এনাম হাসান জুনাইদ ।।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে এক বিশেষ ধরনের ডায়ালেক্ট বা উপভাষায় লেখা কবিতাই ‘মিঞা কবিতা’ হিসাবে পরিচিত।
উর্দুতে ‘মিঞা’ বলতে বোঝায় সম্ভ্রান্ত মুসলিম ব্যক্তিকে, কিন্তু আসামে এই শব্দটি আসলে একটি বর্ণবাদী গালাগাল – যা অবৈধ অভিবাসী বা বাংলাদেশীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
‘মিঞা কবিতা’ ধারার কবিতাগুলোতে মূলত আসামের সাধারণ মানুষের সামাজিক বঞ্চনা ও নির্যাতনের ছবিই ফুটে উঠে।
২০১৬তে প্রথম মিঞা কবিতাটি লিখেছিলেন একজন শিক্ষক হাফিজ আহমেদ। এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী তৈরি করাকে কেন্দ্র করে বাঙালি মুসলিমরা যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তারই প্রতিবাদ ছিল হাফিজ আহমেদের কবিতা।
তারপর এই কবিতা লেখার ধারা দ্রুত জনপ্রিয় হতে থাকে, নেলির গণহত্যা থেকে ধর্ষিতা মুসলিম নারীর কাহিনী কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে আসে।
হাফিজ আহমেদের ‘মিঞা কবিতা’টি দেখুন-
লিখ
লিখে রাখ
আমি একজন মিঞা
এনআরসি-র ক্রমিক নং ২০০৫৪৩
দুই সন্তানের বাবা আমি
সামনের গ্রীষ্মে জন্ম নেবে আরও একজন
তাকেও তুমি ঘৃণা করবে কি
যেভাবে ঘৃণা কর আমায়?
মূল কবিতা—
লিখা
লিখি লোয়া
মই এজন মিঞা
এনআরসি-র ক্রমিক নং ২০০৫৪৩
দু’জন সন্তানর বাপেক মই
অহাবার গ্রীষ্মত লব আরু এজনে
তাকো তুমি ঘিন করিবা নেকি
যিদরে ঘিন করা মোক?
কবি চান মিঞার লেখা একটি কবিতা দেখুন “আইজকা আমি আমার নাম জানি না” –
আবার ডিটেনশন ক্যাম্পে বসে মনে পড়ল
হায়রে, এই বিল্ডিংটা তো আমিই বানিয়েছিলাম
এখন আমার কিছু নাই
মাত্র আছে একজোড়া পুরানো লুঙ্গি, আধপাকা দাড়ি
আর দাদার নাম থাকা ছেষট্টি’র ভোটার লিস্টের এফিডেফিট কপি।
আরেকটি উদাহরণ দেখুন, 
যে দেশ আমার বাবাকে বিদেশি বানায়
যে দেশ আমার ভাইকে গুলি করে মারে
যে দেশে আমার বোন মরে গণধর্ষণে
যে দেশে আমার মা বুকে আগুন চেপে রাখে
সেই দেশ আমার, আমি সেই দেশের না।
এগুলো আসামের ভাষায় রচিত বিভিন্ন কবিতার অনুবাদ। এভাবেই আসামের সাধারণ মানুষ তাদের মনের অব্যক্ত ব্যথাগুলো গ্রামের সহজ সরল ভাষায় ব্যক্ত করেন।
মিঞা কবিতা নিয়ে কেন এত বিতর্ক তা মিঞা কবিতার বিষয়গুলোই বলে দেয়। মিঞা কবিতার মাধ্যমে আসামে মুসলমানদের নিপীড়িত হওয়ার যে ছবি ফুটে ওঠে তা আসলে সেখানকার এক বিশেষ মহলের গায়ে জ্বালা ধরার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বলা হয়, ‘মিঞা কবিতা’ র মাধ্যমে নাকি ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। দিনচারেক আগে এই মর্মে এফআইআর দায়ের হওয়ার পর রাজ্য পুলিশ এখন জনাদশেক মিঞা কবিকে খুঁজছে।

এক সময় মিঞা, মিঞা নামে চূড়ান্ত তাচ্ছিল্য করা হল যাদেরকে, নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতর হিসেবে যাদের দেখানো হল, আজ যখন তারাই বলা শুরু করল, হ্যাঁ, মেনে নিলাম, আমরা মিঞা। মেনে নিলাম, আমরা ‘চরুয়া’। কিন্তু চরুয়াদেরও যন্ত্রণা আছে, দয়া করে শুনুন। আমরা বাংলাদেশি নই। ভারতীয়। আমরা অসমের নিবাসী সেই পূর্বপুরুষদের রক্ত বহন করছি। শস্য আবাদ করেছি। রক্ত ঘামে মোড়া শ্রম দিয়েছি। এই দেখুন পাট্টা। এই দেখুন দাদির সিন্দুকে তুলে রাখা কাগজ। জাতি হিসাবে আপনাদেরই কথামতো ‘অসমীয়া’ লিখেছিলাম ‘৫১ সালের লোকগণনায়। এবারে অন্তত স্বীকৃতিটুকু দিন। ইতিহাস স্মরণ করুন। আজ যখন প্রতিবাদ শুরু হল, তখন তাদের বিরুদ্ধে আনা হল সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর অভিযোগ।
মিঞা কবিতা মূলত আসামে মুসলমানরা প্রতিনিয়ত যে অপমান, ঘৃণা, শোষণ, বঞ্চনার শিকার হন সেগুলোর নীরব প্রতিবাদ। নিজেদের যন্ত্রণাগুলো, অসহায়ত্ব নিয়ে তাঁরা কথা বলছিলেন, নিজেদের ফেসবুকের পাতায় একের পর এক, সেই ধারাভাষ্যগুলো লিখছিলেন নিজের ঘরের ভাষায়, মায়ের ভাষায়, নিজেদের দোয়ানে।
কিন্তু আসামের উগ্র জাতীয়তাবাদ, অসম সাহিত্য সভার কর্ণধারদের কি তা সহ্য হয়! তাই তো মিঞা কবিদের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছেন সেই বিশেষ কিছু চিন্তাবিদ এবং শাসক দল বিজেপির নেতারা।
অবলম্বনে : বিবিসি এবং আসামের কিছু অনলাইন পত্রিকা
















