কমর উদ্দীন রুমী রহ.-এর মাজার থেকে ফিরে

ওলিউর রহমান ।।

নেত্রকোনায় দ্বীনচর্চা এবং ইসলাম প্রচারের ঐতিহাসিক সিলসিলায় শাহ সুলতান কমর উদ্দীন রুমি রহ.-এর নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তার কবরস্থান নেত্রকোণা জেলা শহর থেকে আট কিলো দক্ষিণে মদনপুরে অবস্থিত। তবে দেশের অপরাপর অনেক বুযুর্গের কবরের মতো এই মহান মনীষীর মাজারকে কেন্দ্র করেও জারি আছে অবৈধ সব কার্যকলাপ।

সেদিন শনিবার হবে। বিকেলে হঠাৎ বাইকে চেপে মনে হলো-শাহ সুলতান কমর উদ্দীন রুমী রহ.-এর কবর যিয়ারত করে আসি। করোনার কারণে হয়ত মাজারে তেমন ভিড় হবে না এবং অপ্রীতিকর কোনো ঘটনারও সম্মুখীন আমাদেরর হতে হবে না।

আমার নানার মামাদের বাড়ি মদনপুরের কাছে। শুনেছি কয়েক পুরুষ আগে তারা ইসলামে দীক্ষিত হয়েছেন। তাই এটা অস্বাভাবিক না যে, আমাদের ইসলামের মহা দৌলত লাভের পেছনে শাহ সুলতান রুমী রহ.-এর দাওয়াতী কার্যক্রমের অবদান ছিলো।

লোকশ্রুতি এবং ঐতিহাসিক তত্ত্ব-তালাশ করে জানা গেছে, শাহ সুলতান রুমী রহ. ইতালি থেকে ধর্ম প্রচারের মিশন নিয়ে ৪৪৫ হিজরীতে বাংলা অঞ্চলে এসেছিলেন। ইসলাম এ অঞ্চলে তখনও পুরোপুরি বিস্তার লাভ করেনি। এ অঞ্চলের মানুষ তখনও পর্যন্ত বড় আকারে পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসী। নেত্রকোণা জেলার নামই ছিল আগে কালীগঞ্জ।

দিনাজপুর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বগুড়ার মহাস্থানগড় এবং পরে যমুনা নদী পাড়ি দিয়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলে আসেন কমর উদ্দীন রুমী রহ.। তার দাওয়াতে এ অঞ্চলের অনেক লোক ইসলামে দীক্ষিত হন। নেত্রকোণায় তখন মদনকোচ নামে এক হিন্দু রাজার শাসন। কমর উদ্দীন রুমী রহ.-এর হাতে ইসলাম গ্রহণকারীদের চরম নির্যাতন করত রাজা মদনকোচ। ভক্তদের নিপীড়নের খবর শুনে দরবেশ রহ. বহ্মপুত্র নদ পেরিয়ে নেত্রকোণায় আগমন করেন এবং আরও জোরদারভাবে ইসলাম প্রচারের কাজ করতে থাকেন।

এ ব্যাপারেও লোকশ্রুতি আছে, ছোটখাটো এক যুদ্ধের মাধ্যমেই তখন রাজা মদনকোচের পরাজয় হয় এবং বর্তমান জেলা শহর থেকে আট কিলো দূরে কমর উদ্দীন রুমী রহ. নিজের খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। জায়গাটির নাম হয় মদনপুর।

জামেউল উলুম নামে খানকা পার্শ্ববর্তী একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার খবরও ঐতিহাসিক কিছু সূত্র থেকে জানা যায়।

সেদিন আমরা গিয়েছিলাম এই মহান কীর্তিমান মানুষটার কবর যিয়ারত করতে। মাজার কেন্দ্রীক বার্ষিক উরশ এবং সেখানের নিত্য দিনের বেদআতি আয়োজনের ব্যাপারে আমাদের ধারণা অবশ্য ছিল। তবে করোনাকালের নির্জনতার সুযোগ গ্রহণ করতেই মূলত আমাদের যাওয়া।

কারুকার্য খচিত সবুজ গিলাফে ঢাকা কমর উদ্দীন রুমী রহ.-এর কবর দুইজন মানুষ সমান উচ্চতায় পাকা করা। পায়ের দিকে চারজন লোক বসা। তন্মেধ্যে তিনজনই ব্রাহ্মণদের পূজাপাঠের মতো হাতজোড় করে মাজারের দিকে মিনতি করছেন। মনে হলো মানুষের গমনাগমনের ব্যাপারে সম্পূর্ণই বেখবর তারা। আর চতুর্থজন ইতিউতি করছেন। আর কবরের মাথার দিকে কয়েকজন বয়স্কলোককে দেখা গেল আগন্তুকদের নির্দেশনা প্রদানের জন্য বসে আছেন। ছেটে রাখা কাঁচা-পাকা দাড়ির একজনের হাতে খেজুরের ডাল দিয়ে বানানো একটি ছোট ঝাড়ু মতন কিছু একটা। মাজারের জিম্মাদার গোছের লোক মনে হলো তাকে।

আমরা তিনজন ছিলাম। সাদামাটা লম্বা পাঞ্জাবী এবং পাঁচকল্লি টুপিধারী। অন্যদের মতো অতি ধীরে বিনয়াবনত না হয়ে মাজারের দিকে আমাদের স্বাভাবিক হাঁটতে দেখে মুরুব্বি গোছের কয়েকজনকে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখলাম।

ফিকহী তরিকা অনুযায়ী আমরা কবর যিয়ারত করতে দাঁড়ালে ঝাড়ু হাতের খাদেম সাহেব আমাদের বসে ‘আদব তমিযের’ সাথে ‘দোয়া দুরুদ’ পড়তে বললেন। বসে হাতজোড় করে মিনতি করা আমাদের ‘অস্তিত্ব’ পরিপন্থী হওয়ায় আমরা দাঁড়িয়েই থাকলাম এবং উপস্থিত লোকদের বিরাগবাজন হলাম।

স্বভাবজাত অভ্যাসবসত আমরা কারো সাথে তর্কে জড়ালাম না ঠিক (এবং তা মুনাসিবও নয়) তবে জনা দশেক লোক দূর থেকে আমাদের অনুসরণ করতে লাগলো। বেশি সময় সেখানে কাটানো আমাদের পক্ষে আর সম্ভব ছিল না।

মাজার কেন্দ্রীক এমন ঘটনা স্বাভাবিকই। শাহজালাল রহ., খানজাজান আলী রহ. সহ এদেশে ইসলাম প্রচারে অসামান্য ভূমিকা রাখা মনীষীদের প্রায় সবার কবর কেন্দ্রীক একই রকম চিত্রই সচরাচর দেখা যায়।

আমাদের পূর্বপুরুষদের ইসলাম গ্রহণে যে মহান ব্যক্তিটির কুরবানী ছিল তার কবরে গিয়েই আমাদের ভাই, বন্ধুদের এমন বিদয়াতি কাজে লিপ্ত হওয়া আমাদেরকে অনেক পীড়া দিল।

পূর্ববর্তি সংবাদএবার হজে সর্বোচ্চ ১০ হাজার জন যোগ দিতে পারবেন
পরবর্তি সংবাদবিদ্যুৎ বিলের ভোগান্তিতে যশোর ও ঝিনাইদহের ১০ লাখের বেশি গ্রাহক