করোনার বার্তা: সংযম ও জীবনের ২০ পাঠ

মাওলানা মনসূরুল হক।।

আলহামদুলিল্লাহ, ” করোনা ভাইরাস” থেকে বাঁচতে আমরা বিভিন্ন ভাবে সতর্কতা অবলম্বন করছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন চিকিৎসক ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সতর্কতা অবলম্বনের পদ্ধতি বলা হয়েছে ও হচ্ছে। সেগুলোর ভালো মন্দ দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে ও হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় সকলেই সতর্কতার ব্যপারে তৎপর। পরিস্কার – পরিচ্ছন্নতা, হাত ধোয়া, ঘরে থাকা, দূরত্ব বজায় রেখে চলা ইত্যাদির আলোচনা কম বেশি সবারই জানা। চিন্তা ভাবনা করলে “করোনা” থেকে আমি সতর্কতার আরো কিছু দিকনির্দেশনা পাই। যেগুলোর ব্যপারে আগে এভাবে চিন্তা ভাবনা করার এবং নিজেকে প্রশ্ন করার সময় সুযোগ পেতাম না। এখন পরিস্থিতির কারণে সেই সুযোগ হয়েছে, এটাও আল্লাহ তাআলার দয়া।

এখানে আমার ক্ষুদ্র ভাবনা থেকে কিছু বিষয় তুলে ধরছি। ১. করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে আমি ডাক্তারের দেয়া প্রতিটি পরামর্শকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে পালন করছি, সেভাবে কি আল্লাহর দেয়া বিধান ও আল্লাহর রাসূলের সুন্নাতকে পালন করছি?

২. করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে আমি যেভাবে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ও হাত ধোয়ার ব্যপারে যত্নবান, সেভাবে কি পাক পবিত্রতা ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য অযু করতে যত্নবান?

৩. করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া থেকে এবং অন্যদের ছোঁয়া থেকে নিরাপদ থাকতে আমি বাহিরে চলাচল করার সময় এখন যেভাবে মাস্ক এবং গ্লাব্ভস ব্যবহার করে চলছি, সেভাবে কি ঘরে – বাইরে পর্দাহীনতার গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য যদি পুরুষ হই তাহলে কি পরনারী থেকে দৃষ্টি নত রেখে চলছি?  অথবা যদি মহিলা হই তাহলে কি পরপুরুষের কুদৃষ্টি থেকে বাঁচতে নেকাব ব্যবহার করে চলছি ?

৪. করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে আমি এখন যেমন আক্রান্ত ব্যাক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার ব্যাপারে সতর্ক, তেমনি আল্লাহর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচার জন্য কি অসৎ মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার ব্যাপারে সতর্ক ?

৫.করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি ব্যবসা – বানিজ্য, কায়কারবারের দুনিয়াবী ক্ষনস্হায়ী ক্ষতিকে যেভাবে মেনে নিতে প্রস্তুত, চিরস্থায়ী জান্নাতের উদ্দেশ্যে দ্বীনের মেহনতের জন্য কি সেভাবে ব্যবসা – বানিজ্য, কায়কারবারের কুরবানী মেনে নিতে প্রস্তুত ?

৬. করোনায় আক্রান্ত হওয়াকে আমি নিজের জন্য যত ক্ষতিকর মনে করছি, শিরক, বিদআত অথবা গুনাহে লিপ্ত হওয়াকে কি আমি তত ক্ষতিকর মনে করছি?

৭. এই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায় ও দুঃসময়ে যেমন দুআ ও কান্নাকাটির মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করছি, স্বস্তি ও সুসময়ে কি সেভাবে আল্লাহকে স্মরণ করি?

৮. করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতির খবর শুনে নিজে এবং পরিবারের সদস্যরা এখন যেমন আতংকিত হচ্ছি, কবর, হাশর, পুলছিরাত ও জাহান্নামের বিভীষিকাময় বর্ণনা শুনে কি তেমন আতংকিত হচ্ছি ?

৯. করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য আমি এখন যেমন স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেণ্টাইনে/ঘরে আবদ্ধ থাকছি, তেমনি জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য কি ইসলামের বিধিনিষেধের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকছি?

১০. বর্তমানে করোনাকে যেমন নিজের জন্য একটি বিপদ ভাবছি, তেমনি নিজের একেকটি গুনাহ যে একেকটি মহা বিপদ সেটি কি কখনো ভেবে দেখছি?

১১. করোনার ভয়ে বাধ্য হয়ে বাসায় থেকে এখন পরিবারকে সময় দিয়ে যেমন তাদের হক্ব আদায়ের চেষ্টা করছি, অন্য সব সময় কি আল্লাহর ভয়ে তাদের সময় দিয়ে পরিবারের হক্ব আদায়ের চেষ্টা করি ?

১২. লকডাউনে নিজ পরিবারের জন্য যেভাবে বাজার সদাই ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থা করছি, যদিও সেভাবে না পারি তাওফীক অনুযায়ী অল্প হলেও কি আমার পার্শ্ববর্তী অভাবীদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছুর ব্যবস্থা করছি?

১৩. করোনার প্রভাবে যেভাবে হাজার হাজার মানুষ অপ্রস্তুত অবস্থায় চির বিদায় নিচ্ছে, এভাবে যে কোন বিপদে আমারও চিরবিদায় নিতে হতে পারে। এ অবস্থা দেখে আমি কি সর্বদা তাওবার উপর থেকে আল্লাহর সামনে দাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি?

১৪. এই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে আমি যেমন ভাবি, আমার দুনিয়ায় কি হবে? কিন্তু ঈমান হারা হয়ে মারা গেলে কি আমি ভাবি, আমার আখেরাতে কি হবে?

১৫. করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিরাপদ থাকার জন্য স্বাস্থ্যবিদদের দেয়া প্রেসক্রিপশন যেভাবে নিজের হেফাজতকারী মনে করে গুরুত্ব দিয়ে পালন করছি , সেভাবে কি কুরআন-সুন্নাহে বর্ণিত হেফাজতের দুআ ও যিকিরগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে আমল করছি ?

১৬. করোনার আযাবকে তো আমি অনেক বড় আযাব মনে করছি, কিন্তু দ্বীনের কথা শুনে, আখেরাতের কথা শুনে যে আমার অন্তর নরম হয় না, এবং আল্লাহর ভয়ে চোখে পানি আসে না, ইবাদতে মন বসে না, গুনাহ করতে অন্তর কাঁপে না, এগুলোকে কি করোনার চেয়ে বড় আযাব মনে করছি?

১৭. আমি কি ভেবে দেখেছি করোনায় যদি মারা যাই তাহলে তো আমার দুনিয়া গেল, কিন্তু যদি আমি প্রকৃত মুমিন না হয়ে মারা যাই তাহলে তো আমার আখেরাত গেল। কোনটার ক্ষতি বেশি মারাত্মক ভেবে দেখেছি?

১৮. করোনা ভাইরাসকে আমি অমুসলিমদের প্রতি আল্লাহর গযব মনে করছি, করোনা অমুসলিমদের জন্য যাই হোক মুসলিম হিসেবে আমার জন্য সতর্কবাণী এবং হেদায়েতের উসিলা নয় কি?

১৯. “কাফের করোনায় মারা গেল”- এটি দুঃসংবাদ হলেও প্রকৃত মুমিনের জন্য তো সুসংবাদ। এখন ভেবে দেখি আমি কি প্রকৃত মুমিন হতে পেরেছি?

২০. এক করোনায় পৃথিবীর সবকিছুই দেখছি ঠিকঠাক, তারপরও সবকিছু অচল। বিশ্ব শক্তি অসহায়। যেন যিন্দা কেয়ামত। অমুসলিমদের জন্য যাই হোক, মুসলিমদের জন্য এটা আল্লাহর কুদরত নয় কি? । এখন ভেবে দেখি, আমি কি আল্লাহর কুদরত দেখে ঈমান বাড়াতে পারছি? আল্লাহর সামনে নিজেকে সঁপে দিতে পারছি? আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি? আমার ক্ষুদ্র ভাবনায় উল্লেখিত বিষয়গুলো এসেছে, জ্ঞানী ব্যক্তিরা চিন্তা করলে আরো কত বিষয় আসতে পারে। হে আল্লাহ, আমাকে ভাবার তাওফীক দান করুন, পুরো উম্মতকে ভাবার তাওফীক দান করুন, আমীন।

লেখক : ইমাম, ধানমণ্ডি ভূতের গলি জামে মসজিদ 

পূর্ববর্তি সংবাদউখিয়া সীমান্তে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় দেড় শতাধিক রোহিঙ্গা
পরবর্তি সংবাদযুক্তরাজ্যে করোনায় আক্রান্ত হতে পারে ৮০ শতাংশ নাগরিক!