শুরু হচ্ছে ‘আশরায়ে যিলহজ্ব’ বছরের শ্রেষ্ঠ দশক

মুহাম্মাদ ত্বহা হোসাইন ।।

সময়ের প্রতিটি অংশই মূল্যবান। কোনো অংশই অবহেলা করার মতো নয়। সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানোর দ্বারাই সফলতা অর্জন করা সম্ভব। এটা যেমন পার্থিব ক্ষেত্রে সত্য তেমনি সত্য আখিরাতের ক্ষেত্রেও। তাই জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত অত্যন্ত- মূল্যবান। তবে আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ যে, তিনি বান্দার ফায়েদার জন্য কিছু সময়কে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। তাই কিছু সময়, কিছু দিন এমন রয়েছে, যা অন্য সময়ের চেয়ে অধিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও মহিমাময়। আসন্ন ‘আশরায়ে যিলহজ্ব’ ও ‘আইয়ামে তাশরীক’ অর্থাৎ যিলহজ্বের প্রথম তেরটি দিন এমনি মহিমান্বিত ও অর্জনের মৌসুম।

যিলহজ্বের প্রথম দশককে পরিভাষায় ‘আশরায়ে যিলহজ্ব’ বলে। এই দশ দিন হচ্ছে বছরের সর্বোত্তম দশ দিন। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআন মজীদে এই দশকের রজনীগুলোর শপথ করে বলেছেন, (তরজমা) ভোর বেলার কসম আর কসম দশ রাত্রির।-সূরা ফজর : ১-২ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. ও মুজাহিদ রাহ.সহ অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও মুফাসসিরের মতে এখানে দশ রাত্রি দ্বারা আশরায়ে যিলহজ্বই উদ্দেশ্য।

হাফেয ইবনে কাসীর রাহ. বলেন, এটিই বিশুদ্ধ মত।-তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/৫৩৫-৫৩৬

তাই অনেক ওলামায়ে কেরামের মতে পুরো বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ ‘দশক’ হল আশরায়ে যিলহজ্ব। রমযানের শেষ দশকের চেয়েও যার ফযীলত ও গুরুত্ব বেশি। কেননা যিলহজ্বের এই প্রথম দশকে এমন দু’টি ইবাদত রয়েছে যা পুরো বছরের অন্য কোনো সময় আদায় করা সম্ভব নয়। এমনকি রমযানেও নয়। এই দু’টি ইবাদতের জন্য আল্লাহ তাআলা আশরায়ে যিলহজ্বকেই নির্বাচন করেছেন।

এই দু’টি ইবাদতের একটি হল হজ্ব, আর দ্বিতীয়টি কুরবানী। কুরবানী যদিও ১১ ও ১২ যিলহজ্বেও দেওয়া যায়, কিন্তু বছরের অন্য কোনোদিন এই ওয়াজিব কুরবানী সম্ভব নয়। এই ক্ষেত্রে রমযানের শেষ দশকের চেয়ে আশরায়ে যিলহজ্বের হজ্ব ও কুরবানীর রয়েছে বাড়তি ফযীলত। আবার অনেক ওলামায়ে কেরামের মতে রমযানের শেষ দশকই উত্তম। কারণ তাতে রয়েছে হাজার মাসের চাইতে উত্তম লাইলাতুল কদরের মতো মহিমান্বিত রজনী। ওলামায়ে কেরামের এই দু’টি মতের সমন্বয় সাধন করতে গিয়ে অনেক মুহাক্কিক আলেম বলেছেন, আশরায়ে যিলহজ্বের দিন ও রমযানের শেষ দশকের রাত্রি উত্তম। এভাবে উভয় দলীলের মাঝে সমন্বয় করা যেতে পারে।-তাফসীরে ইবনে কাসীর ৩/২৩৯; ইসলাহী খুতবাত ২/১২২-১২৪; লাতায়িফুল মাআরিফ ২৯৫-২৯৬

যাই হোক, রমযানের পরে আশরায়ে যিলহজ্বের চেয়ে শ্রেষ্ঠতম কোনো দিন নেই-এটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় এবং এতে সকলেই একমত। হযরত জাবির রা. হতে বর্ণিত একটি সহীহ হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (তরজমা)‘আশরায়ে যিলহজ্বের দিনের চেয়ে কোনো দিনই আল্লাহর নিকট উত্তম নয়।’-সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস ৩৮৫৩ আর যিলহজ্বের প্রথম দশকের মধ্যে শেষ দু’দিন নবম তারিখ ও দশম তারিখ হল পুরো বছরের সর্বোৎকৃষ্ট দিন। যাকে হাদীসের ভাষায় ইয়াওমে আরাফা ও ইয়াওমে নাহর বলা হয়। -সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস : ৩৮৫৩; মুসনাদে আহমদ ৪/৩৫০ হাদীস : ১৯০৭৫

কুরআন-সুন্নাহে আশরায়ে যিলহজ্বের এই আলাদা গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্যের দরুণ এ দশটি দিন হল অর্জনের ভরপুর মৌসুম। এই দিনগুলোতে করা ইবাদত-বন্দেগী আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয়।

হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-(তরজমা) আশরায়ে যিলহজ্বের নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিন (এর কোনো আমল) নেই।’ -সহীহ বুখারী হাদীস : ৯৬৯; মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ১৯৬৮

এই হাদীস দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যায়, আশরায়ে যিলহজ্বের যে কোনো নেক আমলের চাইতে উত্তম কোনো আমল হতে পারে না। যেহেতু সাহাবায়ে কেরাম জানতেন যে, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের চেয়ে উত্তম কোনো আমল নেই তাই আশরায়ে যিলহজ্বের আমলের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা শোনার পর তারা আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘জিহাদও কি এই দশ দিনের আমলের চেয়ে উত্তম নয়?’ নবীজী জবাব দিলেন, না। জিহাদও উত্তম নয়। তবে হ্যাঁ, সেই ব্যক্তির জিহাদ এই দশদিনের আমলের চেয়ে উত্তম হতে পারে যে স্বীয় জান-মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হল। অতঃপর জিহাদের ময়দানে জান-মাল সবকিছু বিসর্জন করে দিয়ে কিছু নিয়েই ঘরে ফিরে এল না।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৯৬৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২৪৩৮; জামে তিরমিযী, হাদীস : ৭৫৮; ফাতহুল বারী ২/৫৩১-৫৩২

এর দ্বারা স্পষ্ট বোঝা গেল যে, এই দশ দিনে করা যে কোনো নেক আমল সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বোত্তম আমল।

 

পূর্ববর্তি সংবাদওসামা বিন লাদেনের ছেলে হামজা মারা গেছে
পরবর্তি সংবাদ‘‘বিশ্বে আমার মতো কম বর্ণবিদ্বেষী ব্যক্তি খুব কমই আছেন!’’