ইসলাম টাইমস ডেস্ক: প্রায় একশো বছর আগে, ব্রিটিশ সৈন্যদের গুলিতে নিহত এক মুসলিম নেতা। ভারিয়ানকুন্নাথু কুঞ্জাহামেদ হাজী নামের ওই নেতা মালাবার বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আর ব্রিটিশ শাসন উপেক্ষা করে প্রায় ছ’মাস নিজের সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তাকে এতদিন বিদ্রোহী নেতা হিসাবেই মনে করেছেন ঐতিহাসিকরা। কিন্তু নতুন একটি সিনেমা তৈরির ঘোষণা হওয়া মাত্রই উগ্র হিন্দুত্ববাদী ঐতিহাসিকদের একাংশ বলছেন মি. কুঞ্জাহামেদ বিদ্রোহী কখনই ছিলেন না, তিনি ছিলেন লুটেরা এবং হিন্দু হত্যাকারী এক ব্যক্তি।
প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, উত্তর কেরালার নানা অঞ্চলে ব্রিটিশ বিরোধী প্রচার চালাতেন মালায়ালাম, আরবী আর কিছুটা ইংরেজি শিক্ষিত কুঞ্জাহামেদ হাজী।
প্রচারের সময়ে তিনি ব্যবহার করতেন কেরালার নিজস্ব মার্শাল আর্টসের নানা কায়দা, পল্লীগান প্রভৃতি। সেভাবেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন প্রায় ৭৫ হাজার মানুষের এক বাহিনী।
১৯২০ সালের অগাস্টে একটি মসজিদে হামলার পরেই সেই বাহিনী নানা দিকে ব্রিটিশ থানা ও সরকারি দপ্তরে হামলা চালায়।
প্রায় একবছর ধরে সেই লড়াইয়ের পরে ১৯২১ সালের অগাস্টে ভারিয়ানকুন্নাথু কুঞ্জাহামেদ ব্রিটিশদের তাড়িয়ে দিয়ে গড়ে তোলেন তার নিজস্ব প্রশাসন। কিন্তু মাস ছয়েকের মধ্যে গ্রেপ্তার হন তিনি, আর গুলি করে মেরে ফেলা হয় তাকে।
এই ঐতিহাসিক চরিত্রকে নিয়েই আবারও একটি সিনেমা বানানোর কথা ঘোষণা করেছেন মালায়লাম সিনেমার খ্যাতনামা পরিচালক আশিক আবু। আর তারপরেই শুরু হয়েছে ওই ঐতিহাসিক চরিত্রকে কেন্দ্র করে বিতর্ক।
কিন্তু উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো আর ইতিহাসবিদদের একাংশ বলছেন, ভারিয়ানকুন্নাথু কুঞ্জাহামেদ আসলে একজন দস্যু ও লুটেরা ছিলেন। যিনি হাজার হাজার নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের জোর করে ধর্মান্তরিত করেছিলেন, নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন বহু মানুষকে।
ভারতের ইতিহাস গবেষণার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টোরিকাল রিসার্চ বা আইসিএইচআরের সদস্য অধ্যাপক সি আই আইজ্যাক বলছিলেন, “ভারিয়ানকুন্নাথু কুঞ্জাহামেদ একদিকে ছিলেন একজন ধর্মান্ধ, আর অন্যদিকে দস্যুদলের নেতা। ইসলাম ধর্মের অন্ধ অনুসারী ছিলেন তিনি। ১৯২১ সালের যে ঘটনার কথা বলা হয়, সেটা আদতে ছিল একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা।”
অথচ ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ইতিহাসের অধ্যাপক আব্দুর রেজ্জাক বলছেন, কে এন পানিক্কর থেকে শুরু করে বহু ইতিহাসবিদ মালাবার বিদ্রোহ নিয়ে গবেষণা করেছেন।
”কোনও বইতেই ওই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলা হয় নি। ইতিহাস বলছে ভারিয়ানকুন্নাথু কুঞ্জাহামেদ বরঞ্চ তার দলের সেই সব সদস্যদের কঠোর শাস্তি দিতেন, যারা লুটপাট চালাতো বা জোর করে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করত।”
তার ব্যাখ্যা, “আসলে ব্রিটিশ আর জমিদার শ্রেণী তার বাহিনীর কাছে নাস্তানাবুদ হয়েছিল, সেজন্যই তারা বিদ্রোহ হিসাবে না দেখিয়ে ১৯২১ এর ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলার চেষ্টা করেছে। আর এই প্রচেষ্টা এখন নয়, ওই সময় থেকেই চলে আসছে।
”আগামী বছর তো বিদ্রোহের শতবর্ষ, তাই সিনেমাটা যদি নাও হত, তাহলেও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো এই বিতর্ক তুলতই রাজনীতি করার জন্য। যেভাবে টিপু সুলতানকে নিয়ে বিতর্ক করেছিল, একই ভাবে ভারিয়ানকুন্নাথু কুঞ্জাহামেদ নিয়ে বিতর্ক তুলে দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজন করার চেষ্টা এটা,” বলছেন ইতিহাসের অধ্যাপক আব্দুর রেজ্জাক।
ভারিয়ানকুন্নাথু কুঞ্জাহামেদকে নিয়ে এই বিতর্ককে পরিচালক আশিক আবু অবশ্য খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাইছেন না। বলছিলেন, “এরকম বিতর্ক আর হুমকির মুখোমুখি আমাকে আগেও হতে হয়েছে। আর শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়, ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে যে কেউই নিজের মতামত স্পষ্ট করে বলতে গেলেই তাকে একই রকম হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে।”
আগামী বছর মালাবার বিদ্রোহের শতবর্ষ। তাই শুধু আশিক আবু নয়, আরও তিনজন পরিচালক ভারিয়ানকুন্নাথু কুঞ্জাহামেদ আর মালাবার বিদ্রোহ নিয়ে ছবি করার ঘোষণা করেছেন।
বিবিসি
















