বুনে রাখা সেই স্বপ্নটি

নুরুজ্জামান নাহিদ ।।

তখন শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারে ইফতা দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি। দুহাজার সতের। সন্ধ্যেবেলা খবর পেলাম স্বপ্নপুরুষ শরীফ মুহাম্মাদ সাহেব মারকাজে এসেছেন। নাজেমে তালিমাত (শিক্ষাসচিব) সাহেবের কামরায় আছেন। তাকদিরের বদান্যতায় ইতিপূর্বে তাঁর হাতের স্পর্শ লাভের সুযোগ আমার হয়েছিল। সস্নেহে তিনি আমাকে নাহিদ বলে ডাক দিয়েছিলেন। আমার জন্য সেই সুযোগ ও স্নেহ ছিল মহার্ঘ প্রাপ্তি।  খবর শুনে ছুটে গেলাম। দেখা হলো। তিনি সস্নেহে বললেন, কেমন আছো, নাহিদ? মুহূর্তে নাহিদ শব্দটা মধুময় হয়ে উঠল। বললেন, রাতে তোমাদের সাথে কথা হবে। কেবল তাখাসসুসের তালিবুল ইলমদের নিয়ে বসব; যদি মুদির সাহেব অনুমতি দেন।

বসা হলো। যাদের বসার কথা ছিল না তারাও নিজেকে আড়াল করে বসে গেল। এবং একসময় পুরো মারকাজ দারুল ইফতায় সেধিয়ে গেল। কানায় কানায় পূর্ণ দারুল ইফতার দক্ষিণ দিকে চেয়ারে বসে প্রিয় মানুষটি বলিষ্ঠ কণ্ঠে, প্রচণ্ড শক্তি ও সাহস নিয়ে শুনিয়ে গেলেন হাল জামানার মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যমের হালচাল। বললেন, ‘চলমান বিশ্বে এমন কোনো গণমাধ্যম নেই যারা বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে ময়দানে নামে নি। সবারই আছে নিজস্ব লক্ষ্য ও নিজস্ব গণ্ডি।  সেই লক্ষ্য পূরণে এবং সেই গণ্ডির পরিধি বিস্তৃতকরণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে প্রতিটি গণমাধ্যম। সুতরাং গণমাধ্যমের চটকদার স্লোগানে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। পৃথিবীতে সত্য ‍ও সুন্দর সেটাই যেটা আল্লাহ তায়ালা নির্ধারিত করেছেন। আমাদের সেই লক্ষ্যেই মাঠে নামতে হবে।’

বাঙালি উলামায়ে কেরামের পশ্চাতপদতা ও সংকীর্ণমনতার যে মুখরোচক বিভ্রান্তি নৈমিত্তিক আমাদের কান ভারী করে তোলে তিনি সেসব নাকচ করে দিয়ে বললেন, ‘আমাদের উলামায়ে কেরাম যখন যেটাকে জরুরি মনে করেছেন সেটাতে হাত দিয়েছেন। এই ময়দানেও তাদের চোখ আছে। এবং তারা একটা ধাক্কা দিলেই, ইনশাআল্লাহ, এই সব হলদে সাংবাদিকতা ভ্যানিস হয়ে যাবে।’

অতপর, তিনি সেই স্বপ্নের কথা শোনালেন যেটা শোনানোর তাগিদে এত কষ্ট করে, একা পথ চলে, লোকাল বাসে ঝুলে মারকাজে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি শোনালেন স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘মা’হাদুস সাহাফাহ ওয়াদ দাওয়াহ, বাংলাদেশ’এর কথা। এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি হেঁটে চলেছেন।তখনও ইসলাম টাইমস হয়নি। সম্ভবত, ইসলাম টাইমসের স্বপ্ন তখনও তার দুচোখের তারায় চেপে বসেনি। একটি অনলাইন পত্রিকার ‘দিবাস্বপ্ন’ তখনও তাকে নিশাচর পাখি বানিয়ে দেয়নি। স্বপ্ন তো তাই, যা চোখ থেকে ঘুম কেড়ে নেয়।

খুব ইচ্ছে ছিল সেই স্বপ্নের সারথি হওয়ার; ইচ্ছের গুড়ে বালি। লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে কাঁধে চাপাতে হলো অধ্যাপনার গুরুগম্ভীর দায়।  তখনও ইসলাম টাইমস হয়নি। হলো এক বছর আগে। যখন হলো, তখন সেই সুষুপ্ত ইচ্ছেটা আড়মোড়া দিয়ে উঠল মুহূর্তখানেকের জন্য। তারপর নিরাশ হয়ে শুয়ে পড়ল, যেমনটা ছিল দুবছর। সাহিত্যিক আব্দুশ শাকুর বিদ্রুপ করে বড় করুণ সত্যিটা বলেছিলেন, ‘এই দেশে ঠেলোয়ার হয় খেলোয়াড় আর খেলোয়াড় হয় ঠেলোয়ার।’

নিজের ইচ্ছেটা যেহেতু অধরা রইল, চোখ পড়ে রইল পত্রিকার কাজ, গতি ও প্রকৃতির ওপর।  একটি বছরে ইসলাম টাইমস যা দিয়েছে তাকে কি যথেষ্ট বলা যায়? প্রশ্নটা আসলে অবান্তর। যথেষ্ট দেওয়ার সামর্থ কি আসলে কারও আছে? তবে ভরসা পাওয়ার জন্য যা দরকার তার প্রায় পুরোটাই দিয়েছে ইসলাম টাইমস। সংবাদ নির্বাচন, শিরোনাম বাছাই, বিষয়ের নতুনত্ব ও বৈচিত্র তাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। আর শরিয়াহ লঙ্ঘনের গণমাধ্যমিক উৎসবের যুগে নিরেট ইসলাম বান্ধব উপায়ে সংবাদ পরিবেশন, কন্টেন্ট নির্ধারণ ও বিজ্ঞাপন গ্রহণ পাঠকের আস্থা ও ভালবাসা জয় করে নিয়েছে। দুয়েকটা গণমাধ্যম যখন  ইসলামবৈরী শিরোনাম ছেপেছে ভুল করে, ইসলাম টাইমস সংশোধনী দিয়েছে সেখানে। তুলে ধরেছে বিকল্প। উপরন্তু, সময়োপযোগী ভিডিও, দেশ বরেণ্য আলেমগণের নিয়মিত কলাম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পরিচিতমুখদের লেখাজোকা পত্রিকার শ্রীবৃদ্ধি করেছে নিয়মিত। আর বিভিন্ন সময় ও সংকটে লাইভ ভিডিওয়ের মাধ্যমে সম্পাদক মহোদয়ের পাঠকের সাথে মতবিনিময়ে চলে আসা পত্রিকাটিকে যথা অর্থেই গণমানুষের মাধ্যম করে তুলেছে।  নিঃসন্দেহে এর পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে মুরব্বিদের পৃস্ঠপেষকতা ও ছায়ায় চলা একজন শরীফ মুহাম্মাদের উপস্থিতি ও অভিভাবকত্ব।

নিউজ পোর্টালটি ইতোমধ্যে এক ঝাঁক তরুণ সংবাদকর্মী সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। নিয়ত তৈরী হচ্ছে গণমাধ্যমের নতুন মুখ। একদিন তারা ছড়িয়ে পড়বে দেশজুড়ে। গড়ে তুলবে সংবাদমাধ্যমের একটি স্বতন্ত্র ধারা। এবং সেই ধারাকে পূর্ণতা দিতে, স্বপ্ন দেখি, স্বচ্ছ জলের প্রস্রবণ হয়ে আসবে ইনিস্টিটিউট অফ জার্নালিজম এন্ড দাওয়াহ, বাংলাদেশ। গড়ে উঠবে সত্য ও সুন্দরের একটি সুবাসিত ফুলবাগিচা। স্বপ্ন দেখি, একদিন সেই বাগিচায় হাঁটু গেড়ে বসব। ফুলের সুরভীতে বিমোহিত, আলোড়িত ও আপ্লুত আমি স্বপ্নজড়ানো চোখ মেলে দেখব, সম্মুখে বসে আছেন একজন শরীফ মুহাম্মাদ। খুব মিষ্টি হেসে বলছেন, কেমন আছো নাহিদ?

লেখক: তরুণ মুহাদ্দিস, গদ্যকার

 

পূর্ববর্তি সংবাদপূজা মণ্ডপে গিয়ে ঢোল বাজানো, তোপের মুখে মেয়র আতিক
পরবর্তি সংবাদ‘কাশ্মীরে কিছু লুকানোর না থাকলে, সেখানে ঢুকতে দিতে ভয় কেন?’