সময়ের মূল্য জীবনের পাথেয় : মাওলানা জিকরুল্লাহ খান

ইসলাম টাইমস: বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট ) বাদ এশা নাববাপুর রোডের রায় সাহেব বাজার বাইতুল ইজ্জত জামে মসজিদে সাপ্তাহিক তাফসিরুল কুরআন মজলিশে শানদার তাফসির পেশ করেন জামিয়া ফরিদাবাদের সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা জিকরুল্লাহ খান। স্থানীয় দ্বীনদার মুসল্লীসহ রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক আলেম-ওলামা ও তালিবুল ইলম এ মজলিসে উপস্থিত হন৷ মজলিসে ‘সময়রে গুরুত্ব ও আখেরাতের সামান সঞ্চয়’ বিষয়ক আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো।

সময় অমূল্য রতন৷ সময় দিয়ে আখেরাতের জীবনকে সমৃদ্ধ করুন৷ মানুষ জানেনা কতদিন বাঁচবে৷ কতদিন তার হায়াত অবশিষ্ট থাকবে। যদি জানতে পারতো তাহলে দুনিয়াবিমুখ হয়ে আখেরাতের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তো৷ কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এমন আমলকে পছন্দ করেন না৷ বরং এসব না জেনে কে কতটুকু আল্লাহমুখী হয় সেটাই তিনি দেখতে চান৷

সময় বরফের ন্যায়৷ আর বরফের দাম তখনি থাকে যখন তা গলে না যায়৷ এমনিভাবে প্রতিটি মানুষের হায়াতবরফের ন্যায় গলছে। আয়ূ কমছে৷ বরফ ব্যবসায়ীগণ বরফ গলে যাওয়ার পূর্বে বিক্রির জন্য যেমন অস্থির থাকেন ঠিক তেমনি হায়াত গলে শেষ হওয়ার পূর্বেই আখেরাতের কাজ করতে হবে৷

ছোট বেলায় আমার আম্মাজানকে আমল ও আযকারের প্রতি খুব যত্নশীল দেখতাম। রাত দুটার পর তাকে কখনো ঘুমাতে দেখিনি৷ বিশেষ করে তার জীবনের শেষদিকে খুব বেশী আমলে লেগে থাকতেন৷ রাতে ঘুমাতেন না৷ তাহাজ্জুদ, জিকির তেলাওয়াত দোয়ায় লিপ্ত থাকতেন।

আমাদের পূর্বসূরি বা আমাদের থেকে কয়েক দশক আগের লোকদের দিকে খেয়াল করুন,  তারা সময়ের প্রতি কতো ফিকিরমান্দ ছিলেন৷ একটি ঘটনা বলি, আবুল ওয়াফা ইবনে ওয়াকিল রহ.। তিনি প্রায় ত্রিশটা কিতাব লেখেছেন৷ তারমধ্যে একটি কিতাব ছিলো আটশো ভলিয়মের৷ বাকীগুলো ছিলো ত্রিশ-চল্লিশ ভলিয়মের। মহান এই সাধক অল্প হায়াতেই অনেক কাজ করে গেছেন৷ তার এসব কাজ করা সম্ভব হয়েছে সময়ের কদর করার কারণে। এক মূহুর্ত সময় তিনি অযথা ব্যয় করতেন না৷ বরং খাবার-দাবারের আয়োজনে যেন সময় কম ব্যয় হয় সেজন্য খুব সতর্ক থাকতেন।

জানা যায়, তিনি কখনো রুটি-তরকারি খেতেন না। তার না খাওয়ার কারণ ছিলো, একে তো রুটি তৈরীতে লম্বা সময় ব্যয় তারপর রুটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে তরকারীতে ভিজানো। তারপর মুখে দিয়ে ধীরে ধীরে চিবিয়ে গিলা। এই লম্বা প্রক্রিয়া শেষ করতে অনেক সময় চলে যাওয়ার আশঙ্কায় অল্প সময়ে তৈরা করা ছাতু ও আটা পানি দিয়ে গুলিয়ে সবসময়  খেতেন। যেটুকু খাওয়ার দ্বারা কোনরকম বেঁচে থাকা যায় সে পরিমাণ খেয়ে জীবনযাপন করতেন৷ বাকী সময় কিতাব পড়তেন-লেখতেন ও ইবাদাত বন্দেগীতে কাটাতেন।

একবার হযরত ওমর রা. এক ব্যক্তিকে অবসর থাকতে দেখে তার হাতে থাকা ব্যাগ দিয়ে মাথায় আঘাত করে বললেন, অবসরতা বাদ দিয়ে একটা কিছু করো৷ এভাবে অবসর থাকার সুযোগ নাই৷ হয় দুনিয়ার কাজ করো, না হয় দ্বীনের কাজ করো৷

আমার স্পষ্ট মনে আছে, অমরা দেওবন্দ পড়তে গিয়ে মাদরাসার গেইট দিয়ে ঢুকার সময়ই একটা জ্বলজ্বলে লেখা চোখে পড়ে৷ লেখাটা ছিলো “আলওয়াকতু আছমানু মিনাজ যাহাবে” অর্থাৎ সময় স্বর্ণের চেয়েও দামী৷ আমরা সেই তখন লেখাটা দেখে আসছি৷ শুনেছি এখনো সেই লেখাটা পূর্বের জায়গায় আছে।

সময়কে কাজে লাগাতে হবে। অন্যথায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। আযকার না করে শুধু দুনিয়ার পিছনে পড়লে আখেরাত শূন্য থাকবে। আখেরাতে সম্পদ শূন্য থাকলে কবরে আযাব ভোগ করতে হবে৷ কেবলমাত্র সাওয়াব আর নেক আমলই আখেরাতে আমাদের নিজস্ব সম্পদ বলে বিবেচিত হবে। দুনিয়ায় জমানো সম্পদ আমাদের বলা যাবে না৷ কারণ তা অল্প সময়েই অন্যের মালিকানায় চলে যাবে৷

শুধুমাত্র তিনটা জিনিস নিজের বলা যায়। ১. হজম হওয়া জিনিস৷ ২. ব্যবহৃত কাপড়। ৩. দান-সদকা নিজের বলে দাবী করা যায়৷ এছাড়া কোন মালামাল আমাদের নিজস্ব সম্পদ নয়৷ সুতরাং সম্পদ দিয়ে আল্লাহকে রাজী খুশি করতে হবে।  বেশী বেশী আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে৷ বেশী বেশী দোয়ার এহতেমাম করতে হবে।

রাসূল সা. দোয়া কবুল হওয়ার একটা বুদ্ধি  শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, তা হলো দোয়ার আগে এবং দোয়ার পরে দুরুদ পড়ে নেয়া৷ এই দোয় পড়ার মানে হলো, দোয়াগুলোকে ‘গিট্টা’ লাগিয়ে দেওয়া৷ সুযোগ হলে দোয়ার আগে  ও পরে দুরুদ পড়ে গিট্টা লাগিয়ে রেখে দিবো। বাকী কাজ আল্লাহ করবেন৷ তার হাবীবের উসিলা ধরে আমরা বসে থাকবো। কবুলের দায়িত্ব আল্লাহর।

আমরা কোন আমল নিশ্চিত কবুল হয়েছে বলে নিশ্চিত বলতে পারি না৷ শুধুমাত্র একটা আমল এমন আছে যা পড়া মাত্রই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়৷ সেটা হলো দুরুদ শরীফ। তাই দুরুদ বেশী বেশী পড়ার চেষ্টা করবো৷ সকাল সন্ধ্যায় জিকির-আযকার করবো। জিকিরের দ্বারাই আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক গভীর হয়৷ বান্দার সাথে যখন আল্লাহর সম্পর্ক গভীর হয় তখন আমলে মজা আসে৷ আল্লাহকে ডেকে তৃপ্ত পাওয়া যায়৷

সুতরাং দুনিয়ার জিন্দেগী নিয়ে ব্যতিব্যস্ত না হয়ে আখেরাতের অনন্ত দিনের জন্য সামানা জমা করি৷ দুনিয়ায় যে জিনিস যতো বেশী পরিমাণ প্রয়োজন সে জিনিস আল্লাহ ততো ব্যাপক করে দিয়েছেন৷ আল্লাহ আমাদের কবুল করুন৷ তার মর্জি মোতাবেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শ্রুতিলেখক: আবু দারদা

পূর্ববর্তি সংবাদহাটহাজারীতে শীঘ্রই চালু হতে যাচ্ছে ‘আল আমিন মা ও শিশু হসপিটাল’
পরবর্তি সংবাদনিজ সন্তানসহ ইমামের ঘরে তিন শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু