প্রভাবশালী দেশগুলোর লকডাউনের সঙ্গে এদেশের অবস্থা মেলানো যাবে না

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ।।

করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া এবং আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর ধনী ও প্রভাবশালী অনেক দেশে চলছে লকডাউন। সব কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়ে মানুষকে ঘরে আবদ্ধ থাকতে বলা হয়েছে। ঘরবন্দী জীবনের পরিস্থিতি চলছে গত এক-দেড় মাস ধরে। কোনো কোনো দেশের কোনো কোনো শহর লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল। এর একটি প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন মুসলিম দেশেও। অথচ সব দেশের করোনা রোগের পরিস্থিতি এবং আর্থিক পরিস্থিতি একরকম নয়। এজন্য এরকম একটি সংকটমূলক পরিস্থিতিতে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফল একেক দেশে প্রকাশ পাচ্ছে একেক রকম। সেদিকে অনেকের বিবেচনার চোখ যাচ্ছে না।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, গত কয়েকদিন ধরে তীব্রভাবে করোনা সংক্রমিত কোনো কোনো রাষ্ট্রে লকডাউন শিথিল করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিসহ নাগরিকরা পথে-ঘাটে নামছেন, কাজকর্মে যুক্ত হচ্ছেন। আমাদের দেশেও সীমিত পরিসরে কল-কারখানায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তারপরও একটি শ্রেণী সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু মসজিদ কিভাবে ‘বন্ধ’ করে দেওয়া যায়, মসজিদে নামাজের জামাত কীভাবে চূড়ান্ত রকম সীমিত করা যায় এ নিয়ে বারবার আপত্তি উত্থাপনের মতো করে কথা বলতে চেষ্টা করছে। বাজার ঘাট, ব্যাংক, মার্কেট- এ জাতীয় সব বিষয় এড়িয়ে মসজিদে লোক জমায়েতের প্রসঙ্গটিকেই তিক্তভাবে উল্লেখ করে চলেছে তারা। এসব লোকজনের কথার ধরনটা এমন, অন্য কোনো জায়গা থেকে নয়, যেন শুধু মসজিদের জমায়েত থেকেই করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে!

করোনা ভাইরাসের সংকট শুরু হওয়ার পর এদেশের বড় আলেমরা সবার আগে জাতিকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বলতে শুরু করেছেন। সতর্কতা গ্রহণের কথা বারবার বলে এসেছেন। মসজিদে উপস্থিত হলেও সেখানে যথাযথ স্বাস্থ্য সর্তকতা যেন বজায় রাখা হয় সে কথাগুলো সবিস্তারে তুলে ধরেছেন। তারপরও লোক জমায়েতের অন্যান্য অঙ্গনের পরিবর্তে মসজিদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার প্রবণতা তাদের থামেনি। একশ্রেণীর মিডিয়া ও বিদ্বেষী বুদ্ধিজীবীদের এজাতীয় একপাক্ষিক আচরণ ও বক্তব্য বারবার চোখে পড়েছে।

অনেকেই প্রভাবশালী বিভিন্ন রাষ্ট্রের লকডাউন পরিস্থিতির সঙ্গে এদেশের লকডাউনকে মিলাতে চান। অথচ তারা বাস্তব চিত্রটা কিন্তু মিলিয়ে দেখেন না। দেশের বাইরে যেসব অঞ্চলে ফুল লকডাউন চলছে, সেখানে বেশিরভাগ মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা অনেক বেশি। সেখানে মানুষকে ঘরে থাকতে বলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। অনেক দেশে বেকার ভাতা দেওয়া হচ্ছে, দেওয়া হচ্ছে আপদকালীন সময়ের বিশেষ সহযোগিতা ভাতা, নানারকম প্রণোদনা ও সহায়তা। যেসব বিষয়ে আমাদের দেশে নেই। এখানে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অতি সামান্য কিছু ত্রাণ ও সহযোগিতা চললেও চাহিদার তুলনায় সেটা অত্যন্ত কম। এরপরও তৃণমূল পর্যায়ে চালচুরি-সহ বিভিন্ন রকম দুর্নীতির খবরও আসছে। কোটির উপরে মানুষ বেকার হয়ে বসে আছে এদেশে। বেশ সংখ্যক কারখানা লো অফ ঘোষণা করেছে। প্রভাবশালী দেশের লকডাউনের সঙ্গে এদেশের লকডাউন পরিস্থিতির উপযোগিতা ও ফলাফলকে কোনভাবেই মেলানো যায় না।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হলে মানুষ মারা যাবে। কিন্তু এদেশে কোনোরকম সমন্বয় বাদ দিয়ে দীর্ঘ লকডাউন হলে ক্ষুধার কারণে কোটি কোটি মানুষ বিপদে পড়বে। তৈরি হবে নানা রকম সামাজিক সমস্যা। ক্ষুধায় আক্রান্ত হয়ে ক্ষুধার্ত মানুষ চুরি, ডাকাতি, মারামারি কাটাকাটি- এসবে জড়িয়ে যেতে কুন্ঠিত হবে না। এগুলো আশঙ্কা, যা বিভিন্ন পরিস্থিতি থেকে তৈরি হতে পারে। এজন্যই আমাদের প্রস্তাব, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থাপনাসহ লকডাউন শিথিল করে স্বাভাবিক জীবন জীবিকা নিয়ে মানুষকে চলতে দেওয়া হোক। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থাপনাসহ সুস্থ মুসল্লিদের মসজিদে জামাতে শরিক হওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। এ দেশের আর্থিক অবস্থার স্বাভাবিকতা এবং মানুষের ইবাদতের প্রয়োজনীয় অধিকার ও আয়োজন অক্ষুন্ন রাখা হোক। কারণ সব বিষয়ে ইউরোপ-আমেরিকার প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো এবং অর্থবিত্তে অনেক সচ্ছল আরব রাষ্ট্রগুলোকে অনুসরণ করার যোগ্যতা আমাদের দেশ রাখে না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের বাস্তবতা একটু ভিন্ন রকম।

অনেকেই আরব দেশের বিভিন্ন চিত্রের কথা উদাহরণ হিসেবে সামনে নিয়ে আসতে চেষ্টা করেন। সেসব দেশগুলোতে মসজিদ বন্ধ, হারামের তাওয়াফ বন্ধ এসবের উদাহরণ দিয়ে এদেশেও মসজিদের জামাত বন্ধ করা বা চূড়ান্ত রকম সংকুচিত করার পক্ষে মতামত প্রকাশ করেন। তারা বলেন, আরবের আলেমরা মসজিদ বন্ধের ফতোয়া দিতে পারলে এখানে সমস্যা কোথায়? অথচ আরব দেশের কয়েকটি বাস্তবতা তারা খোঁজ নিয়ে দেখতে চান না। আরবে মসজিদ বন্ধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের মর্জি মতো সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করার সুযোগ শুধু তারাই পান, যারা সরকার ঘনিষ্ঠ এবং সরকারের আস্থাভাজন। স্বাধীনচেতা যোগ্য আলেমদেরকে সেসব দেশে সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করার সুযোগ দেওয়া হয় না। দরবার ঘেঁষা আলেমের বাইরে অন্য বহু যোগ্য আলেম আরব দেশগুলোতে নানা রকম দুঃখ-কষ্টে দিন পার করছেন, অনেকে বন্দী জীবন যাপন করছেন। ফলে আরব দেশগুলো থেকে ধর্মীয় বিষয়ে অনেক সময় উদ্ভট সিদ্ধান্তও ব্যক্ত হতে দেখা যাচ্ছে।

যেমন কোনো একটি আরব রাষ্ট্রের একজন প্রধান মুফতি এই করোনা সংকটের অজুহাতে ঈদুল ফিতরের প্রায় দেড় মাস আগে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, ঈদের নামাজ ঘরে পড়তে হবে। একটি ভাইরাস ও মহামারীর পরিস্থিতি চলছে, সময়ের সঙ্গে এ পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল। আগামী ১৫ দিন ২০ দিনের মধ্যেও পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি তো আল্লাহ তাআলা দিতে পারেন। সেখানে রোজার মাস শুরু হওয়ারও বেশ আগে একথা বলে দেওয়া যে, ঈদুল ফিতরের নামাজ ঘরে পড়তে হবে, এটা কি কোনো যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত?

আবার কেউ কেউ এ কথাও বলছেন, দ্বীনী বিষয়ে আরব রাষ্ট্রগুলোর অপছন্দনীয় ও নেতিবাচক সিদ্ধান্তগুলোকে অনুসরণে আমাদের যতটা উৎসাহ, তাদের ইতিবাচক আইন ও নীতিগুলোকে অনুসরণ করার ততটা উৎসাহ আমাদের মধ্যে দেখা যায় না। নিজেদের মর্জি মতো কেটেছেঁটে আমরা অনুসরণ করার পক্ষে কাজ করি। তারা মসজিদে নামাজ বন্ধ করলো কিনা, তাওয়াফ বন্ধ করলো কিনা এটা খুব ফলাও করে বলি, কিন্তু তাদের দেশে চোরের হাত কেটে ফেলা হয়, খুনি ও ধর্ষকের শিরশ্ছেদ করা হয়, এটা আমরা অনুসরণ করতে চাই না। করোনার সময়ে তাদের মসজিদ বন্ধের বিষয়টি আমরা অনুসরণ করতে চাই, কিন্তু আমাদের দেশের চাল চুরির শাস্তি হিসেবে আমরা তাদের দেশে চুরির শাস্তি- হাত কাটার নীতি গ্রহণ করতে চাই না। এসবই মূলত আমাদের নীতিগত বিচ্যুতি ও আদর্শহীনতার একেকটি ফল।

কলকারখানা কিছু পরিমাণ খুলে দিয়ে, অফিস আদালত কয়েকদিন পর খোলার ঘোষণা দিয়ে এদেশের লকডাউন শিথিল করার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে আমরা আবারও বলতে চাই, করোনা ভাইরাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব সুরক্ষা ও সর্তকতাগত কর্মপন্থা অনুসরণ করে মসজিদে জামাতের সঙ্গে নামায পড়া, মানুষের ইবাদত করা এবং কাজকর্ম করে মানুষের জীবিকা উপার্জন করা- এসবের পথ সতর্কতার সঙ্গেই উন্মুক্ত থাকা দরকার। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে লকডাউন পরিস্থিতির এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে ধর্মীয় পরিস্থিতির হুবহু অনুকরণ ও সাদৃশ্য গ্রহণ করার পর্যায়ে আমাদের দেশটি নেই। আর্থিক ও জীবিকাগত এবং দ্বীনী বিষয়ে সিদ্ধান্তগত চিত্রটি আমাদের এখানে ভিন্ন। এই চিত্রের বাস্তবতা আমাদের বুঝতে হবে। এবং সামনের দিনগুলোতে সে আঙ্গিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

পূর্ববর্তি সংবাদনতুন ৭ জনসহ করোনায় মোট ১৫২ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত ৪৯৭ জন
পরবর্তি সংবাদচতুর্থ দফায় ৭ মে পর্যন্ত বাড়ানো হলো বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা