মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।
সেদিন ফকিরাপুলের একটি মার্কেটে আসরের নামাজ পড়লাম। ১৭/১৮ তলা বিশিষ্ট একটি ভবনের নিচের দুই তলায় ইলেকট্রনিক্স মার্কেট। উপরে মসজিদ আছে। তবে নিচেও নামাজের ব্যবস্থা আছে। আমি নিচের জামাতে শরিক হলাম।
নামাজ শেষে সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গে একজনের উঁচু কণ্ঠ শোনা গেল। তিনি ইমাম সাহেবকে ধমক দিচ্ছেন, কেন তিনি মানুষ সুন্নত পড়া অবস্থায় জামাত শুরু করলেন? কেন জামাতের কয়েক মিনিট আগে থেকে চারপাশে খেয়াল রাখলেন না? কেন তিনি লোকজনকে সুন্নতের নিয়ত বাধতে নিষেধ করেন নি? তার ভাষায়— ইমাম সাব! একটা কথা। সামনে থেকে জামাত শুরু করার আগে আপনি খেয়াল করবেন কেউ সুন্নত পড়ছে কিনা? কেউ সুন্নত পড়লে অপেক্ষা করবেন। তার নামাজ শেষ হলে জামাত শুরু করবেন। আর আগে থেকেই খেয়াল রাখবেন যেন জামাতের আগ মুহূর্তে কেউ সুন্নতের নিয়ত না করে। আপনি ইমাম। আপনাকে এই অধিকার দেওয়া আছে। আপনি নিষেধ করলে কেউ নামাজের নিয়ত করবে না….।
শাসনের সুরে কথাগুলো তিনি বলছিলেন।
এরই মধ্যে একজন বললেন, কাউকে নামাজ পড়তে নিষেধ করা জায়েজ নাই। এই কাজ ইমাম সাব কিভাবে করবে? যে সুন্নতের নিয়ত করবে তারই সময় খেয়াল রাখতে হবে।
পেছন থেকে আরেকজন বললেন, মসজিদের মতো এখানেও লালবাতি লাগানোর ব্যবস্থা করেন…।
এভাবে চারপাশ থেকে উচ্চ আওয়াজে বিভিন্ন পরামর্শ, নির্দেশনা, ধমক আসতে লাগল। ইমাম সাহেব নীরব। চেহারায় কেমন এক বিষন্নতা।
এরই মধ্যে একজন বললেন, আমি যে নামাজের আগ মুহূর্তে সুন্নত শুরু করলাম আপনি দেখলেন না! নিষেধ করলেন না কেন? নিষেধ করলে কি আর শুরু করি?
ইমাম সাহেব বললেন, আমিতো পশ্চিম দিকে ফিরে বসেছিলাম। পেছনে আপনি নামাজের নিয়ত করছেন সেটা কিভাবে দেখব?
ইমাম সাহেবের কথা শেষ না হতেই কয়েকটি কণ্ঠ বেজে উঠলো— এটা আপনার দায়িত্ব না? দেখবেন না কেন?
আমি সম্পূর্ণ অপিরিচিত আগন্তুক হওয়া সত্ত্বেও মনে হলো কিছু বলা দরকার। বললাম, দেখেন নামাজের আগে মুসল্লিদের দিকে ফিরে পাহারা দেওয়া আসলেই ইমাম সাহেবের দায়িত্ব না। যে সুন্নতের নিয়ত করবে তারই জামাতের সময় খেয়াল করা কর্তব্য।
কিন্তু আমার কথা কে শুনে। হইচই হট্টগোলে কেউ কারো কোন কথা শুনলো না। একেকজন একেক কথা বলতে বলতে নিজেদের দোকানে ফিরল। ইমাম সাহেব দুয়েকজন নিরীহ(?) মানুষ নিয়ে সংক্ষিপ্ত মোনাজাত করে বিদায় নিলেন। তার বিনয়ী মায়াবী চেহারাটি দীর্ঘক্ষণ আমার বুকের ভেতর অন্যরকম ভাবাবেগের জন্ম দিল। সহজ সরল বিনয়ী মানুষদের সাথে মানুষ কেন এমন আচরণ করে?
জামাতের সময় নির্ধারিত। এসময় জামাত না দাঁড়ালে মসজিদে কী অবস্থার সৃষ্টি হয় সবাই জানে। যে সুন্নত পড়বে সে অবশ্যই ঘড়ি দেখে জামাতের সময় খেয়াল করে দাঁড়াবে। কোনো কারণে কারো সুন্নত দীর্ঘ হলে কিংবা কেউ সময় খেয়াল না করে সুন্নত শুরু করলে তার জন্য অপেক্ষা করতে পারলে ভালো। কিন্তু যেখানে এত মানুষ নামায পড়ে সেখানে সবার বিষয় চিন্তা করে নির্ধারিত সময়েই জামাত শুরু করতে হয়। উপরন্তু সেটা বানিজ্যিক স্পেস। মার্কেট। সেখানে সবাই কর্মব্যস্ত। দোকান খোলা রেখে নামাযে এসেছে। জামাতের সময়ও নির্ধারিত। সেই সময়ে জামাত শুরু না হলে কতজনের কত অভিযোগ উঠবে বলার অপেক্ষা রাখে না। এতকিছুর পরও ইমাম সাহেবকে সবার সামনে এভাবে কথা বলা হলো! ইমাম সাহেবও কোনো উত্তর করলেন না। নীরবে সব শুনলেন! দেখে মনে হলো ইমাম সাহেবের বয়স ত্রিশের কম হবে। নওজোয়ান। তারপরও নীরব! আশ্চর্যের বিষয় না! এই বিনয় এই ভদ্রতা এই শরাফত এই আভিজাত্য……
অনেক কিছু ভাবলাম। ভাবলাম সত্যিই কি এটা তার ভদ্রতা না দুর্বলতা? কিন্তু দুর্বলতা হবে কেনো? তিনি একজন আলেমেদ্বীন। এখানের লোকজন তাঁকে ইমামতের জন্য নিযুক্ত করেছে। ইমামত অর্থ নেতৃত্ব। ইমামত খুবই মর্যাদার দায়িত্ব। তিনি এখানে মর্যাদার আসনে আসীন। সবার কল্যাণকামী। তারপরও কেনো তিনি দুর্বল হবেন?
দীর্ঘসময় আমি তাঁকে নিয়ে ভাবলাম। ভাবলাম আমাদের দেশের দ্বীনদার মানুষদের কথা। সমাজের পর্দানশীন নারীদের কথা। সমাজে তাদের মর্যাদা, দাপট, কর্তৃত্ব এবং তাদের ভদ্রতা, নীরবতা, আভিজাত্য ও অসহায়ত্বের কথা। কুল কিনারাহীন এক ভাবনা। সেই ভাবনার পরতে পরতে অনেক প্রশ্ন।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। কোনো যেন মনে হয় ইসলাম মেনে চলা মুসলমানরাই এদেশে সংখ্যালঘুর জায়গায়। সর্বত্রই তাদের নীরব দুর্বলতা ছাড়া যেন কিছু নেই। তারা কেমন যেন অসহায়। কেমন যেন মজলুম। অথচ অন্য সবাই সবল। উচ্চশ্রেণি নিম্নশ্রেণির সবাই দাপুটে। তাদের কর্তৃত্বের সামনে দ্বীনদার মুসলমানেরা ‘লাচার’। আসল সমস্যা কোথায়? এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো পথ কি নেই?
হে আল্লাহ! মুসলমানদের হারানো অতীত ফিরিয়ে দাও। আমাদেরকে ক্ষমা করো। আমাদেরকে করো সাহাবায়ে কেরামের আদর্শে আদর্শবান। হে আল্লাহ…..
















