প্রশ্ন : গণ মাধ্যমের কল্যাণে একটি বিষয় সামনে এসেছে। তা হল, মাহামারির সময়ে অবস্থানকারীর জন্য শাহাদাতের সুসংবাদ। সেখানে মুসনাদে আহমাদের বরাতে একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। হাদীসটির সংশ্লিষ্ট অংশ এই
عن عائشة، أنها قالت: سألت رسول الله صلى الله عليه وسلم عن الطاعون؟ فأخبرني رسول الله صلى الله عليه وسلم: ” أنه كان عذابا يبعثه الله على من يشاء، فجعله رحمة للمؤمنين، فليس من رجل يقع الطاعون، فيمكث في بيته صابرا محتسبا يعلم أنه لا يصيبه إلا ما كتب الله له إلا كان له مثل أجر الشهيد “
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কারো এলাকায় যদি মহামারি দেখা দেয় আর সে তার ঘরে সবরের সাথে সাওয়াবের প্রত্যাশায় অবস্থান করে এবং এই বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন তাই ঘটবে তাহলে তার জন্য রয়েছে শহীদের প্রতিদান।” মুসনাদে আহমাদ হাদীস- ২৬১৩৯
আমার জানার বিষয় হল, আসলেই কি হাদীসে মহামারীর সময়ে ঘরে অবস্থানকারীর জন্য শাহাদাতের সুসংবাদ এসেছে? এবং যারা কোনো কারণে ঘর থেকে বের হয় তারা কি এ সাওয়াব পাবে না?
ইতি– আবদুল্লাহ সালেহ
উত্তর : এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়
১. বর্ণনাটির মূল পাঠ সহীহ বুখারীতে এভাবে এসেছে ,
عن عائشة، أنها سألت رسول الله صلى الله عليه وسلم عن الطاعون، فأخبرها نبي الله صلى الله عليه وسلم: … فليس من عبد يقع الطاعون، فيمكث في بلده صابرا، يعلم أنه لن يصيبه إلا ما كتب الله له، إلا كان له مثل أجر الشهيد»
সুতরাং কারো এলাকায় যদি মহামারি দেখা দেয়, আর সে তার এলাকায় অবস্থান করে ( অর্থাৎ, মাহামারীর ভয়ে সেখান থেকে চলে না যায় ) সবরের সাথে এবং এই বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন তাই ঘটবে। তাহলে তার জন্য রয়েছে শহীদের প্রতিদান। হাদীস ৩৪৭৪, ৫৭৩৪, ৬৬১৯
এখানে في بيته নয় في بلده আছে এবং হাদীসের অন্যান্য গ্রন্থেও এমনই আছে। যেমন, মুসনাদের আহমাদ হাদীস -২৪৩৫৮, ২৫২১২; সুনানে কুবরা নাসায়ী হাদীস ৭৪৮৫; শরহুস সুন্নাহ হাদীস -১৪৪২সহ অন্যান্য কিতাব।
উল্লেখিত সকল বর্ণনায় হাদীসের শব্দ হল, في بلده অর্থাৎ, নিজ এলাকায় অবস্থানের কথা এসছে। শুধু মুসনাদে আহমাদের একটি বর্ণনায় في بيته এসছে। (মুসনাদে আহমদ ২৬১৩৯) অতএব এ বর্ণনাটি শায।
কারণ,
ক) হাদীসের সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ সমূহে , এমন কি মুসনাদে আহমাদের অন্যান্য বর্ণনায় في بلد শব্দই এসেছে।
খ) ইমাম ইবনে আবদুল বার রহ. (মৃ৪৬৩হি.) এর বর্ণনা এ কথাকে সমর্থন করে। তাঁর বর্ণনাটি তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘তার বর্ণনাটি তাঁর বিখ্যাত কিতাব “আত-তামহীদে” এভাবে এসেছে,
فليس من عبد يقع الطاعون بأرضه فيثبت فيها …
(আত তামহীদ ১৯/২০৬)
এই বর্ণনার শব্দ হল بأرضه , যা بلده এর অর্থেই।
গ) মহামারি সংক্রান্ত অন্যান্য হাদীসের দিকে তাকালেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়। কারণ সেখানে এসেছে,
«إذا سمعتم به بأرض فلا تقدموا عليه، وإذا وقع بأرض وأنتم بها فلا تخرجوا فرارا منه»
(অনুবাদ) যদি তোমরা কোন এলাকা সম্পর্কে জানতে পার যে, তাতে মহামারি দেখা দিয়েছে তাহলে তাতে প্রবেশ কর না। আর যদি তোমার এলাকায় মাহামারি দেখা দেয় তাহলে সেখান থেকে বের হবে না। (সহীহ বুখারী হাদীস -৫৭২৯, ৫৭৩০, সহীহ মুসলিম হাদীস ২২১৮, ২২১৯)
ঘ) এ ছাড়া হাদীসের ব্যাখ্যাকার গণ بلده শব্দ হিসাবে হাদীসের ব্যাখ্যা করেছেন। দেখুন – ফাতহুল বারী , খ. ১০ পৃ. ২১৮ (৫৭৩৪); উমদাতুল কারী, খ১৬ পৃ৫৯, খ২১ পৃ.২৬১; ইরশাদুস সারী, ৭খ৪৩১, ১২খ৪৫৬পৃ; শরহু মুসলিম নববী, ১৪খ ২০৪পৃ ( কিতাবুস সালাম)
সুপ্রসিদ্ধ হাদীসবিশারদ ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ. (৮৫২হি.) মহামারি বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত কিতাব “বাযলুল মাউন ফি ফাযলিত তাউন” এ যে ব্যাখ্যা করেছেন তার দ্বারাও বিষয়টি স্পষ্ট। ( বাযলুল মাউন “ পৃ. ১৯৯-২০০)
সারকথা হল, হাদীসে বর্ণিত ফযীলত তার জন্য যে আক্রান্ত এলাকায় অবস্থান করে সবরের সাথে তাকদীরে বিশ্বাস রেখে, ভয়ে সেখান থেকে চলে যায় না।
হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন, হাদীসে বর্ণিত ফযীলত নিরেট অবস্থানকারীর জন্য নয়। বরং ঐ ব্যক্তির জন্য যে তার মহামারি কবলিত এলাকায় অবস্থান করবে সবরের সাথে সাওয়াবের আশায় এই বিশ্বাস নিয়ে যে, আল্লাহ ভাগ্যে যা রেখেছেন তাই হবে। সুতরাং কোনব্যক্তি যদি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল ছাড়া তাকদীরে বিশ্বাস ছাড়া শুধু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নিজ এলাকায় অবস্থান করে তাহলে এই ফযীলত অর্জন হবে না। ( বাযলুল মাউন পৃ. ২০০, ২০২)
আর মুসনাদে আহমাদের في بيته এর বর্ণনা যদি ভুল না হয় তবুও অন্যান্য হাদীসকে সামনে রেখে তার অর্থ এই হবে, المكان الذي يبيت فيه অর্থাৎ, যে এলাকায় সে অবস্থান করে।
সুতরাং হাদীসের ভাষ্য হল, উক্ত ফযীলত ঐ ব্যক্তির জন্য যে মহামারির সময় সবর করবে আল্লহর উপর তাওয়াক্কুল করবে এবং নিজ এলাকায় অবস্থান করবে। ভয় বা অন্য কোন কারণে এলাকা ত্যাগ করবে না। হাদীসে ঘরে অবস্থানের কথা বলা হয়নি। তাছাড়া ইসলাম মানুষকে ঘরে আবদ্ধ থাকতে বাধ্য করে না। কারণ রোজকার নিত্য প্রয়োজন ও রিযিকের তাগাদায় মানুষকে ঘর থেকে বের হতেই হয়।
যারা বলে ঘর থেকে বের হলে ফযীলত থেকে মাহরুম হবে তাদের এ ধারণা ভুল।
অবশ্য চিকিৎসক যদি কাউকে বিশেষ কোন কারণে ঘরে থাকতে বলে তাহলে তা ভিন্ন বিষয়। এর সাথে হাদীসের ভাষ্যের কোন সম্পর্ক নেই।
আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝে সে অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন
সাঈদ আহমদ বিন গিয়াস উদ্দীন
শিক্ষক, মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া ঢাকা
















