তারিক মুজিব ।।
জামিয়া কাসিমুল উলূম দরগা মাদরাসা। পূর্বনাম মাদরাসা তালিমুল কুরআন। সিলেটে হযরত শাহজালাল ইয়ামেনি রহ.-এর মাকবারার পাশে কালের সাক্ষী হয়ে থাকা যে প্রতিষ্ঠান ছয় দশক যাবত অসংখ্য ইলম পিপাসুর পিপসা নিবারণ করছে সেটিই জামিআ কাসিমুল উলম। দরগা মাদরাসা নামেই দেশব্যাপী প্রসিদ্ধ।
সিলেট শহর ঐতিহাসিকভাবেই ইসলাম চর্চার উর্বর ভূমি। খ্রিস্টিয় দশম শতকে শাহজালাল রহ. ইয়েমন থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে হিজরত করে বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে আসেন। এসময় তাঁর সাথে ছিলেন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হিজরত করে আসা তাঁর অনেক মুরিদ ও বন্ধুজন। সিলেটের জালিম রাজা গৌড় গোবিন্দকে পরাজিত করে সে অঞ্চলে অনেক মসজিদ, মকতব ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকেই যুগ পরম্পরায় সিলেটে মাদরাসা শিক্ষার চর্চা অব্যাহত থাকে।
মাওলানা আকবর আলী রহ.। দেওবন্দের মোহতামিম কারী তয়্যৈব সাহেব রহ.- এর বিশিষ্ট খলিফা। সিলেটের বিয়ানীবাজারে জন্ম নেওয়া এ আলেম সে অঞ্চলে ইমামসাহেব হুযুর নামেই পরিচিত। ১৯৪৬ সাল থেকে ইনতিকাল পর্যন্ত ৬০ বছর তিনি দরগা মসজিদের ইমাম ছিলেন।
১৯৫৮ সাল। মাওলানা আকবর আলী রহ.- এর উস্তায পাকিস্তানের বিখ্যাত মুফতি শফি রহ. সিলেট সফরকালে তাঁর একান্ত ছাত্র দরগা মসজিদের ইমাম সাহেবকে বললেন, “তুম এহা মাদরাসা শুরু কর দো, মুজে এহা বরকত মা’লূম হু রাহে হ্যা”। ইমাম সাহেব স্থানীয় বিদআত, রুসুমাতের বিষয় উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করলে মুফতি শফি রহ. বললেন, ‘আব শুরু কার দে, দেইখে, আল্লাহ মদদ কারে’।
তখন ইমাম সাহেব এলাকার ছোট ছোট বাচ্চাদের মসজিদে কুরআন পড়ানো শুরু করলেন। পরে ১৯৬১ সালে বর্তমান কাঠামোতে মাদরাসা স্থানান্তর করা হয়। নাম দেয়া মাদরাসা তালিমুল কুরআন। মুসলিম লীগ নেতা মুহিউন্নাহ চৌধুরি মাদরাসার নামে অনেক জায়গা ওয়াকফ করে দেন।

পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে মাওলানা আতহার আলী রহ. জেল থেকে মুক্তি পেয়ে সিলেট আগমন করেন। এসময় কারী তয়্যৈব রহ. সিলেটে আসলে তাঁর মাধ্যমেই হাদীসের সবকের উদ্বোধন করা হয়। ১৯৭৭ সাল থেকে নিয়মতান্ত্রিকভাবেই দাওরায়ে হাদীস বিভাগ খোলা হয়। কারী তৈয়্যব রহ.- এর পরামর্শক্রমে বিখ্যাত হাদীস “ইন্নামা আনা ক্বাসিম” -এর ভিত্তিতে তালিমুল কুরআন থেকে মাদরাসা কাসিমুল উলূম নামকরণ করা হয়। আরো পরে জামিআ শব্দ যোগ করা হয়।
সিলেটের অপর বিখ্যাত আলেম জাতীয় মসজিদ বাইতুল মুকাররমের সাবেক খতীব উবাইদুল হক রহ. কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ১৯৮৬ সালে মাদরাসার পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষাদান পদ্ধতির পরামর্শ সম্বলিত একটি প্রসপেক্টাস নির্ধারণ করে দেন। শুরু থেকেই মাদরাসার পৃষ্ঠপোষকতার সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। ১৯৮৭ সালে তাঁকে মাদরাসার শায়খুল হাদীস হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ২০০৭ সালে ইনতিকালের আগ পর্যন্ত ৩০ বছর তিনি এ মাদরাসায় বুখারী পড়ান।
২০০৫ সালে ইমামসাহেব হুযুর খ্যাত মাওলানা আকবর আলী রহ. ইনতিকাল করলে মাদরাসা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় মাওলানা আবদুল হান্নান সাহেবকে। ৫ বছর পর মাদরাসা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিদগ্ধ আলেম মাওলানা আবুল কালাম যাকারিয়া রহ.। মাদরাসা পরিচালনার পাশপাশি জামিআর প্রধান মুফতির দায়িত্বও পালন করতেন সিলেটের এ মুহাক্কিক আলেম। গতবছর তিনি ইননতিকাল করেন।
আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের কেন্দ্রীয় সকল পরীক্ষায় দরগা মাদরাসার ফলাফল সবসময় ঈর্ষণীয়। সম্প্রতি প্রকাশিত গত শিক্ষাবর্ষের হাইআতুল উলয়ার অধীনে অনুষ্ঠিত দাওরায়ে হাদীসের পরীক্ষায় দরগা মাদরাসা থেকে ৫ জন মেধাতালিকায় স্থান পেয়েছে।
দরগা মাদরাসার ৩০ বছরের উস্তায, খতীব উবাইদুল হক রহ.- এর সন্তান মাওলানা আতাউল হক জালালাবাদীর সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
মাওলানা জালালাবাদী বলেন, মাদরাসার প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট করাচি থাকাকালে শায়খুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানি আমাকে অবহিত করেন। ১৯৫৮ সালের মুফতি শফি রহ.-এর সাথে সিলেট সফরে তিনিও উপস্থিত ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, দরগা মাদরাসার সাথে আমার ৪৮ বছরের জীবন। ১৫ বছর অধ্যয়ন। ৩০ বছর অধ্যাপনা। মাঝে ৩ বছর করাচী পড়াকালেও দূর থেকে সম্পর্ক ছিল।
















