কসতুনতুনিয়া বিজয়: রাসূলের ভাষ্যে ভীষণই উত্তম সেই বিজয়ী দলের নেতা

আরজু আহমাদ ।।

কন্সটান্টিনোপল শহর ছিল পূর্ব রোমান সম্রাজ্যের রাজধানী৷ ৩৩০ খ্রিস্টাব্দে এর গোড়াপত্তন হবার পর থেকে সমগ্র মধ্যযুগে ইউরোপের সর্ববৃহৎ ও সবচে’ সমৃদ্ধ নগরী ছিল কন্সটান্টিনোপল। রোমান সম্রাজ্যের তাজ হিসেবেই বিবেচনা করা হত।

ইসলামের যে নবতর সূর্য আবির্ভূত হয়েছিল তা রোমান আর পারসিক সম্রাজ্যের মধ্যবর্তী সার্বভৌম ও স্বশাসিত একটা ছোট্ট অঞ্চলে ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুটি অঞ্চলই খেলাফতের অধীন আসার কথা আমাদের জানিয়ে গিয়েছিলেন।

পারস্য ও রোমান সম্রাজ্যের পূর্বাংশ অর্থাৎ বাইজেন্টানাইনদের বিপুল সংখ্যক ভূমি উমার রা. এর শাসনামলেই খেলাফতভূক্ত হয়ে যায়। উমাইয়াদের শেষকাল অবধি বিজয়ের সে ধারা অব্যাহত থাকলেও আব্বাসীয়দের আমলে কিছু শ্লথ হয়ে পড়ে।

কিন্তু ইতোমধ্যে ইসলামি সম্রাজ্য মিসর, সিরিয়া এবং আফ্রিকান উপকূল জুড়ে নিজের আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান প্রধান সমুদ্রবন্দরে নৌ প্রতিরক্ষা ঘাটি নির্মাণ করে সমুদ্র অঞ্চলে রোমান আধিপত্য নস্যাৎ করে দেওয়া হয়।

এন্টিওক, ইরক্বা, ত্রিপোলি, জুবাইল, বৈরুত, সাইদা (Sidon), সুর (tyre), আক্কা (acre), তানিস (মানাজালা লেকের একটা পেনিন্সুলা), দিমায়াত, বুরুলাস (নীল অববাহিকা), রাশিদ (Rosetta) এবং আলেকজেন্দ্রিয়া বন্দরসমূহ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

আব্বাসীয়দের শেষ সময়কালে সীমিত হয়ে আসক ইসলামি বিজয়াভিজান পুনরায় নতুন শৌর্যবীর্য নিয়ে উসমানী খিলাফতকালে (Ottoman era) শুরু হয়। এই প্রথমবারের মত মূল ইউরোপীয় ভূখণ্ডের বিশাল ভূমি বিজিত হয়।

আধুনিক বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, আর্মেনিয়া, রোমানিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসোডেনিয়া, কসোভো, বসনিয়া, হার্জেগোভিনা, মন্টেনেগ্রো, ইউক্রেন, রাশিয়ান অবিজিত অঞ্চল, ইতালি, হাঙ্গেরি, ক্রোয়েশিয়া, সাইপ্রাস, রিপাবলিক অব জেনা, রিপালবলিক অব ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া।

ইউরোপের বাইরে আফ্রিকা এবং আধুনিক রাশিয়ান ফেডারেশনের বহু রাষ্ট্র তাঁদের হাতে ইসলামি খেলাফতভূক্ত হয়। যেমন আর্মেনিয়া, মাল্টা, মলোডোভা, ক্রিমিয়া।

উসমানি খিলাফতকালে কৌশলগত দিক থেকে, ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় এমনকি ধর্মীয় দিক থেকেও সবচে’ বড়ো বিজয় ছিল কন্সটান্টিনোপল।

সুলতান মুরাদ ছানী ইন্তেকালের পর তাঁর পুত্র মুহাম্মাদ সানী (আল ফাতিহ) তৃতীয়বারের মত মসনদে বসেন। এই সময় তাঁর বয়স ২০ বছর ছিল।

অভিষেকের পরই তিনি সর্বপ্রথম নজর দেন কন্সটান্টিনোপল বিজয়ে। আনাতোলিয়ায় আগে থেকেই দূর্গ নির্মাণ করে রেখেছিলেন তাঁর দাদা বায়েজিদ।

তিনি নিজেও বসফরাস প্রণালিকে কেন্দ্র করে আরও কিছু দুর্গ নির্মাণ করেন। বিশেষত রামেলি দুর্গ। আর্কিটেক্ট মহিউদ্দিন আগা এবং ৭ হাজার নির্মাণ শ্রমিক নিয়োগ করে ৪ মাসে ত্রিকোণাকৃতির এই দূর্গ নির্মাণ করেন।

দেয়াল ছিল ২২ ফুট প্রশস্ত। ওয়াচ টাওয়ার ছিল ৩২ ফুট পুরো। সমগ্র টাওয়ার ছিল গলিত পিতল ঢেলে মুড়ানো। যাতে কামানের আঘাত মোকাবিলা করতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ কামান প্রস্তুত করা হয়।

হাঙ্গেরিয়ান মতান্তরে রোমানিয়ান নাগরিক, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী অস্ত্র প্রকৌশলী উরবান এই প্রকল্পের চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন।

যে কামান নির্মাণ করা হয় এর সক্ষমতা ছিল ১ মাইল। গোলার ওজন ছিল ৩০০ কেজি। এডমিরাল বালতাহ উগলু সুলাইমানের নেতৃত্বে ২০ হাজার নৌসেনা ৪০০ যুদ্ধজাহাজ এবং ৮০ হাজার স্থল যোদ্ধা খলিফার সেনাপতিত্বে এতে যোগ দেয়।

১৪ টি পূর্ণ আর্টিলারি ব্যাটলিয়ন মোতায়েন করা হয় ২০০ ভারী কামানসহ। কন্সটান্টিনোপলের সমুদ্রসীমা বিশাল লৌহনির্মিত শিকল দ্বারা সুরক্ষিত ছিল।

অতিক্রম করা অসম্ভব হওয়ায় সুলতান গোল্ডেন হর্নের উত্তরপ্রান্তের স্থলভাগে কাঠের আস্তরণ নির্মাণ করে ওতে তেল ঢেলে নৌকা ঠেলে নিয়ে পুনরায় জলভাগে ফেলবার নির্দেশ দেন। রাতের আধারে এই কাজ করা হয়।

আবার যন্ধ্যে থেকে ভারী আর্টিলারি নিক্ষেপ করে ভিন্ন দিকে রোমানদের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। পৃথিবীতে এই প্রথম স্থলপথে যুদ্ধজাহাজ চলল। রোমানরা সকাল হতেই নিজেদের অবরুদ্ধ দেখতে পেল।

সুলতান সম্রাটকে আত্মসমর্পণের অনুরোধ করলেন। এও জানালেন তিনি যাবতীয় সম্পদ নিয়ে সরে যেতে পারবেন। সমস্ত নাগরিক ও সম্পদের সুরক্ষা থাকবে। রোমানরা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল।

সুলতান ফজরের নামাজের পরপরই ১৮ মে তে ১৪৫৩ তে নগর সুরক্ষা দেয়াল ভাঙতে ভারি কামানের গোলা নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। দেয়ালের একাংশ ভেঙে পরে। সৈন্যরা প্রবেশ করে।

উসমানি খেলাফতের প্রথম শহীদ হয় পতাকাবাহী শাহজাদা ওয়াহিদ্দুদীন সুলায়মান। যিনি নগররক্ষা দেয়ালের উপর খেলাফতের পতাকা হাতে দাঁড়িয়েছিলেন।

তাঁর হাত থেকে পতাকা ভূপাতিত হবার পূর্বেই একে আরও ১৮ জন উসমানী সেনা তা তুলে নেয় এবং প্রত্যেকে শহীদ হয়। স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধেই শহর বিজিত হয়। এর মাধ্যমে দেড় হাজার বছরের দুনিয়ার অন্যতম পরাশক্তির পতন হয়।

১১২৩ বছরের পুরনো এই নগরি তার যাবতীয় ইতিহাস ও সমৃদ্ধি নিয়ে ইসলামের ছায়াতলে আসে এবং ৫৬০ বছর ইসলামি খেলাফতের বিলুপ্তপূর্ব অবধি রাজধানীর সম্মান ভোগ করে। নাম দেওয়া হয় ‘ইসলাম বুল’, ‘ইস্তানবুল’।

সমগ্র মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্বশীলদের এই সংবাদ সুলতান নিজে পত্রমারফত জানান। কা’বা ও মসজিদে নববীর ভেতর তা পাঠ করে শুনানো হয়। মিসর, সার্বিয়া, হিজায, শাম, খোরাসান প্রভৃতি অঞ্চলের শাসকদের কাছে পত্র প্রেরণ করা হয়।

এই বিজয় ইসলামের জন্য পূর্ব ইউরোপ ও বলকান অঞ্চলে প্রবেশের অবারিত দ্বার খুলে দেয়। বিশর আল ঘানাভি রা. (কেউ কেউ তাঁকে হায়ছামী গোত্রের বলেছেন) বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

لَتُفْتَحَنَّ الْقُسْطَنْطِينِيَّةُ فَلَنِعْمَ الْأَمِيرُ أَمِيرُهَا وَلَنِعْمَ الْجَيْشُ ذَلِكَ الْجَيْشُ

অর্থাৎ, “মুসলমানরা অবশ্যই কনস্টান্টিনোপল জয় করবে। ভীষণই উত্তম হবে সেই বিজয়ী দলের নেতা। উত্তম হবে সে বাহিনী।” মুসনাদে আহমদ, মুসতাদরাকে হাকেম, তাবরানী এই হাদীস বর্ণনা করেছেন।

হামযা আল জাইন, ইমাম যাহাবী, আল হায়ছামী, ইমাম সুয়ূতি, শায়খ শোয়াইব আর-নাউত এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন। কেবল একটা বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে শায়খ আব্দুল বার এটাকে হাসান স্তরের বলেছেন।

সুতরাং এই হাদীস সহীহ হবার ক্ষেত্রে কোনও সন্দেহের অবকাশ নাই। বুখারীও এই হাদীস তাঁর তারিখ আল কাবিরে বর্ণনা করেছেন। এই হাদীস আরেকটা দিক কিন্তু আমাদের সামনে আনে।

সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ ছিলেন হানাফি মাযহাবের অনুসারী, মাতুরিদি আক্বিদায় বিশ্বাসী এবং সুফিবাদের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম তাঁর ও তাঁর বাহিনীর যে ভাষায় প্রশংসা করেছেন তা হাদীসের সুবিশাল জগতে অত্যন্ত বিরল।

লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া।