করোনায় মৃত্যুচিন্তা

 মুহাম্মাদ আদম আলী ।।

বাড়ির সামনে ত্রিশ ফিট চওড়া রাস্তা। রাস্তার পাশে আরেকটি ‎বাড়ি। বড়লোকের বাড়ি। দোতলা। বছরের পর বছর খালি পড়ে ‎আছে। বাড়িওয়ালার এরকম আরও সাতটি বাড়ি থাকায় উত্তরার ‎এ বাড়ির কোনো কদর নেই। অনেক আগে বানানো এই ‎বাড়িটির মডেল এখন পুরোনো হয়ে গেছে। ভেতরে গহীন ‎অরণ্যের নীরবতা। অহর্নিশ পরিচর্যায় ইটপাথরগুলো টিকে ‎আছে।

বাড়ির গেইটে একজন দারোয়ান চড়ুইপাখির মতো ‎কুঁজো হয়ে বসে থাকে। সারাদিন। বসে বসে রাস্তার মানুষ ‎‎দেখে। দুনিয়াতে যেন তার আর কোনো কাজ নেই! এখন ‎রাস্তায় মানুষ নেই। কিছু দেখারও নেই। দারোয়ানটাকেও আর ‎‎দেখা যাচ্ছে না। ‎ এই বিরান বাড়ির মতোই শহরের সব পথ-ঘাট। মানুষ ‎লুকিয়েছে বাড়ির ভেতর। মৃত্যুভয় তো সিন্দুকে লুকাবার ‎জিনিস নয়। তা তাকে তাড়িয়েই বেড়াচ্ছে। এতদিন মরার চিন্তা ‎করার অবকাশ হয়নি। এখন যখন হয়েছে, তখন যেন সে ‎অর্ধেক মরেই গেছে। বার বার হাত ধুয়েও অন্তরের ভয় কাটছে ‎না।‎ এখন সময় আসলেই মৃত্যু চিন্তা করার। মুমিন তো প্রতিক্ষণেই ‎মরার জন্য তৈরি থাকে।

আল্লাহওয়ালারা সবসময় লেন-দেন ‎সাফ রাখেন। মরে গেলে যেন জবাবদিহিতায় পড়তে না হয়। ‎আর আমাদের মতো সাধারণ মানুষ হুট করে মরে গেলে কী ‎অবস্থা হবে? ‎ চারিদিকে এত মানুষ আমাদের জীবনে জড়িয়ে আছে! ওইখানে ‎ফ্লাট বুকিং করা আছে, ওইখানে জমি কেনা আছে―রেজিস্ট্রি ‎হয়নি এখনো, ওইখানে জমির বায়না নেওয়া আছে―বুঝিয়ে ‎দিতে হবে, ওর কাছ থেকে এত টাকা ধার নিয়েছি―দেওয়া ‎হয়নি, বাবা মরে যাওয়ার পর বোনদের হক দেব দেব ‎করছি―দেওয়া হয়নি আজও, গরিব আত্মীয়-স্বজনদের জন্য ‎‎তেমন কিছু করা হয়নি, ছেলেমেয়েদের বিয়ে-শাদীর কথাবার্তা ‎চলছে―এরকম আরও কত কাজ বাকি! আমি মরে গেলে সব ‎‎ছেঁড়াবেড়া লেগে যাবে। মনে হয়, পৃথিবী থেমে যাবে! পৃথিবীর ‎কিছুই হবে না। তার গতিও থামবে না। সর্বনাশ যা হওয়ার তা ‎শুধু আমার একারই হবে। মানুষের দেনা-পাওনা মিটিয়ে না ‎‎গেলে আখেরাতে মুক্তির আশা করা বৃথা। মানুষের হক এ ‎‎দুনিয়াতেই আদায় করে যেতে হয়। আখেরাতের এর কোনো ‎সুযোগ নেই। ‎ সময় এখন হিসেব করার বা বুঝিয়ে দেওয়ার। মৃত্যুভয় তো ‎‎নেয়ামত।

করোনা অমুসলিমদের জন্য কি হয়ে এসেছে, সেটি ‎আমার না জানলেও হয়তো চলবে; কিন্তু করোনা মুসলিমদের ‎জন্য মুক্তির পথ নিয়ে এসেছে। এর কদর করলে আখেরাতে ‎সফলতার দেখা মিলতে পারে। মৃত্যুভয়ে আমরা মরে যেতে চাই ‎না, তবে অবশ্যই মৃত্যুর জন্য যেন প্রস্তুতি নিতে পারি। মানুষের ‎সঙ্গে সব দেনা-পাওনা সাফ করতে পারি। তাওবা-ইস্তিগফার ‎করে ঈমানে দৃঢ় হতে পারি। ফিরে যাওয়ার পথ সহজ-সুন্দর ‎করে তুলতে পারি। আজ অথবা কাল মরতে তো হবেই!

‎ পৃথিবীর অনেক অমুসলিম শহরে বিত্তবানরা রাস্তায় টাকা ছুঁড়ে ‎‎ফেলছে। যে টাকা প্রিয়জনদের বাঁচাতে পারেনি, সে টাকা রেখে ‎কী লাভ! টাকায় বাঁচে না কিছুই! যিনি বাঁচান, তার দিকেই ‎এখন ফেরার সময়। যতক্ষণ বেঁচে আছি, যতক্ষণ শ্বাস ‎চলছে―ততক্ষণ সম্পদ যেন আমাকে ধোঁকায় না ফেলে। ‎করোনায় বেঁচে গেলেও আমরা এই মৃত্যুভয়কে বঁচিয়ে রাখতে ‎চাই!

পূর্ববর্তি সংবাদরাজস্থানে মুসলিম হওয়ায় অন্তঃসত্ত্বাকে ভর্তি নিল না হাসপাতাল, নবজাতকের মৃত্যু
পরবর্তি সংবাদভারতে কোয়ারেন্টিন সেন্টার স্থাপনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ১ জনের মৃত্যু