‘মাহফিলের আলোচনা: প্রয়োজন সচেতনতা ও সতর্কতা’

তারিক মুজিব ।।

মানুষের মাঝে দ্বীনী সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আয়োজন করা হয় ওয়াজ মাহফিলের। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াজ মাহফিলের পরিমান বেড়েছে। ওয়াজ মাহফিলকে এখন জাতীয় মুসলিম সংস্কৃতির অংশ বলছেন অনেকেই। তবে ওয়াজ মাহফিলে  গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আলেচনার পাশাপশি অসঙ্গতিপূর্ণ এবং পারস্পরিক বিষোধগারপূর্ণ কথাবার্তা বলতে শোনা যায় অনেক বক্তাকে। ধর্মীয় প্রসঙ্গের বাইরে গিয়ে দেশ-মহাদেশ, দৈহিক গঠন, নিজের ব্যক্তিগত যোগ্যতা প্রমাণে  নানা আজগুবি কথাবার্তাও বলেন কিছু আলোচক। তাদের অবান্তর এবং আজগুবি কথাবার্তা নিয়ে সমালোচনায় মেতে ওঠে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। সামাজিক মাধ্যমে তাদের বক্তব্য নিয়ে রীতিমত ট্রল করা হয়।  যেটা সামগ্রীকভাবে ওয়াজ –মাহফিলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ওয়াজ –মাহফিলেরে গুরুত্ব প্রয়োজনীয়তা, বক্তাদের যোগ্যতা-গুণাবলী, বক্তাদের আজগুবি কথাবার্তা ইত্যাদি প্রসঙ্গে কথা হয় রাজধানীর জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার মুহাদ্দিস মাওলানা তাহমিদুল মাওলার সঙ্গে।

মাওলানা তাহমিদুল মাওলা বলেন, প্রথমত, ওয়াজ মাহফিল প্রসঙ্গে আমাদের আকাবির আলেমগণ বলে থাকেন-  যে সকল সাধারণ মুসলমানদের দ্বীনের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জণেরও সুযোগ হয়নি বা যারা দ্বীন সম্পর্কে খুব সামান্যই জানেন ওয়াজ-মাহফিল তাদের জন্য দ্বীন সম্পর্কে জানার অন্তত সচেতনতা তৈরি হওয়ার অন্যতম মাধ্যম। আর আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষেরই দ্বীন সম্পর্কে ভালো জানাশোনা আছে এমন মানুষের সংখ্যা আনুপাতিক হিসেবে আমাদের দেশে খুব কম।

দ্বিতীয়ত মানুষকে নসিহত করার জন্য বক্তাদের যোগ্যতা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ফক্বীহ আল্লামা তাকী উসমানী বলেছেন, মাহফিলে ওয়াজ করার আগে বক্তাদের অবশ্যই তার ইলম, আমল, আমানতদারি  ও বয়সের বিচারে উপযুক্ত হতে হবে এবং কোনো মুসাল্লাম বুযুর্গ আলেমের ‘তরবিয়ত’ ও পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে।  এরপর দ্বীনের প্রয়োজনে মুরুব্বীদের নির্দেশে ওয়াজ করতে যেতে হবে।

মাওলানা তাহমিদুল মাওলা বলেন, উপযুক্ততা এবং মুরুব্বীদের পরামর্শ ছাড়াই নিজের মন মতো বয়ানের ময়দানে নেমে যাওয়া মূলত ওয়াজ মাহফিলে বক্তাদের আলোচনা কেন্দ্রীক যাবতীয় সঙ্কটের প্রধান কারণ।

মাহফিলে বক্তাদের আজগুবি কথাবার্তা প্রসঙ্গে জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার এ মুহাদ্দিস বলেন, যোগ্যতা অর্জণ এবং উপযুক্ততা ছাড়াই নিজের আগ্রহে ব্যক্তিগত পরিচিতির জন্য অনেকে বয়ানের ময়দানে যাচ্ছেন। সুর, শুদ্ধস্বরে কথা বলতে পারা ইত্যাদি আকর্ষণীয় উপাদান থাকলেই অনেকে বয়ান করতে চলে যাচ্ছেন। নিজের ওপর কোনো আলেমের নিয়ন্ত্রণ নেই। যিনি তার ভুল বা অসংগতিগুলো শুধরে দিতে পারেন।   এসব কারণেই কী বলা হচ্ছে, বক্তা কী বলেছে সেদিকে তার খেয়াল থাকে কম। সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জণের প্রতিই তার খেয়াল থাকে বেশি। তা যা মনে আসে তাই বলা হতে থাকে। এক্ষেত্রে কোনোকিছু বাছবিচারের প্রয়োজন মনে করা হয় না।

বয়ানে কিছু বক্তার পারস্পরিক বিষোদগার প্রসঙ্গে মাওলানা তাহমিদুল মাওলা বলেন, এটা কখনোই দ্বীনের অনুসৃত পদ্ধতি হতে পারে না। এটা আমাদের আকাবির আসলাফের তরিকাও না। আমাদের নিকটবর্তী উলামায়ে দেওবন্দের কোনো আমলও নয়। দ্বীনের ব্যাপারে যারা প্রকৃতই অসচেতন তারা এ কাজ করেন। আমাদের মহান আকাবির তো তাদের নিজেদর ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপারে চরম পর্যায়ের কথা  বললেও কখনো তা প্রকাশ্যে মজলিসে তা নিয়ে আলোচনা করতেন না।

মাওলানা তাহমিদুল মাওলা দেখেন কিছু বক্তাদের কার্যকলাপ মানুষের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও এটা মনে করার কোনো সুযোগ নেই মাহফিলের সব বক্তারাই আজগুবি কথা বলেন বা পারস্পরিক কাদা ছোরাছুরি করেন। বরং অনলাইনে আসলে রসিয়ে রসিয়ে ওই সকল বক্তাদের আলোচনা বা বক্তাদের আলোচনার আপত্তিকর অংশ প্রচারের একটা প্রবণতা আছে। যে কারণে কেউ কেউ সাধারণভাবেই ওয়াজ মাহফিলের প্রতি প্রশ্ন তুলেন। দ্বিতীয়ত, মাহফিলে অযাচিত কথাবার্তা বলার ধারাও তো নতুন কিছু নয়। ভুল তো মানুষের হয়ই। তবে অনলাইন হওয়ার কারণে এখন ভুলগুলি ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য ভুল হয়ে যাওয়া বা ভুল করা বা তথ্য বিকৃতি বা মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া ভিন্ন জিনিস। তবে সকল বক্তাদেরই এখন সতর্কতা এবং সচেতনতার সাথে আলোচনা উচিত।

অবশ্য কারো বয়ানে আদর্শগত বা তথ্যগত ভুল হলে তা সংশোধনের জন্য ইসলামের অনুসৃত রীতি পালন করা উচিত জানিয়ে মাওলানা তাহমিদুল মাওলা বলেন, ইসলাম কাউকে নিয়ে উপহাস করা তার নাম বিকৃতি করে তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। অতএব কেউ চরমপর্যায়ের ভুল করলেও তার ভুল সংশোধনের জন্য ভ্রাতৃত্বের হক লঙ্ঘন করা যাবে না।

পূর্ববর্তি সংবাদতাবিথের ওপর হামলা নিয়ে যা বললেন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আতিক
পরবর্তি সংবাদচট্টগ্রামের উপনির্বাচনে মৃতের নামে ভোট পড়েছে কি না খতিয়ে দেখা হবে: ইসি সচিব