ওঠে। প্রথমে তার একটি নামকরণ করা হয়— ট্রেভর।বিশ্বমিডিয়া তাকে বিশ্বের সবচেয়ে একাকী হাঁস বলে আখ্যায়িত করে। এরপর পাক্কা এক বছর ধরে সেই হাঁসের যাবতীয় হাঁটাচলা ও তৎপরতার সংবাদ গণমাধ্যমের কল্যাণে সমস্ত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। ২০১৯ সালের চলতি জানুয়ারি মাসে ট্রেভরের মৃত্যু হয়েছে। এতে অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছে বিভিন্ন মিডিয়া এবং তাতে প্রভাবিত লোকজন। এমনকি নিউজিল্যান্ডের সংসদে সেই হাঁসের জন্য স্পিকারের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে।

উপরের দুটি ঘটনা থেকে যে বিষয়গুলো সামনে আসে তা হচ্ছে প্রাণীদের প্রতি এখনো মানুষের দয়া ও ভালোবাসা আছে। এটা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য বিষয়। কিন্তু বর্তমান ইউরোপ আমেরিকা এবং অন্যান্য অন্যান্য উন্নত রাষ্ট্রে কুকুর বিড়াল এবং এ জাতীয় বিভিন্ন পোষা প্রাণীর প্রতি তাদের মালিকেরা যেভাবে আচরণ করেন তাতে সেগুলো প্রাণীর পর্যায়ে আছে নাকি নিজের ঔরসজাত সন্তানের চেয়েও বেশি আপন হয়ে গেছে এটা এখন গবেষণার দাবি রাখে।

প্রাণীদের প্রতি যদি এতো ভালোবাসা হয়ে থাকে তাহলে নিজের সমপ্রজাতির মানুষের প্রতি দরদ ও ভালোবাসা তো আরো বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু তেমন কোন চিত্র কথিত উন্নত সমাজ এবং মিডিয়ার পক্ষ থেকে আমরা দেখি না। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আজ মনুষ্যত্ব ও মানবতা কতটুকু ভূলুণ্ঠিত হয়েছে তা আমাদের সামনে দৃশ্যমান। জুলুম, অন্যায় ও অবিচার কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাবৎ দুনিয়ার ভাগ্যাহত মানুষকে। এই যে লাঞ্ছনা, এই যে বঞ্চনা তার আলোচনা উচ্চকিত হয় না গণমাধ্যমে। একেক মিডিয়া তৈরি হয় একেক এজেন্ডা নিয়ে, কারো এজেন্ডাতেই থাকে না ভাগ্যতাড়িত মানুষের মুখপাত্র হওয়ার কথা। যৎসামান্য যা আমরা দেখি তার সিংহভাগই দায়সারা গোছের।

মিডিয়া এবং তাদের প্রণোদনা প্রাপ্ত সুশীলদের অনুভূতি শক্তি তখনই সরব হয়ে ওঠে যখন কোন ঘটনা বা চিত্রকে বিশেষ একটি জাতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়। এ কারণেই ইউরোপ, আমেরিকা, এমনকি আমাদের বঙ্গদেশেও কোন বোমা ফুটলে তার দায় চোখ বন্ধ করে সুশীল এবং তাদের সমমানসিকতার লোকেরা ধর্মবিশেষের ওপর চাপিয়ে দেয়। এবং তাদের সেই মুখস্থ বক্তব্যমালাকে ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে একটা সত্য রূপ দান করে আমাদের মিডিয়া। মিডিয়ায় প্রশ্রয় না পেলে তাদের বকবাজি কখনই কোন ভিত্তি পেত না। প্রচার না পেয়ে থমকে যেত তাদের মুখস্থ বিবৃতি। অতএব বড় দায়টা এখানে মিডিয়ার।

বিপরীতে ফিলিস্তিন বা কাশ্মীরে যখন আপন ভূমিতে নির্বাসিত জনগণ প্রতিবাদমুখী হয়ে ওঠে তখন পশ্চিমা এবং তাদের অনুগামী মিডিয়ায় তারা শিরোনাম পায় “সন্ত্রাসী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী”। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর প্রত্যেকটিতে লক্ষ লক্ষ শিশুর প্রাণ অকালে ঝরতে থাকে, বিকল পড়ে থাকে মিডিয়া মোগলদের ইন্দ্রীয় ও অনুভূতি। মিডিয়ায় ছাপা হয় না স্যুটেড, বুটেড, ক্লিন সেভড কোন জঙ্গির কার্টুন। বেতনভোগী কলামিস্ট ও বিশ্লেষকেরা তখন ঘুমিয়ে থাকেন, তাদের খবর থাকে না। ধর্ষিতার মা সংবাদ সম্মেলন ডাকেন, অঝোরে কাঁদেন। মাইক্রোফোনের বুম নিয়ে হাজির হওয়ার সুযোগ চ্যানেল ওয়ালাদের হয় না, দলবিশেষের চার-পাঁচজনের ‘মহাসমাবেশ’ মহা সমারোহে যারা সম্প্রচার করে বেড়ায়।

ক্লেভর নামের একটা হাঁস অথবা বঙ্গবাহাদুর নামের একটা হাতির প্রাণের যে মূল্য মিডিয়ার কাছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের সে মূল্য নেই তাদের কাছে। অন্যথায় গত বছর আফগানিস্তানের কুন্দুজে কুরআনে হাফেজদের অনুষ্ঠানে মার্কিন বিমান হামলায় যখন ফুলের মত শিশুগুলো মুহুর্তেই নিথর হয়ে গেল তখন এই খোলসপরা মিডিয়ার কণ্ঠ সামান্য হলেও উচ্চকিত হত। সে কারণেই যে পত্রিকা বঙ্গবাহাদুর নিয়ে গুণে গুণে ২৬টা নিউজ করতে পারলো, কুন্দুজের সেই ফুলের পাঁপড়িদের নিয়ে একটা নিউজ করার সুযোগও তাদের হলো না। ডাবল স্ট্যার্ন্ডাডের এ এক উৎকৃষ্ট নমুনা।

পূর্ববর্তি সংবাদদিনাজপুরে বাল্যবিয়ে পড়ানোর দায়ে ইমাম কারাগারে, ছাড় পেলেন আয়োজকরা
পরবর্তি সংবাদঝিনাইদহে পুড়ে গেছে ৬ কৃষকের পানের বরজ