দাওয়াতের কাজে সহযোগিতা করতেই ওলামা-তলাবার এই জাগরণ

শাহ মুহাম্মদ খালিদ ।। টঙ্গী ময়দান থেকে

টঙ্গী ময়দানের পাশ্ববর্তী কোনো উঁচু ভবনে উঠে চোখ মেলতেই দেখা যায় নয়ন জুড়ানো দৃশ্য। আদিগন্ত বিস্তৃত শামিয়ানার নিচে যিকিরে ফিকিরে ব্যস্ত লক্ষ লক্ষ মানুষ। অন্তর্বর্তী সড়কগুলোতেও নিজ নিজ প্রয়োজনে চলমান অসংখ্য মানুষ। এদের মধ্যে যেমন আছেন সাধারণ মানুষ, তেমন আছেন মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকগণ।

দাওয়াতি কাজের সঙ্গে উলামায়ে কেরামের সংযুক্তি একদম সূচনা থেকেই। সাম্প্রতিক সময়ে তাবলিগের কাজে কওমি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের মনোযোগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা চেষ্টা করছেন তাবলিগ জামাতকে চলমান সংকট থেকে বের করে আনতে।
তাবলিগের সাম্প্রতিক সংকট এবং চলমান বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে তাদের মতামত ও চিন্তা জানতে ইজতেমার মাঠে দেশের কয়েকটি মাদরাসার কয়েকজন ছাত্রের মুখোমুখি হয়েছিলেন ইসলাম টাইমসের প্রতিবেদক। পাঠকের জন্য রইল তার চুম্বক অংশ।

ক. ৬নং খিত্তায় দেখা হয় মুশতাক আহমদ নামে এক ছাত্রের সঙ্গে দেখা তিনি ঢাকার জামেউল উলুম মাদরাসায় মেশকাত জামাতে পড়ছেন। তিনি জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০০ ছাত্রের একটি জামাত ইজতেমায় শরিক হয়েছে। মাদরাসায় তাবলিগের নিয়মতান্ত্রিক কাজ আগ থেকেই চালু আছে। ‘আগ থেকে কাজের সাথে নেই, এখন সাদ সাহেবের কথায় স্বার্থে আঘাত লেগেছে বিধায় হুজুররা তাবলিগের কর্তৃত্ব নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে’ এমন অভিযোগ তোলা হলে তিনি বলেন, এটা চরম পর্যায়ের মিথ্যাচার। তাবলিগের এই প্রচলিত ধারার সূচনা হয়েছে ওলামা কেরামের মাধ্যমে। তখন থেকেই ওলামায়ে কেরাম কমবেশি এই কাজে যুক্ত হয়ে আছেন। বিশেষ করে তাবলিগের বিরুদ্ধে যখনই যে কেউ কোনো অভিযোগ তুলতে চেয়েছেন তখন ওলামায়ে কেরামের সবার আগে কোরআন ও হাদিসের আলোকে সেসব অভিযোগের খণ্ডন করেছেন।

এখন যখন স্বয়ং তাবলিগের ভেতরের একটি দল তাবলিগের মূল আবেদনকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, তখন ওলামায়ে কেরাম তাদের পূর্বের ন্যায় তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এটা তো দ্বীনের দাওয়াতকে বাঁচানোর একটি জাগরণ বলতে হবে। এটাকেই যদি কেউ বাড়াবাড়ি বলে ব্যাখ্যা করে তাহলে এটা এক ধরনের তথ্য সন্ত্রাস।

উল্লেখ্য ১ ডিসেম্বরের বর্বর হামলায় যে সমস্ত মাদরাসার ছাত্ররা সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে তাদের মধ্যে জামিউল উলুম অন্যতম। মোস্তাক আহমদ জানালেন তাদের ৬৫ জন ছাত্র তখন আহত হয়েছিল যাদের অনেকে এখনও হাসপাতালে ছাড়তে পারেননি। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যবস্থা মাদরাসা এবং স্থানীয় হকপন্থী তাবলিগি সাথীদের সমন্বয়ের মাধ্যমে হয়েছে।

খ. সাভার রাজফুলবাড়িয়া মাদরাসা। দেশের অন্যতম দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এটি। এই মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের ছাত্র জাকির হাসানের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। এই মাদরাসা থেকে হাজারের কাছাকাছি ছাত্র ইজতেমায় অংশ নিয়েছে বলে জানান তিনি। প্রতিবছরই কী এই পরিমাণ ছাত্র অংশ নেন নাকি এই বছর বেশি ছাত্র অংশ নিয়েছেন –জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিবছরই এই পরিমাণ ছাত্র তাদের মাদরাসা থেকে ইজতেমায় অংশগ্রহণ করেন।

কারণ, মাদরাসার শিক্ষকরা তাদেরকে সব সময় তাবলিগের কাজে সম্পৃক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করেন। তারা বলেন, দ্বীনি কাজের মূল দায়িত্ব উলামায়ে কেরামের। সুতরাং দ্বীনি কোনো কাজ থেকে পিছিয়ে থাকা যাবে না।

গ. ফরিদাবাদ দেশের সুপরিচিত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের তাবলিগি কার্যক্রমের যিনি আমির, কথা হলো সেই ভাই আবু রায়হানের সাথে। ফরিদাবাদ থেকে এবার প্রায় আটশো ছাত্র অংশ নিয়েছে ইজতেমায়। নামাজের মিম্বরের আশপাশের যে জায়গাটা প্রতি বছর উন্মুক্ত থাকে, দেখা গেল সেখানে এবার ফরিদাবাদ, হাটহাজারী, নানুপুরসহ বড় বড় অনেক মাদরাসার সাথীরা অবস্থান করছেন। আবু রায়হান জানালেন, জায়গার সংকটের কারণেই মুরুব্বিরা আমাদের এখানে জায়গা দিয়েছেন। ফলে অন্যান্য বছরের মতো এবার নামাজের মিম্বরের সামনে খালি জায়গা নেই। এমনকি আগে যেখানে বিভিন্ন রকম খুসুসি (বিশেষ) বয়ান হত। বয়ানের মিম্বরের সামনের জায়গাও এবার সংকুচিত করে ফেলতে হয়েছে।

তাবলিগ জামাতের কাজে উলামায়ে কেরামের অংশগ্রহণ বেড়েছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন এই সময়ের তরুণ আলেমরা? তারা মনে করেন, তাবলিগের কাজে উলামায়ে কেরামের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ কিছু কমে যাওয়ায় তাতে বিভিন্ন ধরনের অসংগতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলো। আল হামদুলিল্লাহ! উলামায়ে কেরামের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করায় সেই ভয় দূর হয়েছে। মূলত উলামায়ে কেরামের অংশগ্রহণ তাবলিগ জামাতকে আরও সজীব করবে এবং নির্ভুল গন্তব্যে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

ঘ. উত্তরার বায়তুস সালাম মাদরাসার জালালাইনের শিক্ষার্থী রিদওয়ান বিন মর্তুজার সাথেও কথা হলো। তিনি মাদরাসার তাবলিগি কাজের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানালেন। তার বর্ণণায় বায়তুস সালামে নিয়মমাফিক তালিম, মাশওয়ারা, গাশত, শবগুজারির আমল হয়। শিক্ষকরা তাদেরকে এসব কাজে গুরুত্বের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে বলেন। তারা বলেন, ছাত্রজীবনে তাবলিগের কাজে অংশ নিলে, পরবর্তীতে দ্বীনের অনেক কাজ করা সহজ হবে। কারণ, তাবলিগের কাজ সমাজের মানুষ এবং তাদের দ্বীনি হালাত (অবস্থা) জানতে সাহায্য করে।

এছাড়াও জামিয়া শারইয়্যা মালিবাগ, জামিয়া রাহমানিয়া, মাদানীনগর এবং আরও বেশকিছু মাদরাসার ছাত্রদের সাথে কথা বলে একই রকম তথ্য জানা গিয়েছে।

পূর্ববর্তি সংবাদইজতেমায় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে র‌্যাবের নির্দেশনা
পরবর্তি সংবাদসরকারের সমালোচনাকারীরা রাষ্ট্রদ্রোহী হতে পারে না: মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান