আরজু আহমাদ ।।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৫০০ জন সৈন্যের একটি ক্যাভালরি ব্যাটালিয়ন খালিদ রা.-এর নেতৃত্বে দুমাত আল জান্দাল বিজয়ের জন্য প্রেরণ করেন। দুমাত আল জান্দাল আধুনিক সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমের একটা প্রাচীনতম শহর।
খালিদ রা. কে প্রেরণকালে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়ে দেন, তোমরা সেখানকার শাসক আকীদারকে পাবে শিকাররত অবস্থায়। আর তাঁকে জীবিতাবস্থায় আমার সামনে হাজির করবে। সৈন্যদল দুমাত আল জান্দাল পৌঁছাতে পৌঁছাতে গাঢ় অন্ধকার নেমে আসে।
খালিদ রা. নির্দেশ দিলেন ঘোড়াগুলোকে যেন এত ধীরে হাঁটানো হয়, যেন খুড়ের শব্দ না শোনা যায়। আর নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা হয় যেন একেবারে ফিসফিস স্বরে। আকীদার এই সময় তার স্ত্রীর সাথে বসে অবসর যাপন এবং মদ পান করছিলেন।
এ সময় অকস্মাৎ জঙ্গলের দিক থেকে ছুটে আসা একটা সুন্দর সাদা হরিণ দূর্গের গেটে মাথা ঘষছিল। এটা ছিল এডাক্স (Addax)। উত্তর আফ্রিকান অন্যসব অঞ্চল ও মরোক্কো, লিবায়ায় এখনও বিলুপ্তপ্রায় এই বড়ো আকৃতির হরিণের দেখা মেলে।
আকীদারের স্ত্রী বলল, তোমার প্রিয় শিকার তোমার হাতের কাছে। আকীদার দ্রুত তার তীর ধনুক সাথে নিয়ে তার ভাই হাসসান এবং কয়েকজন ভৃত্যকেও সাথে ডেকে নিল। সে দূর্গ থেকে নিজের ঘোড়ায় চড়ে শিকারকে ধাওয়া করে মাত্র কয়েক কদম এগুতেই খালিদ রা. এর সৈন্যদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে পড়ল।
তার ভাই হাসসান এবং আরও কয়েকজন প্রতিরোধের চেষ্টা করে পরাজিত হল। আকিদার আত্মসমর্পণ করল। গ্রেপ্তার আকিদারকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে যাওয়া হল। আকীদার শাসিত দুমাত আল জান্দাল অঞ্চলটিতে অবস্থিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যপথে ব্যাপক লুটতরাজের অভিযোগ ছিল।
এছাড়াও সে অন্য সম্প্রদায়ের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে মদিনা আক্রমণের পরিকল্পনায় শামিল হতে পারে এমন গোয়েন্দা প্রতিবেদনও ছিল। আকীদারকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে উপস্থাপন করা হল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই শর্তে তাকে ক্ষমা করে দেন যে, সে ইনসাফ কায়েম করবে এবং তার রাজ্য নিয়মিত কর প্রদান করবে এবং আনুগত্য বজায় রাখবে।
তাকে তার নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেওয়া হয় এবং তার রাজ্যের শাসনাধিকার বহাল রাখা হয়। আকীদার যখন রাসুল সা.- এর সামনে উপস্থিত হন, তখন তার পরনে ছিল কারুকার্যময় রেশমি জামা। কারুকাজ করা ছিল স্বর্ণ এবং বিবিধ মূল্যবান পাথর দিয়ে। সেখানে উপস্থিত অনেকেই সেই পোশাক বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছিলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের বিস্ময় দেখে বললেন, ‘অবাক হচ্ছো তোমরা! অথচ জান্নাতে সাদ বিন মুয়াজের হাতের রুমালও এরচে’ বহুগুণ সুন্দর ও মূল্যবান হবে’। সা’দ বিন মুয়াজ ছিলেন ঐ সমস্ত অগ্রগণ্য সাহাবাদের একজন যাঁরা নিজেদের নেতৃত্ব, সম্পদ ও জীবনকে আল্লাহর রাসুলের সামনে সমর্পণ করেছিলেন।
তিনি ছিলেন মদিনার প্রধান দুই গোত্রের অন্যতম আউস গোত্রের নেতা। যেদিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন- সেদিন নিজের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গিয়ে বলেন, ‘তোমরা আমাকে কেমন জানো? লোকেরা বলল, ‘আপনি আমাদের নেতা, বিশ্বস্ত ও সর্বোত্তম দায়িত্বশীল’।
তিনি জবাবে বললেন, ‘তবে জেনে রাখো, তোমাদের কেউ যতক্ষণ না ঈমান আনে, আমি তার সাথে কথা বলব না।’ এরপর দেখা গেল সন্ধ্যা হওয়ার আগেই তাঁর সম্প্রদায় বনী আশহালের সব নারী ও পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
তিনি বদর ও অহুদের যুদ্ধে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলেন, তিনি সব সময় রাসুলের দেহরক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। এটা ছিল মদীনায় আশ্রয়দানকারী আনসারদের নেতা হিসেবে তাঁর দায়িত্বশীলতার পরিচয়। উহুদের যুদ্ধে সৈন্যরা যখন বিক্ষিপ্ত। তখন যে ১৫ জন মাত্র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অনড় ছিলেন, তিনি তাঁদের অন্যতম।
খন্দকের যুদ্ধে তিনি তাঁর দেহের চেয়েও ছোট এক বর্ম নিয়ে সামনের দিকে এগোবার সময় শত্রুর তীর তাঁর একটা হাতকে বিদ্ধ করে, সেই হাতে তিনি বর্শা ধরেছিলেন।
সেই ক্ষত থেকে তাঁর হাতে দ্রুতই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। মৃত্যুর আগ মূহুর্তে তাঁর হাত থেকে প্রবল ধারায় রক্ত বেরোতে থাকে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে তাঁর জন্য দোয়া করেন। সাদ বিন মুয়াজ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে সালাম দেন, রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়েই প্রশান্তমুখে শাহাদাত বরণ করেন।
এই যে, আকীদারের বিলাসি পোশাকের দিকে লোকেদের বিস্মিত চাহনির মত একটা সামান্য প্রেক্ষিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সা’দ বিন মুয়াজের প্রসঙ্গ টেনে আনলেন- লোকেদের জান্নাতের নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন! কেন? কেননা উদ্দেশ্য ছিল, মুসলমান যেন কখনোই ইসলামকে পাশে রেখে কোনও দুনিয়াবি মোহে আকৃষ্ট না হয়।
সে যেন স্মরণ রাখে, প্রকৃত প্রাপ্তি কেবল জান্নাতে। এও যেন স্মরণ রাখে, ইসলাম বহু ত্যাগের ফসল। ইসলাম ততদিন টিকে থাকবে, যতদিন ইসলামের জন্য মুসলমানের ত্যাগ টিকে থাকবে। সম্পদ, বাড়ি, গাড়ি, সুন্দর জীবনসঙ্গী, ক্যারিয়ার কিম্বা অন্য কিছুর জন্যই মুসলমান ইসলামকে পাশ কাটিয়ে যেন সে না ছুটে।
কোনও কিছুই যেন তাকে ইসলাম থেকে বিচ্যুত না করে। বরং মুসলমান যেন স্মরণ রাখে ইসলামকে আঁকড়ে ধরে আমরা যা কিছু ত্যাগ করি। তা তো ত্যাগ নয়, বরং বিনিয়োগ। আর যা আল্লাহ্ তাঁর নিজের মর্যাদা অনুযায়ী বৃদ্ধি করে আমাদের ফেরত দেবেন।
তিনি তো উত্তম বিনিময় দানকারী। চলুন, প্রাত্যহিক আমরা আল্লাহ্র সাথে অন্তত একটা ব্যবসা করি। অন্তত একটা বদ-অভ্যাস আল্লাহ্র জন্য ছেড়ে দিই কিম্বা অন্তত একটা সহজ সুন্নাহকে বা কোনও নেক কাজকে নিজের অভ্যেসে বদলে নেওয়ার নিয়ত করি।
নিঃসন্দেহে এই বিনিয়োগ আখিরাতে অকল্পনীয় লাভ নিয়ে উপস্থিত হবে।
লেখক: লেখক, কলামিস্ট
















