মুকিম আহমাদ ।। মালয়েশিয়া থেকে
মালয়েশিয়ান মুসলিমরা সাধারণভাবে রাজনৈতিক সচেতন এবং ধর্মপ্রাণ হিসেবেই পরিচিত। ভোটের অধিকারে বহাল থাকায় মালায়ু মুসলিম স্বার্থে আঘাত করে কোন সরকারই দীর্ঘস্হায়ী হয় নি এখানে । ২০১৮-এর নির্বাচনে বারিসান ন্যাশনালের পরাজয়ের মূলে যতোটা না ছিল বারিসান আর আমনোর নেতাদের কথিত দুর্নীতি, তার চেয়ে বেশি প্রভাবক ছিল দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আনোয়ার ইব্রাহীমের ধর্মীয় ইমেজ ।
মাহাথির মুহাম্মাদের সঙ্গে আনোয়ার ইব্রাহিমের “পার্টি কেআদিলান রাকায়াত”-এর জোট অপরদিকে চায়নিজ- প্রধান বামপন্হী দলের ( ডেমোক্র্যাটিক এ্যকশন পার্টি) সংযুক্তি সাধারণ মালায়ু মুসলিমদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল । মূল চালিকা শক্তি ছিল আনোয়ার ইব্রাহিম । সাধারণ মালায়ু মুসলিমদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেছিলেন মজলুম নেতা । তাদের ধারণা ছিল মুসলিম বিশ্বে তার ইসলামী ব্যক্তিত্ব, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা অর্থনীতিতে পরিবর্তন সাধন করবে । ছাত্রাবস্হায় আনোয়ার ইব্রাহিম বিভিন্ন ইসলামী সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমেই পরিচিতি পেয়েছিলেন ।
আজকের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়া এবং ইসলামী ব্যাংক মালয়েশিয়া প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে আনোয়ার ইব্রাহিমের অবদান অনস্বীকার্য । কারণ যে ABIM (Angkatan Belia Islam Malaysia or Muslim Youth Movement of Malaysia)-এর স্বপ্নের ফসল এই বিশ্ববিদ্যালয় আর ব্যাংক সে ABIM-এর কো-ফাউন্ডার ছিলেন আনোয়ার ইব্রাহিম । তার এইসব কীর্তি আর অবদান তাকে আবারও জনতার “প্রথম পছন্দে” নিয়ে এসেছিল ।তবে নির্বাচন-পরবর্তী আনোয়ার ইব্রাহিমের অতিমাত্রায় চায়নিজপ্রীতি এবং তাদের জোটের চায়নিজকরণে মালায়ু মুসলিম সমাজে অস্বস্তি আর আশংকা বিরাজ করছিল ।

এমনকি খোদ সরকারদলীয় জোটের মধ্যেই শুরু হয় ভাঙনের গুঞ্জন । মাহাথির মুহাম্মাদ স্বয়ং এই ভাঙনের সুর তোলেন । আর তখনই চায়নিজপ্রধান দল DAP আনোয়ার ইব্রাহিমকে জোরদার সমর্থন জানায় । তাদের ধারণা আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রধানমন্ত্রীত্ব লাভের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ার অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনীতিতেও দোর্দণ্ড প্রতাপ বিস্তার করতে সক্ষম হবে । যা ইতোমধ্যেই অনেকখানি অগ্রসর হয়েছিল । দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ চায়নিজরা নিজেদের দখলে নিতে পেরেছিল । অর্থমন্ত্রীর পদ পেয়ে যায় লিম গুয়াং ইং,প্রধান বিচারপতির পদ পায় রিচার্ড মালাঞ্জুম এবং এ্যাটর্নি জেনারেলের পদ লাভ করে পর্যায়ক্রমে টমি থমাস ।
অপরদিকে এই বিষয়গুলো প্রধান বিরোধী দুই দল পাস পার্টি (ইসলামী দল) এবং জাতীয়তাবাদী দল আমনোকে এক সূঁতোয় গ্রোথিত করে । যদিও আমনো আর পাস পার্টি দীর্ঘ ষাট বছর পরস্পর পরস্পরের বিরোধীই ছিল ।
মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে এই দুই দলের জোটই্ মূলত বড় প্রভাবক হিসেবে আবির্ভূত হয় । আমনো মালায়ূ জাতিয়তাবাদী দল, তারা কোনভাবেই দেশের প্রশাসনিক বিভিন্ন স্তরে ভিন্ন জাতিকে নিয়োগ প্রদানে আগ্রহী নয় । আর আদর্শের এই নৈকট্যই তান শ্রী মুহিউদ্দীন এবং পার্টি কেআদিলান রাকায়াতের কিছু এমপির মাঝে সম্পর্কের সেতু স্হাপন করে ।
নতুন প্রধানমন্ত্রী তান শ্রী মুহিউদ্দীন পারিবারিকভাবেই ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণে বড় হয়েছেন । ফলে শক্তিশালী ইসলামী দল পাস পার্টির নেতা উস্তাজ আব্দুল হাদী আওয়াং কোন “মেন্ডেট” ব্যতিরেকেই তার প্রতি দলীয় আস্হা ও সমর্থন পেশ করেন । প্রধানমন্ত্রীর প্রথম রাষ্ট্রীয় ভাষণ বামপন্হী দলগুলোকে ভীত না করলেও নির্ভার করেনি ।
একদিকে সুদীর্ঘ ৪০ বছর পর পাস পার্টি সরকার গঠনে শরিক হতে যাচ্ছে, অপরদিকে প্রধানমন্ত্রীর ইসলামী অনুশাসন মেনে জীবন-যাপন করা ও ভাষণে ইসলামী পরিভাষা ব্যবহার বামপন্হীদের এখনও রাস্তায় রাখছে । সাধারণ মালায়ু মুসলিমদের কাছে নতুন সরকার দলীয় জোট পারিকাতান ন্যাশনাল শেষ আশার স্হল হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে । তারা তাদের একক প্রাধান্য ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হয়ে উঠছে।
















