ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হলে সেই সংস্কৃতি পালনে দোষের কিছু নেই: মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ

ধর্ম ও সংস্কৃতির কী সম্পর্ক ? সংস্কৃতি আগে না ধর্ম আগে? এবং নববর্ষের সংস্কৃতিতে মুসলমানদের জন্য করণীয় কী?- এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলেছেন মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার রঈস ও মাসিক আল কাউসার-এর সম্পাদক মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ। ইসলাম টাইমসের পক্ষে তার সামনাসামনি হয়েছেন শরীফ মুহাম্মদ

 

ইসলাম টাইমস: ধর্ম ও সংস্কৃতির সংজ্ঞা এবং এ দুটি বিষয়ের সম্পর্কটা কী, এ বিষয়ে আপনার কাছ থেকে জানতে চাই।

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ আবদুল্লাহ: ধর্মের পরিচিতি বা সীমানা সম্পর্কে মোটামুটি সবাই জানেন। বিশেষত ইসলামের পরিচিতি ও সীমানার বিষয়টি স্পষ্ট। কিন্তু সংস্কৃতির কোনো নির্দিষ্ট আওতা বা সীমানা দেখা যায় না। সংস্কৃতি বিক্ষিপ্ত একটা বিষয়, বিভিন্ন সময়ে মানুষ বিভিন্ন বিষয়কে নিজের সংস্কৃতির অংশ মনে করে এবং দাবি করে। আবার দেশে দেশে এমন বহু আচরণ ও অনুষ্ঠানকেও সংস্কৃতি বা তাহযীবের অংশ মনে করা হয়,  যেসবের সম্পর্ক রয়েছে ধর্মের সাথেও। উদাহরণ হিসেবে মেয়েদের মাথায় ঘোমটা দেওয়ার কথা বলা যায়। এটাকে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ বলা হয়। ইসলামের বিধানেও দেখি মেয়েদেরকে মাথা ঢাকতে বলা হয়েছে। এরকম সংস্কৃতিকে মুসলমানদের স্বাভাবিক সংস্কৃতি বলা যায়।

 

ইসলাম টাইমস: ধর্ম ও সংস্কৃতি কি একই সঙ্গে অনুসরণ করা যায় ? অথবা যায় না?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ আবদুল্লাহ: সংস্কৃতি যখন স্বাভাবিকভাবে ধর্মীয় চিন্তা ও নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সেই সংস্কৃতি পালনে দোষের কিছু নেই। যেমন আপনি দেখবেন, ঈদের সময় দলবেঁধে মানুষ বাড়ি ফেরার যে আচরণটি করে এটিও এদেশের একটি সংস্কৃতির মতো। কোনো আলেম বলেননি, এই বাড়ি ফেরার সংস্কৃতিটা বিদআত। আরেকটি উদাহরণ দেখুন,  ঈদের দিন বড়রা ছোটদেরকে যে ‘ঈদি’ দিয়ে থাকে,  ঈদ উপলক্ষে উপহারের টাকা দিয়ে থাকে,  এটাকেও নিষিদ্ধ কোনো কাজ হিসেবে বলা হয় না। এটাও একটা সংস্কৃতি। এ জাতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মের কোন বিরোধ নেই।

 

ইসলাম টাইমস : সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মের বিরোধটা কীভাবে তৈরি হয়?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ আবদুল্লাহ: ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ নয় এমন যে কোনো সংস্কৃতি ততক্ষণ পর্যন্ত পালন করা যায় যতক্ষণ তাতে ইসলাম পরিপন্থী ভিন্ন রকম কিছু দাঁড়িয়ে না যায়। সমস্যাটা তৈরি হয় তখন যখন এমন কিছু বিষয়কে সংস্কৃতি হিসেবে চালু করা হয় বা চালু করার চেষ্টা করা হয় যা মানুষের ধর্মবিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। এখানে ধর্ম বিশ্বাস বলতে ইসলাম-এর কথাই বলছি। এখানে এ প্রশ্নটি সামনে চলে আসে যে সংস্কৃতি এবং ধর্ম যদি পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায় তখন মানুষ কোনটাকে প্রাধান্য দেবে? স্পষ্ট উত্তর হলো, একজন বিশ্বাসী মুসলমান এক্ষেত্রে তার ধর্মকেই আঁকড়ে ধরবে। ধর্ম তার কাছে আগে, সংস্কৃতির বিষয়টা পরে।

 

ইসলাম টাইমস: সংস্কৃতির চেয়ে ধর্মের ব্যাপকতা ও বিস্তৃতির কারণটা কি একটু ব্যখ্যা করবেন?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ আবদুল্লাহ: সংস্কৃতি গড়ে ওঠে অঞ্চল, গোত্র, দেশ, ভাষা-এগুলোকে কেন্দ্র করে। পক্ষান্তরে ইসলাম হলো গোটা পৃথিবীব্যাপী ধর্ম ও জীবনব্যবস্থা। আদম আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন। তাকে পুরো পৃথিবীর ভাষা শিখিয়েছেন। তেমনই শেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নাযিল হয়েছে কুরআন কারীম। সেই কুরআনে কারীমে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন গোত্র, বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে যেন তারা পরস্পরকে চিনতে পারে। শুধু পরিচয় সুবিধার্থে এই ভিন্নতা। কিন্তু এই গোত্র, ভাষা বা অঞ্চলের কিছুই মানুষের জন্য শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক বা কারণ হতে পারবে না। বরং আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মাঝে শ্রেষ্ঠ সে-ই, যে তোমাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকী।( হুজুরাত -১৩)

এতে বোঝা যায় অঞ্চলভিত্তিক  বা ভাষাভিত্তিক কোনো সংস্কৃতি গ্রহণের বেলায় মুসলমানের জন্য অধিকার বা সুযোগ থাকবে ততটুকুই যতটুকু তার ধর্ম বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক না হবে। তাছাড়া হাদীস শরীফেও স্পষ্ট নির্দেশনা আছে- ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক কোনো সংস্কৃতি মুসলমানের পক্ষে মান্য করা, পালন করা যাবে না। অথচ এখন নতুন একটা প্রবণতা চোখে পড়ছে যে ধর্ম ও সংস্কৃতিকে ভিন্ন ও স্বতন্ত্র চোখে দেখা হচ্ছে। ভাবখানা এমন- আচরণ বা অনুষ্ঠানটি যদি সংস্কৃতিতে থাকে তাহলে সেটা পালনযোগ্য। ধর্ম এ বিষয়ে কী বলল- সে দিকে তাকানোর দরকার নেই।

 

ইসলাম টাইমস: এদেশে কি ধর্মীয় বিবেচনায় মিশ্র সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ থাকতে পারে না? বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের বসবাস এখানে?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ আবদুল্লাহ: আমাদের আশপাশের দেশগুলোর সংখ্যাগুরু মানুষের ধর্ম ও জীবন ধারা ভিন্ন, আচার-অনুষ্ঠান ভিন্ন। এদেশের মুসলমানদের অনেকেরই পূর্বপুরুষ ওইসব সম্প্রদায় থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হয়েছেন। আঞ্চলিক প্রভাবে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের জীবনেও শুরুর দিকে কিছু কিছু পুরনো রীতি ও আচার-অনুষ্ঠান রয়ে গিয়েছিল । এদেশে শত বছর আগে কোনো কোনো মুসলমান ধুতি পরত বলেও জানা যায়। কিন্তু যুগে যুগে আলেম-ওলামা, সুফি-দরবেশ,  ওলি-আউলিয়া ও দাঈরা সেসব ভুলকে চিহ্নিত করে গিয়েছেন কুসংস্কার হিসেবে। মনীষীদের দাওয়াত,  তাবলীগ ও ইসলাহের কারণে বেশিরভাগ মুসলমান সেসব ‘প্রভাব’ বর্জন করেছে। আগের ধর্মের আচার- আচরণ ও অনুষ্ঠান থেকে নিজেদের সরিয়ে এনেছে। কিন্তু পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা এখন এমন একটা আগ্রাসী আয়োজন বিস্তার করে রেখেছে যে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার স্বার্থে গণ মানুষের ধর্মীয় উৎসব, সভ্যতা,  সংস্কৃতি কোনোটাকেই তাদের স্বারূপে থাকতে দিচ্ছে না। উল্টাপাল্টা করে দিচ্ছে। রমজানে-ঈদে দেখবেন, বিজ্ঞাপন,  মার্কেটিং,  কেনাকাটার এমন এক উত্তাপ তৈরি করা হয়- মনে হয়,  এসবের জন্যই রমজান ও ঈদ। অথচ ব্যাপারটা এমন নয়। এই পবিত্র ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ইবাদত ও উৎসবগুলিকেও পুঁজিবাদ নিছক হই-হুল্লোড় ও তামাশার বিষয় বানিয়ে দিতে চাচ্ছে।

 

ইসলাম টাইমস: আপনি কি মনে করছেন, পুঁজিবাদ আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিতেও হস্তক্ষেপ করছে?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ আবদুল্লাহ: পুঁজিবাদ সংস্কৃতির নামে নতুন নতুন আগ্রাসনের পথ খুলে দিচ্ছে। পুরনো অনেক পরিত্যক্ত জিনিসকে সামনে নিয়ে আসছে। একসময় মিশ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন একটি ভাগ হয়ে গিয়েছিল যে এই সংস্কৃতি এরা মানবে, ওরা মানবে না, এটা এদের জন্য পালনীয় সংস্কৃতি,  ওটা ওদের জন্য পালনীয় সংস্কৃতি। সেসব পরিচ্ছন্ন ও প্রয়োজনীয় স্বচ্ছ বিভক্তি মুছে দিয়ে তারা তাদের প্রয়োজনে সব একাকার করে দিচ্ছে। এভাবে তারা ধর্মীয় বিশ্বাস ও জীবনকেও বিশৃংখল করে তুলেছে। এইসব বিশৃংখলা আমদানির সঙ্গে আবার বিভিন্ন রকম ব্রান্ডও যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে,  এটা বাঙালি সংস্কৃতি। বলা হচ্ছে, অমুক সংস্কৃতি পালন না করলে সে বাঙ্গালি থাকবে না।

আপনি দেখবেন, দুই আড়াই দশক আগেও বাংলা নববর্ষ কীভাবে উদযাপিত হতো। গ্রামে বৈশাখের কিছু অনুষ্ঠান পালন হতো হিন্দু পাড়াগুলোতে। এসবে মুসলমানরা খুব একটা যোগ দিত না। মুসলিম পরিবারের অতি উৎসাহী কোনো তরুণ সেসব অনুষ্ঠানে যোগ দিলেও সেটা ভালো চোখে দেখা হতো না। মনে করা হতো,   সে অপর ধর্মীয় একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে। অথচ সম্প্রতি এই বৈশাখ উপলক্ষে টাকাকড়ি খরচ,  মার্কেটিং,  সাজসরঞ্জাম বেচাকেনার নানা উৎসব লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুসলমানদের ধর্মীয় রীতিনীতির পরিপন্থী এসব পুঁজিবাদী আয়োজনে শুধু কিছু লোকের পকেট ভারী হচ্ছে। আর যেসব নাগরিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে সংসার চালায় এসব নতুন আমদানি করা সংস্কৃতির দাবি দাওয়া পুরণে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাংলা নববর্ষের নতুন আয়োজনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রভাবটা বড়। লক্ষ করলেই এর নানা রকম বিষফল চোখে পড়ে। নারী-পুরুষকে পথে নামিয়ে দিয়ে অবাধ মেলামেশার ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। ওঁৎ পেতে থাকা লোকেরা তখন মা-বোনদের সম্ভ্রম নষ্ট করে। চেষ্টা করেও এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না প্রশাসন। এভাবে এমন অনেক কিছুই বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয় যেগুলো আসলে বাঙালি সংস্কৃতিরও অংশ নয়। অথবা একসময় কোনো একটি আচরণ বাংলার একশ্রেণীর মানুষের সংস্কৃতি ছিল, পরে ধর্মীয় কারণে সেটার ভিন্নতা জল -পানির মতো আলাদা ও পরিষ্কার হয়ে গেছে, সেটাকে মুসলমানদের মধ্যে পুনঃস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সুতরাং বাঙালি মুসলমানদের সতর্ক থাকতে হবে, সাংস্কৃতিক সব বিশৃংখলায় যোগ দেওয়ার আগে দেখতে হবে আমার দ্বীন,  আমার ঈমান,  আমার ধর্ম কী বলেছে। তারপর সংস্কৃতি, ধর্মের অনুগামী হয়ে যে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে সেই সংস্কৃতি। আমাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন সেই রব আল্লাহর বিধান ও নির্দেশনা মান্য করার বিষয়টি আগে। সংস্কৃতির বিষয়টি তার পরে।

 

ইসলাম টাইমস: বাংলা সালের উদ্ভব তো হিজরী সালের অনুসরণে। নববর্ষের সংস্কৃতিতে এর কোনো প্রভাব থাকা  উচিত বলে মনে করেন কি?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ আবদুল্লাহ: হ্যাঁ, বাংলা সালের সূচনা তো হিজরী সালের অনুসরণেই। যারা বাংলা নববর্ষের সংস্কৃতির নামে নানান রকম পৌত্তলিক প্রতীক ও আয়োজন করে থাকে তাদের তো উচিত এসব না করে হিজরি সাল,  হিজরত,  ইসলামের প্রেরণার প্রতি সেই শ্রদ্ধাটা বজায় রাখা। অথচ উল্টা নববর্ষ পালনের নামে ইসলামের সাথে, দ্বীনের সাথে সাংঘর্ষিক অনেক কিছুই যুক্ত করা হয়ে থাকে। কোথাও শিরক থাকে,  কোথাও থাকে শিরকের সাথে সাদৃশ্য, কোথাও অবাধ মেলামেশা। এটা তো ইনসাফ হলো না।

আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, এই যে বিভিন্ন পৌত্তলিক প্রতীক ও প্রতিকৃতির বিষয়টিকে অনেকেই তেমন ক্ষতিকর ও দোষণীয় কিছু মনে করতে চান না। তাদের জানা থাকা দরকার,  পৃথিবীতে পৌত্তলিকতা কিন্তু আগে ছিল না। এভাবে বানানো প্রতিকৃতি দেখে দেখেই মানুষ একদিন পৌত্তলিক হয়ে উঠেছে। এরপর এই পৌত্তলিকতার প্রচলন করা হয়েছে। এটা কোনো হালকা বিষয় নয়। সংস্কৃতির নামে মুসলমানদের মাঝে পৌত্তলিকতার কোনো কিছুরই অনুপ্রবেশ ইসলাম অনুমোদন করে না।

 

 

পূর্ববর্তি সংবাদহাইয়াতুল উলইয়ার চলমান পরীক্ষা বাতিল, নতুন সময়সূচি ২৩ এপ্রিল থেকে ৩ মে
পরবর্তি সংবাদমৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় কাভার্ডভ্যানের চালকসহ তিনজন নিহত