ওলিউর রহমান ।।
রাজধানীসহ সারাদেশেই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে কিশোর গ্যাং-এর অপতৎপরতা। দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাঙ। পুলিশের অনুসন্ধান মতে, লাড়া দে, ডিসকো বয়েজ, নাইন স্টার, ফিফটিন, ব্ল্যাক রোজ, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপারসহ এরকম শতাধিক নামের গ্যাং গ্রুপের কয়েক হাজার কিশোর এখন গোটা রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। যাদের গড় বয়স ১৬-১৭।
রাস্তার মোড়ে মোড়ে আড্ডা দেওয়া, কটূক্তি, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করা, রাস্তাঘাটে সাধারণ পথচারী ও মেয়েদের উত্যেক্ত করাসহ নানা রকম অন্যায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন গ্যাঙের এসব সদস্যরা। এমনকি আধিপত্য বিস্তারসহ অন্যান্য সামান্য বিষয় নিয়ে মারামারি, হতাহতের ঘটনাও ঘটাচ্ছে এরা। ঢাকার শিশু আদালতের বিচারিক কার্যক্রমের নথি অনুযায়ী গত কয়েক বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং কালচার ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ৮৬ টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।
সমাজের মানুষ আজ এসব গ্যাং নিয়ে উদ্বিগ্ন। বখে যাওয়া ছেলেদের অভিভাবকরা হতাশ। প্রশাসন কিশোর গ্যাং-এর বিরুদ্ধে তৎপরতা শুরু করলেও তার ফল খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। কারণ বয়স আঠারোর কম হওয়ায় দণ্ডবিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
কেন সমাজে কিশোর গ্যাং তৎপরতা ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর প্রতিকার কী তা নিয়ে ইসলাম টাইমস-এর পক্ষে কথা হয় অধ্যাপক ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন এবং রাজধানীর আরজাবাদ মাদরাসার মুহতামিম ও বেফাকুল মাদারিসের সহসভাপতি মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়ার সাথে।
অধ্যাপক ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, মাদক ইয়াবার সহজপ্রাপ্যতা সমাজে চরম অবক্ষয় সৃষ্টি করেছে। মূলত সামাজিক অবক্ষয়ের একটি ক্ষুদ্র স্বরূপ কিশোর গ্যাং অপতৎপরতা। এখন কিশোরদের হাতে হাতেও মাদক পৌঁছে যাচ্ছে। মাদক মানুষের মন-মানসিকতাকে বিকৃত করে দেয়। পাশাপাশি ফিল্মের কাহিনী-চরিত্র এবং তাতে যে অশ্লীলতা ও অবাধ যৌনতার প্রচার তা আমাদের সামাজিক নৈতিকতার ভিতকে ভেঙ্গে দিয়েছে। তাই এখন বিভিন্ন শিল্প বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানেও যে নানা প্রকারের অপকর্ম হচ্ছে এর একটা নেতিবাচক প্রভাব কিশোরদের মধ্যেও পড়েছে। তাই কিশোর অপরাধের দায় কেবল কিশোরদের নয়। বরং পরিবার ও সমাজব্যবস্থার সামগ্রিক অবক্ষয়ের ফলেই কিশোর অপরাধসহ যাবতীয় অপরাধ সংগঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সমাজে কিশোর অপরাধ ছড়িয়ে পড়ার কারণ প্রসঙ্গে মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া সংযোগ করেন, একজন শিশুর প্রথম পাঠশালা তার মা-বাবা, তার পরিবার। শৈশবে পরিবার থেকে যে সু-শিক্ষা শিশুকে প্রদান করা হয় তাই তার পরবর্তী জীবনে প্রভাবক হয়। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ফ্যামেলি স্ট্যাটাস, ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার এবং সন্তানের ভবিষ্যত নির্মাণের জন্য একটি পরিবারের বাবা-মা দু’জনই এখন চাকরি করে। শিশুরা বঞ্চিত হয় মায়ের স্নেহমাখা শাসন থেকে। তাই আস্তে আস্তে ছেলেরা বখে যায়। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তার বর্তমানকেই ধ্বংস করা হয়। অথচ একটি পরিবারের বিশেষত একজন মায়ের প্রধান কর্তব্য হলো তার সন্তানের যথাযথ প্রতিপালন করা।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন আরও বলেন, সমাজ থেকে ক্রমান্বয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা চর্চার বিলুপ্তিও কিশোরদের অন্যায়, অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
এজাতীয় অপরাধপ্রবণতার আরেকটি কারণ বিশ্লেষণ করে মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া বলেন, সমাজের রাজনৈতিক- অরাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ নিজেদের হীনস্বার্থে এসব ছেলেদের ব্যবহার করে এবং তাদের শেল্টার দেয়। তাছাড়া ছাত্রদের ওপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ কমে আসাও এ জাতীয় অপরাধ সংগঠিত হওয়ার অন্যতম কারণ।
কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ঙ্কর অপরাধ থেকে প্রতিকারের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানীর আরজাবাদ মাদরাসার মুহতামিম বলেন, সমাজ থেকে মাদকের অবাধ ও সহজপ্রাপ্যতা দূর করতে হবে। সামাজিক সচেতনতা, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে আশা করা যায় এ জাতীয় অপরাধ কমে আসবে।
ভয়ানক আকার ধারণ করা এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ করা কীভাবে সম্ভব- জানতে চাইলে ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, আসলে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এ অপরাধ দমন অসম্ভব। আর ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার যে চর্চা আজ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
তিনি বলেন, সময়ের প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আইসিটিসহ অন্যান্য বিষয় যেমন অবশ্য পাঠ্য করা হয়েছে, সমাজকে রক্ষা করার জন্য হলেও ধর্মীয় ও নৈতিকতার চর্চার বিষয়টিকে স্কুলে কলেজে অবশ্য পাঠ্য করা উচিত। তাছাড়া সামাজিক সচেতনতার জন্য এ বিষয়ে শিক্ষামূলক সেমিনার ও কর্মশালারও আয়োজন করা উচিত। সর্বোপরি আমাদের এ সকল বিপথগামী সন্তানদেরকে ধ্বংসের পথ থেকে রক্ষা করতে পরিবার ও সমাজে নৈতিকতার বোধকে জাগ্রত করার জন্য সবারই কাজ করা উচিত।
















