সে যুগে দাসদের সাথে মুসলমানরা কেমন আচরণ করেছিল

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: সম্প্রতি একের পর এক  ইউরোপে দাস ব্যবসায়ীর ভাস্কর্য অবমাননার ঘটনাগুলো আবারও প্রমাণ করল, ইতিহাস কখনোই কাউকে ক্ষমা করে না। হয়তো সময়ের আবর্তে কিছু দিন, কয়েক বছর, নিদেনপক্ষে দু-এক শতাব্দী হয়তো পার হয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু সত্য যখন প্রকট হয়ে প্রকাশ পায় তখন সবকিছু দুমড়ে মুচড়ে নিয়ে যায়। সভ্যতা, শিল্প, সংস্কৃতি, উন্নতির কথা বলে দেশের পর দেশ দখল করে ইউরোপ আমেরিকা মানবতাকে কী দিয়েছিল, মানুষ আবার তা হিসাব নিতে  শুরু করেছে।

পক্ষান্তরে ইসলামের সোনালী যুগে যে সব দেশ রাষ্ট্র সমাজ জাতি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের সঙ্গে মুসলমানরা কেমন আচরণ করেছিল তাও ইসলামের ইতিহাসে লেখা আছে। এমন কি দাস হয়ে যারা কোনো মুসলমানের অধীন হতে পেরেছিল, তাদের জন্য খুলে গিয়ে ছিল সৌভাগ্যের দুয়ার। মানবিক সব অধিকার তারা অন্যান্য মুসলমানের মতই বরং আরো বেশী ভোগ করেছে।

ইসলামের শিক্ষা-দীক্ষার সর্বজনীনতার সুযোগটির কথাই ধরুন। ইসলামে জ্ঞান-অর্জনের সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত। তা বিশেষ কোনো গোত্র-গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের বিশেষ অধিকার নয়। যে কোনো বংশের, যে কোনো গোত্রের, যে কোনো অঞ্চলের যে কোনো মুসলিম জ্ঞান-অর্জনে ব্রতী হতে পারেন এবং মেধা, যোগ্যতা, চেষ্টা ও সাধনার দ্বারা ইমামের মাকামে উন্নীত হতে পারেন।

তৎকালীন ইসলামী দুনিয়ার জ্ঞান-ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, আযাদকৃত দাসরা তখন জ্ঞানার্জনের উন্মুক্ত সুযোগের কারণে একসময় সমগ্র মুসলিমজাহানের জ্ঞান কেন্দ্রগুলোর অধিপতিতে পরিণত হয়েছিল।

দ্বিতীয় হিজরী শতকের ইসলামী দুনিয়ার উপরই যদি একবার নজর বোলান এবং লক্ষ করেন কোন্ জনপদে কে ইলমের ইমাম তাহলে এই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

মক্কা মুকাররমা থেকে শুরু করুন।

মক্কা মুকাররমায় এখন ইলমের ইমাম কে?

: আতা ইবনে আবী রাবাহ।

: তিনি ‘আরব’ না ‘মাওলা’ (আযাদকৃত দাস) ?

: মাওলা।

: একজন মাওলা  কীভাবে আরবদের ইমাম হয়ে গেলেন?

: ইলম ও তাকওয়ার কারণে।

: ইয়ামানবাসীদের ইমাম কে?

: তাউস ইবনে কায়সান।

: তিনি আরব না মাওলা?

: ‘মাওলা’।

: তিনি কীভাবে ইমামের আসনে সমাসীন হলেন?

: যেভাবে আতা সমাসীন হয়েছেন।

: মিশরের ইমাম কে?

: ইয়াযীদ ইবনে আবী হাবীব।

: তিনি আরব না মাওলা।

: মাওলা।

: সিরিয়ার ইমাম?

: মাকহূল।

: তিনি আরব না মাওলা?

: মাওলা।

: জাযীরার ইমাম?

: মায়মুন ইবনে মেহরান।

: তিনি আরব না মাওলা?

: মাওলা।

: খোরাসানবাসীর ইমাম কে?

: যাহহাক ইবনে মুযাহিম।

: তিনি আরব না মাওলা?

: মাওলা।

: বসরার ইমাম কে?

: হাসান বসরী।

: তিনি আরব না মাওলা?

: মাওলা।

: কুফার ইমাম কে?

: ইবরাহীম নাখায়ী।

: তিনি আরব না মাওলা?

: তিনি আরব।

ভেবে দেখুন কত পরে একজন আরবের নাম এসেছে। ঐ সময়ে আরবেরা রাজ্যশাসনে এগিয়ে ছিলেন ফলে মাওয়ালিরা এগিয়ে গিয়েছিলেন জ্ঞান- সাধনায়।

 

ইসলামী দেশগুলোতে ‘দাস’ হওয়া দোষের বিষয় ছিল না

শায়খুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী লেখেন-

এক অমুসলিম ফরাসী লেখক বলেন, ইসলামী দেশগুলোতে ‘দাস’ হওয়া দোষের বিষয় নয়। এমনকি কনস্টান্টিনোপলের সকল সুলতান, যারা ছিলেন মুসলমানদের আমীর, দাসীর গর্ভে জন্ম লাভ করেছেন।… মিসরের আমীরেরা ‘দাস’ কিনে আনতেন এবং তাদের শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত করে তুলতেন এরপর নিজের কন্যাদের তাদের সাথে বিয়ে দিতেন। -তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম ১/১৭৭

 

তিনি আরও বলেছেন- ইসলামের ইতিহাসে কত দাস উন্নীত হয়েছেন মর্যাদা ও নেতৃত্বের উচ্চ শিখরে! কত দাস পরিণত হয়েছেন আযাদ লোকেদেরও পরম সম্মানিত উস্তাযে। কত দাস যাপন করেছেন এমন কীর্তিময় জীবন, যা ছিল আযাদ লোকদের জন্যও ইর্ষণীয়। আমাদের ইতিহাস এমন সব দৃষ্টান্তে ভরপুর। -তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম ১/১৭৬

 

এই যে চিন্তা ও কর্মের বিল্পব এটা ছিল সীরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবদান। এক হাদীসে তিনি ইরশাদ করেছেন-

তিন প্রকারের মানুষের জন্য রয়েছে দুই দুই আজর : এক. যে কিতাবী নিজের নবীর উপর ঈমান এনেছে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপরও ঈমান এনেছে। দুই. যে দাস আল্লাহর হকও আদায় করেছে, নিজের মালিকদের হকও আদায় করেছে। আর তিন. যার কাছে একজন দাসী আছে সে তাকে উত্তম জ্ঞান ও আদব শিক্ষা দিয়েছে এরপর তাকে আযাদ করে বিয়ে করেছে তার জন্যও দুই বিনিময়। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৭ ; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৪

তাঁর শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে সাহাবা-তাবেয়ীন তাঁদের অধীনস্তদের কীভাবে শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসর করেছেন তার একটি নমুনা দেখুন-

বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ইকরিমা রাহ. -যিনি ছিলেন ইবনে আব্বাস রা.-এর মাওলা বলেছেন-

طَلَبْتُ العِلْمَ أَرْبَعِيْنَ سَنَةً، وَكُنْت أُفْتِي بِالبَابِ، وَابْنُ عَبَّاسٍ فِي الدَّارِ.

)قال : و) أَنَّ ابْنَ عَبَّاسٍ، قَالَ: انْطَلِقْ، فَأَفْتِ النَّاسَ، وَأَنَا لَكَ عَوْنٌ.

আমি চল্লিশ বছর ইলম অন্বেষণ করেছি। আমি দরজায় বসে ফতোয়া দিতাম আর ইবনে আব্বাস রা. ঘরে থাকতেন। ইবনে আব্বাস রা. আমাকে বলেছেন, যাও, মানুষকে দ্বীনের বিষয়ে ফতোয়া দাও আর আমি তোমার সহযোগিতাকারী। -সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/৫০৫

কর্মের দ্বারাই মর্যাদা

শুধু ইলমের ক্ষেত্রে নয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলাম এই নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে যে, মানুষের মর্যাদা তার নিজ কর্ম ও যোগ্যতার দ্বারা, নিছক বংশ ও কৌলিন্যের দ্বারা নয়।

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

مَنْ بَطَّأَ بِهِ عَمَلُهُ، لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسَبُهُ

যার কর্ম তাকে পিছনে নিয়ে যায়, কৌলিন্য তাকে এগিয়ে নিতে পারে না। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৯৯; মুসনাদে আহমাদ ২/২৫২, হাদীস ৭৪২৭

আপন কর্ম ও যোগ্যতার দ্বারা সমাজে যার যে অবস্থান তাকে ঐ অবস্থানেই রাখতে হবে। নতুবা তা হবে যুলুম।

আয়েশা রা. বর্ণনা করেছেন-

أَمَرَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نُنَزِّلَ النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেছেন, আমরা যেন প্রত্যেক মানুষকে স্বস্থানে রাখি।