রমযানে শয়তানের অভিনব প্রবঞ্চনা

মুহিবুদ্দীন আল খতিব ।।

মানুষ কখনো কোনো মন্দ কাজে ব্যস্ত থাকে বা খেল তামাশায় লিপ্ত থাকে। হঠাৎ সম্বিৎ পেলে তার মনে হয়-এটা তো সত্য, সঠিক পথ নয়। যে কাজের জন্য সে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে ছিল সেটিতো অন্যটি। তখন তাড়াতাড়ি সে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে।

বছরের অন্য মাসগুলোর সাথে মিলিয়ে রমযানও অনুরূপ। মানুষ সারাবছর নির্দিষ্ট ব্যস্ততায় ছুটতে থাকে। রাতের ভ্রমণকারীরা যেমন পথের দু’পাশের দৃশ্য অবলোকন না করেই সম্মুখপানে ছুটতে থাকে তেমনি মানুষও ছুটতে থাকে। রাত অনেক অতিবাহিত হওয়ার পরে যখন পাহাড়ের পেছনে চাঁদের দেখা মিলে তখন ভ্রমণকারীর কাছে সবকিছু নতুনভাবে স্পষ্ট হতে থাকে। তেমনি সারাবছর ক্লান্তিকর পথচলা এবং খেল তামাশায় লিপ্ত থাকার পর যখন রমযান আসে তখন মানুষের সম্বিৎ ফিরে। সবকিছুকে মানুষ নতুনভাবে ভাবতে শুরু করে।

স্বাগতম হে রমযান, যে মাসে আমরা নিজেদে নতুনরূপে উপলব্ধি করি, আলস্য ছেড়ে কর্মময় জীবনের পানে চলতে শুরু করি।

 

গোনাহে ডুবে থাকা মানুষ দু’ধরনের হয়

১.  কিছু মানুষ গোনাহ করে তবে কোনো উপলক্ষ পেলে গোনাহ থেকে ফিরে আসে।  রমযান তাদের জন্য গোনাহ থেকে প্রত্যাবর্তনের একটি বড় উপলক্ষ। রমযানের পবিত্রতা তাদের অন্তর্চক্ষুকে খুলে দেয়। ফলে তারা অতীত অন্যায়ের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা করে।

২. কতক মানুষ এমন আছে, গোনাহমুক্তি বা তওবার সুযোগ তাদের অপরাধের মাত্রাকে আরও চড়িয়ে দেয়। রমযানে আমলের নানাবিধ ফজিলত এবং গোনাহমুক্তির অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যখন তারা স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে রমযানের পবিত্রতাকে নষ্ট করে, এটা তখন তাদের ভ্রষ্টতা বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রমযান আত্মোপলব্ধির মাস। মানুষ এ মাসে নিজের সারাবছরের আমলের হিসেব নেয়। জীবনের হিসেব নেয়। তারা চিন্তা করে- কত মানুষ রমযানের পুত-পবিত্রতা দেখে দ্বীনের পথে ফিরে এসেছে।  সুতরাং আমাদেরও আর গাফলতে ডুবে থাকা চলবে না।

রমযান নিজেকে পরিবর্তনের মাস। নতুনভাবে জীবন শুরু করার জন্য নিজেকে পরিবর্তন করা জরুরী। আমরা যখন চিন্ত করব, যে জীবন কাটিয়ে এসেছি সে জীবনে ঘটে গেছে অনেক ভুল-ত্রুটি তখন জীবনকে নতুনভাবে শুরু করার প্রয়োজনীতা আমাদের উপলুব্ধ হবে।

 

প্রতিবছরই রমযান আসে। আমরা রমযানকে অভ্যর্থণা জানাই। তবে সবার আগে আমাদের উচিত রমযানের তাৎপর্য সম্পর্কে জানা এবং রমযানে শয়তানের ধোকা-প্রবঞ্চনার ব্যাপারে সতর্ক থাকা। রমযানে শয়তানের বড় কাজ থকে মানুষকে রমযানের ব্যাপারে ভুলিয়ে রাখা ও রোযা নিয়ে নানা কু-মন্ত্রণা দেওয়া।

রমযান মানুষকে সবর, শোকর, সহনশীলতা শিক্ষা দেয়। কিন্তু শয়তান মানুষের মাঝে ক্রোধ, হতাশা এবং সংকীর্ণতা উস্কে দিতে চেষ্টা করে।

কোন ধূমপায়ী যখন রোযা রাখে, রোযার কারণে তাকে ধূমপানের ব্যাপারে সবর করতে হয়। এই সবর তার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার জন্য সহায়ক হয়। অথচ ধূমপান ছেড়ে দেওয়া তার জন্য খুব কঠিন ছিল।

কিন্তু ওদিকে শয়তান কু-মন্ত্রণা দিতে থাকে- আরে করছো কী? ধুমপান ছেড়ে তোমার কষ্ট হচ্ছে না! ধূমপান ছেড়ে দিলে তো তোমার বন্ধুরা তোমাকে তাচ্ছিল্য করবে। চাকর, অধিনস্থরা তোমাকে দুর্বল ভাববে।  আরও নানাবিধ প্রবঞ্চনা শয়তান দিতে থাকে।

রমযানে দিনের বেলা খাবার থেকে বিরত থাকা স্বাস্থ্য এবং আত্মার জন্য খুবই উপকারী। কিন্তু কয়েকঘন্টা সময় খানাপিনা থেকে বিরত থাকাকে শয়তান মানুষের সামনে  ভয়াবহরূপে পেশ করে ধোকা দিতে থাকে- আরে, এত সময় না খেয়ে থাকলে তো তুমি অসুস্থ হয়ে যাবে। এমনিতেই তো তুমি অতটা সুস্থ না।

রমযানে রাতের বেলায় আল্লাহর নৈকট্য অর্জন সহজ হয়ে যায়। এমনিতে তো তারাবীহর নামায। তার উপর সাহরির বরকতে কিয়ামুল্লাইল এবং তাহাজ্জুদের নামায পড়ারও সুযোগ হয়ে যায়।

কিন্তু শয়তান। সে তো সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। মানুষকে খেল তামাশায় ডুবিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই সে করে। গান-বাজনা, সিনেমা এবং অন্যসব অনাচারে মানুষকে লিপ্ত রাখতে সে কু-মন্ত্রণা দিতেই থাকে।

রমযানে অনেকে টিভি-ভিসিআরে ‘ধর্মীয়’ অনেক প্রোগ্রাম দেখে। কিন্তু ওইগুলো আসলে ফেরেশতাদের ঘর থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে মানুষের উপর শয়তানের ছেপে বসার সুযোগ তৈরি হয়।

প্রকৃত রোযাদারের কাছে রোযার অসামন্য ফজিলতের সামনে সামান্য সময়ের ক্ষুধা-পিপাসাকে কষ্টের মনে হয় না। কিন্তু শয়তানের ধোঁকায় যে পড়ে যায়, রোযা তার কাছে চরম কষ্টের একটি আমল মনে হয়। রোযার অসামান্য ফজিলতকে সে তুচ্ছ জ্ঞান করতে থাকে।

প্রকৃত মুসলিম যে, ইসলামের প্রকৃতি এবং রমযানের মাহাত্ম সম্পর্কে অবগত খেলতামাশপূর্ণ এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন বস্তুবাদী জীবনের সঙ্কীর্ণতা থেকে বেরিয়ে পুত পবিত্র রমযানের বরকত লাভ তার জন্য সহজ হয়ে যায়। ফলে তার জীবন আলোকিত এবং উন্নত হয়ে যায়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনকে সহজ এবং বরকতপূর্ণ করুন।

মাকালাতুল ইসলামিয়্যিনা ফি শাহরি রমযান গ্রন্থ থেকে অনুবাদ: ওলিউর রহমান 

পূর্ববর্তি সংবাদলকডাউন খুলে দিয়ে সরকার গণসংক্রমণের পথ তৈরি করে দিয়েছে: রিজভী
পরবর্তি সংবাদকরোনার প্রকোপের মধ্যে ইয়েমেনে চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব, ৫০ জনের মৃত্যু