হৃদয়ের হাহাকার : আবার কবে শুনব মসজিদে নববীর আজান

ইবনুর রশীদ ।।

হৃদয়টা কেমন ব্যাকুল হয়ে আছে। অন্তর্জগতটা কেমন হাহাকার করছে! কতোদিন হলো, মসজিদে নববীর আজানের মায়াবী সে দ্যোতনা শুনতে পাই না। আইম্মায়ে হারামের সুমধুর তেলাওয়াতের বিমুগ্ধ সুরমুর্ছনা কানে আসেনা। মসজিদ জুড়ে এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকা ইলমী হালাকাগুলোর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য চোখে পড়েনা।

মনেপড়ে, জোহরের আধাঘন্টা আগে, জামিয়ার দরস শেষই  আমরা ছুটে যেতাম মসজিদুল হারামপানে। আমাদের মাঝে এক মধুর প্রতিযোগিতা হতো, কে কার আগে গিয়ে নাম লিখতে পারে হারামে! কারণ এ তালিকা অনুসরণ করেই শায়েখ পড়া শোনবেন আছরের পর থেকে। সৌদিয়া, কেনিয়া, মুরিতানিয়া, সূমাল, ফ্রান্স ও আফগানিস্থানসহ অসংখ্য দেশের ছাত্ররা হতো এ পাল্লার উদ্যোমী প্রতিযোগী। এশা পর্যন্ত চলতো একের পর এক বিভিন্ন হালাকায় আমাদের নাম লিখা এবং সবক দেয়া।

নামের সে তালিকাটা এখন আর আগের মত হয় না। মধুর সে প্রতিযোগিতাটাও এখন আর নজরে আসে না। হাজার ভাষার, হাজার বর্ণের মানুষের সঙ্গে আর সাক্ষাৎ হয়না। পড়ে থাকি অতি ক্ষুদ্র একটি পরিসরে, নিজের ছোট্ট কামরার চার দেয়ালের মাঝে। মনে পড়লেই হৃদয়টা কেমন বেচাইন হয়ে উঠে। দেহ-মন কেমন অসার ও নির্জীব হয়ে আসে।

গোটা মসজিদ জুড়ে ছড়িয়ে থাকতো অসংখ্য ইলমী হালাকা।এখানে কোরআনের হালাকা, ওখানে হাদীসে রাসূলের চর্চা, সেখানে ফিকহী মাজাহিবের হালাকা। ওখানে হিফজ ও ইলমে তাজীবীদের দরসগাহ। মোটকথা, মসজিদের মিম্বর থেকে ইলমের যে নূর বিচ্ছুরিত হয়েছিল নববী যুগে তারই উজ্জ্বল জ্যোতি আলোকিত করে রাখতো গোটা মসজিকে। নববী আলোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সে দীপশিখাগুলো এখন আর নজরে পড়ে না।শায়েখ আব্বাদের দরসে যুবক ও বৃদ্ধ তাালিবে ইলমদের উপচেপড়া ভীড় আর দেখতে পাই না।

আধুনিকযন্ত্রের কল্যাণে এখন সব কিছুই ক্যামরাবন্দি হয়। সেদিন একজন মসজিদে নববীর ভিতরের দৃশ্য ছবি করে পাঠালো। হৃদয়টা কেমন হাহাকার করে উঠলো। মসজিদে না আছে কোন জনসমাগম। আর না আছে তালিবে ইলমদের উপচেপড়া ভীড়। মাশায়েখে কেরামের শুন্য চেয়ারগুলো কেমন অসহায় পড়ে আছে!
প্রায় এক মাস আগে আসাতিযায়ে কেরামসহ জামিয়ার তত্তাবধানে দুটি বাসে করে আমরা রওয়ানা করেছিলাম ইহরামের লিবাসে,পবিত্র মক্কানগরির উদ্দেশ্যে। মক্কা ও মদীনার মাঝামাঝি যাওয়ার পর অভ্যন্তরিন উমরার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নতুন ঘোষণা আসে হুকুমতেরপক্ষ থেকে।

এখানের মানুষ নিয়মের প্রতিশ্রদ্ধাশীল এবং নিয়তিরপ্রতি আস্থাশীল। সেদিন জলছলোছলো চোখে মাঝপথ থেকেই আমরা ফিরে আসলাম মদীনার পথে। আল্লাহর পবিত্র ঘর আর দেখা হলো না।বাইতুল্লাহর যিয়ারত আর নছীব হলো না।

এসব কিছু আসলে আমাদেরই কর্মফল। জল-স্থলে যা কিছু অমঙ্গল সব আমার আমলেরই ফল। আমরা যখন পৃথিবীকে বিষিয়ে তুলেছি, অনাচার ও পাপাচার দিয়ে ভারি করে ফেলেছি, পৃথিবীওয়ালা সতর্ক করার জন্য আমাদের উপর পাঠিয়েছেন অশরিরী এক শক্তি, যা আমাদেরকে শুধু কুপোকাতই করেনি, পর্যুদস্তও করেছে। দেখিয়ে দিয়েছে, পৃথিবীতে আমরা কতো অসহায়। আসমানওয়ালার দয়াই আমাদের একমাত্র সহায়।
হাদীস ও ইতিহাসসহ বহুশাস্ত্র বিশারদ হাফেজ ইবনে হাজার আসকলানী রহ. তার ‘ বাযলুল মাঊন ফিফাজলিত তাঊন’গ্রন্থে লিখেছেন; ইতিহাস পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মুসলিম উম্মাহর উপর এ পর্যন্ত যত মহামারি এসেছে, সবই এসেছে শীত শেষে বসন্তকালীন সময়ে। গ্রীস্মের তাপমাত্রা যখন শুরু হয়েছে মহামারি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে।

হাফেজ ইবনে হাজারের বক্তব্য তো আমাদের জন্য বড় আশাজাগানীয়া। আমরা আবারো স্বপ্ন দেখি; হারামের পবিত্র আঙিগনায় ফিরে যাওয়ার এবং ছুটোছুটি করে, কে কার আগে নাম লিখানো মধুর প্রতিযোগিতার। আমরা আল্পনা আঁকি, আজানের মায়াবী সে দ্যোতনার ও তেলাওয়াতের বিমুগ্ধ সুর মুর্ছনার!
কিন্তু একটি প্রশ্ন এখন আমাদের কাছে বড় জলন্ত। এর কোন সদোত্তর এখনো আমরা খুঁজে পাই না।

আরববিশ্বের উদিয়মান তরুণ খতীব শায়েখ আইয়ূব যানিবী(হা.যা.) বলেন; আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, অচিরেই এ বিশ্ব করোনামুক্ত হবে। কারণ, আল্লাহ তাআলার সুন্নত হলো, উম্মতে মুহাম্মদীর মাঝে আল্লাহ মহামারি দীর্ঘস্থায়ী করেন না।
কিন্তু বলো, আল্লাহর নামে শপথ করে বলো; করোনা চলে যাওয়ার পর তোমরাও কি ফিরে যাবে তোমাদের পুরনো পাপে? নারীরা এখন ঘরে আবদ্ধ। সুদী কারবারীরা ঘুমন্ত। গানবাজনা ও নারী মদের আসরগুলো অবরুদ্ধ। কিন্তু করোনা চলে যাওয়ার পর তোমরাও ফিরে যাবে সুদি কারবারে, নারী মদের আসরে?? আল্লাহর কসম! যে মসজিদগুলো বন্ধ হওয়ার কারণে আজ আমরা হাহাকার করছি, অশ্রু ঝরাচ্ছি; করোনার আগে এ মসজিদগুলোই হাহাকার করতো ফজরের সালাতে মুসল্লীর অভাবে। দয়া করে তোমরা মসজিদগুলো অনাবাদ ছেড়ে দিয়ো না। এখন তোমাদের মাঝে দেয়া নেয়ার যে মধুর সম্প্রীতি তৈরী হয়েছে দয়া করে তা কখনো বর্জন করো না।

দয়াময় রহমান! দয়া করে আমাদেরকে আপনি তাদের মত করবেন না, যাদের বিবরণ আপনিই তুলে ধরেছেন পবিত্র কোরআনে; “তিনিই তোমাদেরকে জল-স্থলে পরিভ্রমণ করান। এমনকি যখন তোমরা নৌযানে আরোহন করো এবং সেগুলো যাত্রীদের নিয়ে অনুকূল বাতাসে বয়ে যায় তখন তারা আনন্দিত ও আন্দোলিতহয়। হঠাৎ বইতে শুরু করে উদ্যাম বায়ু এবং চারদিক থেকে ধেয়ে আসে উত্তাল তরঙ্গমালা। এমনকি তারা নিশ্চিত ধরে নেয়, চতুর্মুখী পাকড়াওয়ে তারা আক্রান্ত হয়েছে তখন তারা আল্লাহকে ডাকতে থাকে দ্বীনকে তাঁর জন্য একনিষ্ঠকরে যে, আপনি যদি আমাদেরকে এ থেকে রেহাই দেন অতি অবশ্যই আমরা শোকরগোজার বান্দাদের দলভূক্ত হবো। অতপর আল্লাহ যখন তাদেরকে বিপদমুক্ত করেন হঠাৎ দেখা যায় তারা ভূপৃষ্ঠে অন্যায় ভাবে অনাচার করে বেড়ায়।” সূরাইউনুস, আয়াত: ২২-২৩

কোরআনের এ অমীয়বাণী যেন হয় আমাদের জিন্দেগীর সারমায়া ও পাথেয়। এখান থেকে আমরা যেন শুরু করতে পারি জিন্দেগীর নয়া সফর। হে আল্লাহ! আপনিই আমাদের সহায় হোন। আমাদের কবুল ও মাকবুল করুন। -আমীন

লিখেছেন; ইবনুররশীদ
তালিবেইলম: জামিয়াইসলামিয়া, মদীনামুনাওয়ারা

পূর্ববর্তি সংবাদকরোনায় মৃত ব্যক্তি থেকে সংক্রমণ ছড়ায় না: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
পরবর্তি সংবাদ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও দুই করোনা রোগী শনাক্ত: এমআইএস