মাওলানা রাশেদুর রহমান।।
খাঁটি মুমিনের প্রকৃত আনন্দ কিসে? সরল উত্তর, নবী-সাহাবীদের প্রতিচ্ছবি হতে পারায়। তাঁদের দুঃখ-বেদনা, হাসি-আনন্দ ও কর্মের ছায়া হতে পারায়। উম্মতে মুহাম্মদীর এ এক বৈশিষ্ট্য যে, তারা আনন্দের ক্ষেত্রগুলোতে যেভাবে নবী-সাহাবীদের অনুসরণ করে কষ্ট ও প্রতিকূলতাতেও তাঁদের পদাংক অনুসরণের চেষ্টা করে। গৃহবন্দী ও কারাগারে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে তারা নবীজির শিআবে আবি তালেবের বন্দী সময়ের সাথে মিলাতে ভালোবাসে। দেশান্তরিত হওয়ার সময় তাদের সামনে ভেসে ওঠে নবীজির হিজরতের চিত্র। জালিমদের চাবুকে পিঠ ফেটে রক্ত বেরুবার সময় তারা দেখতে পায় তায়েফের রক্তাক্ত নবীজিকে। সমাজের লোকদের গালমন্দ যখন শুনে তখন খুশি হয় এই ভেবে যে, যাক, আমি তো সেই নবীর উম্মত যাকে পাগল, কবি, গনক, জাদুকরসহ আরো কত ধরনের কথা বলা হয়েছে। আসলেই এ উম্মতের প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। আনন্দের সময় শুকরিয়া আদায় করে আর বিপদে ধৈর্য ধারণ করে।
অবশ্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ থেকে দুঃখ-কষ্ট চাইতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু দুঃখ কষ্ট চলে এলে কর্তব্য কী হবে তাও বলে দিয়েছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কখনো সাহাবীদেরকে পূর্ববর্তীদের কষ্টের জীবন-কাহিনী শুনাতেন। সাহাবীরা যেন সেসব ঘটনা শুনে দৃঢ়পদ হন। বিপদে যেন ভেঙে না পড়েন। ঈমানের পরীক্ষায় যেন অবিচল থাকেন। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নবীজিকে লক্ষ করে বলেন, “আর রাসূলদের ঐ সব বৃত্তান্ত আমি আপনার কাছে বর্ণনা করছি, যা দ্বারা আমি আপনার চিত্তকে দৃঢ় করি, এর মাধ্যমে আপনার কাছে এসেছে সত্য এবং মুমিনদের কাছে এসেছে উপদেশ ও স্মরণ।” -সূরা হুদ ১২০
নবী-রসূলদের কষ্টের জীবনকথা শুনে নবীজির অন্তর স্থির হত। চিত্ত দৃঢ় হত। সাহাবীদের অস্থিরতা দূর হত। দ্বীনের জন্য ত্যাগ ও কুরবানীর স্পৃহা আরো বেড়ে যেত। উম্মত হিসেবে আমরাও যখন নবী-সাহাবী জীবনের ত্যাগের ঘটনাগুলো চর্চা করব তখন আমাদেরও ঈমান তাজা হবে। দ্বীনের জন্য ত্যাগ ও কুরবানীর স্পৃহা পয়দা হবে। তাঁদের প্রতিচ্ছবি হওয়ার জযবা তৈরি হবে। তাঁদের সামনে আমরা কত নগন্য সে কথা বুঝে আসবে। সহীহ বুখারীর একটি হাদীস পড়া যাক।
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসিম ইবনু সাবিত আনসারীর পরিচালনায় দশজন সহাবীর একটি দল গোয়েন্দা কাজের জন্য পাঠালেন। তাঁরা উসফান ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থান হান্দায় পৌঁছলে হুযাইল গোত্রের একটি শাখা বানু লিহয়ানকে তাদের আগমনের কারণ সম্পর্কে জানানো হয়। (এ সংবাদ শুনে) তারা প্রায় একশ’ জন তীরন্দাজ প্রস্তুত হয়ে মুসলিমদের বিপক্ষে যুদ্ধ করার জন্য রওয়ানা হল এবং তাদের পদচিহ্ন ধরে পথ চলতে লাগল। যেতে যেতে তারা এমন জায়গায় পৌঁছে যায় যেখানে অবস্থান করে সহাবীগণ খেজুর খেয়েছিলেন। তা দেখে বানু লিহয়ানের লোকেরা ইয়াসরিবের খেজুর বলে তাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে তাদেরকে খুঁজতে লাগল। আসিম ও তাঁর সঙ্গীগণ তাদের আগমন সম্পর্কে বুঝতে পেরে একটি স্থানে গিয়ে আশ্রয় নেন। লিহয়ান কাওমের লোকেরা তাদেরকে ঘিরে ফেলে। তারপর তারা মুসলমানদেরকে নিচে নেমে আত্মসমর্পণের আহবান জানায়। বলে, তোমাদেরকে ওয়াদা দিচ্ছি, আমরা তোমাদের কাউকে হত্যা করব না।
দলপতি আসিম ইবনু সাবিত (রাঃ) বললেন, হে আমার সাথী ভ্রাতৃবৃন্দ! কাফিরের নিরাপত্তায় আশ্বস্ত হয়ে আমি কখনো নিচে নামব না। তারপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ্! আমাদের খবর আপনার নাবীকে জানিয়ে দিন। এরপর কাফিররা মুসলিমদের প্রতি তীর ছুঁড়তে শুরু করল এবং ‘আসিমকে (ছয়জন সহ) শহীদ করে ফেলল।
বাকী তিনজন, খুবায়ব, যায়দ ইবনু দাসিনা এবং অপর একজন তাদের ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে তাদের নিকট নেমে আসলেন। শত্রুগণ তাঁদেরকে পরাস্ত করে নিজেদের ধনুকের রশি খুলে তা দিয়ে তাদেরকে বেঁধে ফেলল। এ দেখে তৃতীয়জন বললেন, এটাই প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না, আমার জন্য শহীদ সঙ্গীদের আদর্শই অনুসরণীয়। অর্থাৎ আমিও শহীদ হয়ে যাব। তারা তাকে বহু টানা হেচড়া করল। কিন্তু তিনি তাদের সঙ্গে যেতে অস্বীকার করলেন। (তারা তাঁকে শহীদ করে দিল)
এরপর খুবায়ব এবং যায়িদ ইবনু দাসিনাকে নিয়ে গিয়ে তাদেরকে বিক্রি করে দিল। এটা ছিল বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা। বদর যুদ্ধে খুবায়ব রাঃ যেহেতু হারিস ইবনু আমিরকে হত্যা করেছিলেন। তাই (বদলা নেয়ার জন্য) হারিস ইবনু আমির ইবনু নাওফিলের পুত্রগণ তাঁকে ক্রয় করে নিল। খুবায়বরাঃ তাদের নিকট বন্দী অবস্থায় কাটাতে লাগলেন। এরপর তারা সবাই তাকে হত্যা করার দৃঢ় সংকল্প করল। তিনি হারিসের কোন এক কন্যার নিকট থেকে ক্ষৌরকর্মের জন্য একটি ক্ষুর চেয়ে নিলেন। হারিসের কন্যার অসতর্ক অবস্থায় তার একটি ছোট বাচ্চা খুবাইবের কাছে গিয়ে পৌঁছল। হারিসের কন্যা দেখতে পেল, খুবায়ব তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে রানের উপর বসিয়ে ক্ষুরখানা হাতে ধরে আছেন। হারিস-কন্যার বর্ণনা, আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম, খুবায়ব তা বুঝতে পারলেন। তখন তিনি বললেন, আমি শিশুটিকে মেরে ফেলব বলে তুমি কি ভয় পেয়েছ? আমি কখনো এমন কাজ করব না। হারিস কন্যা আরো বলেছে, আল্লাহর কসম! আমি খুবায়বের মত উত্তম বন্দী আর কখনো দেখিনি। আল্লাহর কসম, একদিন আমি তাকে আঙ্গুরের গুচ্ছ হাতে নিয়ে আঙ্গুর খেতে দেখেছি। অথচ সে লোহার শিকলে বাঁধা ছিল এবং সে সময় মক্কায় কোন ফলই ছিল না। হারিসের কন্যা বলত, ঐ আঙ্গুরগুলো আল্লাহ্ তা‘আলা খুবায়বকে রিযকস্বরূপ দান করেছিলেন
অবশেষে একদিন তারা খুবায়বকে হত্যা করার জন্য যখন হারামের সীমানার বাইরে নিয়ে গেল তখন খুবায়ব (রাঃ) তাদেরকে বললেন, আমাকে দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করার সুযোগ দাও, তারা সুযোগ দিলে তিনি দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি, তোমরা এ কথা না ভাবলে আমি সালাত আরো দীর্ঘায়িত করতাম। এরপর তিনি এ বলে দু’আ করলেন, হে আল্লাহ্! তাদেরকে এক এক করে গুণে রাখ, তাদেরকে বিক্ষিপ্তভাবে হত্যা কর এবং তাদের একজনকেও বাকী রেখ না। তারপর তিনি আবৃত্তি করলেনঃ ‘‘আমি যখন মুসলিম হয়ে শহীদ হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করছি, তাই আমার কোনই ভয় নেই।আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে যে কোন অবস্থাতেই আমার মৃত্যু হোক।
তা যেহেতু একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই, তাই তিনি ইচ্ছে করলে আমার প্রতিটি কর্তিত অঙ্গে বারাকাত প্রদান করতে পারেন।’’ এরপর হারিসের পুত্র আবূ সারুআ ‘উকবাহ তাঁর দিকে দাঁড়াল এবং তাঁকে শহীদ করে দিল। এভাবেই খুবায়ব (রাঃ) সে সব মুসলিমের জন্য দু’ রাক‘আত সালাতের সুন্নাত চালু করে গেলেন যারা ধৈর্যের সঙ্গে শাহাদাত বরণ করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐদিনই সহাবীদেরকে জানিয়েছিলেন যে দিন তাঁরা শত্রু বেষ্টিত হয়ে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। কুরাইশদের নিকট আসিম (রাঃ)-এর নিহত হওয়ার খবর পৌঁছলে তারা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আসিমের শরীরের কোন অঙ্গ কেটে আনাতে কতক কুরাইশ কাফিরকে প্রেরণ করল। যেহেতু (বদরের দিন) আসিম ইবনু সাবিত কুরাইশের একজন বড় নেতাকে হত্যা করেছিলেন। এদিকে আল্লাহ্ ‘আসিমের লাশকে হিফাযাত করার জন্য মেঘের মত এক ঝাঁক মৌমাছি পাঠিয়ে দিলেন। মৌমাছিগুলো আসিম (রাঃ)-এর লাশকে শত্রু সেনাদের হাত থেকে রক্ষা করল। ফলে তারা তাঁর দেহের কোন অঙ্গ কেটে নিতে পারল না। – সহীহ বুখারী ৩৯৮৯ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নবী-সাহাবীদের পূর্ণ অনুসরণ করার তাওফিক দিন।
















