হজ্ব ‘বন্ধ’: একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার আছে কি সৌদি আরবের

মুফতী আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ।।

মনের ভেতরের গভীর বেদনা থেকে এই লেখাটি লিখতে বসেছি। আরো আগেই লিখতে চেয়েছিলাম। সৌদি আরবে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে প্রথমে যখন ওমরা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তখনই মনে হয়েছিল কিছু কথা বলি। পরক্ষণেই মনে হয়েছে, কী হবে আমাদের বেদনার কথাগুলো বলে! নীরব থেকেছি। কিন্তু ক’দিন আগে যখন দেখলাম এবার হজ্বের আয়োজন প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ থেকেই কোনো হজ্বযাত্রী হজ্ব পালনের জন্য সৌদি আরবে যেতে পারবেন না, তখন এ বেদনা আর চাপিয়ে রাখতে পারিনি। অন্তরের বেদনা ও তাড়না থেকেই লিখতে বসেছি।

এবার যদিও হজ্বে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার কোনো প্রস্তুতি ছিল না, তবুও এটা অনুধাবনযোগ্য বিষয় যে, লাখো লাখো আল্লাহপ্রেমিক মুসলমান হজ্বে যাওয়ার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। একটি ভালো পরিস্থিতি হবে, সুন্দর সিদ্ধান্ত হবে এবং তারা হজ্বে যেতে পারবেন। আশায় আশায় তাদের দিন পার হচ্ছিল। তাদেরকে অপেক্ষায় রেখে সৌদি কর্তৃপক্ষও নানারকম আশ্বাসের বাণীও শুনিয়ে আসছিল। একবার বলা হচ্ছিল ১০ তারিখ সিদ্ধান্ত জানানো হবে। আরেকবার বলা হচ্ছিল ১৫ তারিখে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০ তারিখ সিদ্ধান্ত দিয়ে জানানো হলো, হজ্ব বন্ধ। সৌদি আরবের বাইরে থেকে কেউ হজ্বে অংশ নিতে পারবে না। আর সৌদি আরব থেকেও হজ্বে অংশ নিতে পারবেন হাতে গোনা অল্পকিছু মুসলমান। এ সিদ্ধান্তের খবর জানতে পেরে লাখো আল্লাহপ্রেমিক হজ্বযাত্রীর হৃদয় ভেঙ্গে গেছে। তারা প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন।

হ্জ্ব বন্ধের এ সিদ্ধান্ত জানানোর সময় গণমাধ্যমগুলো বলেছে, এবার ‘প্রতীকী হ্জ্ব’ পালন হবে। হজ্ব নিয়ে এসব সংকুচিত আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা দেখে মনে হচ্ছে, সৌদি সরকার একটা তামাশা শুরু করেছে। এরকম তামাশার চিত্র আগেও দেখা গেছে। হারাম শরীফে তাওয়াফ-যিয়ারাহ বন্ধ থাকার পর যখন সরকার খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিল, তখনও সাধারণ মুসলমানদেরকে হারামে নামায আদায় করতে দেওয়া হলো না। শুধু হারামের খাদেম-কর্মচারীদেরকেই হারামে প্রবেশ করতে দেওয়া হলো।ভাবখানা তাদের এমন ছিল যে, তওয়াফ-যিয়ারত, ওমরাহ, হারামে নামায আদায়- এই ইবাদতগুলোর প্রয়োজন যেন মানুষের নেই; মানুষ যেন ইবাদতের মুখাপেক্ষী নয়। বরং সৌদি প্রশাসনের আচরণের ভাষ্য ছিল এমন যে, মসজিদে হারামকে দেখানো হচ্ছে, কিছু মানুষ তার মাঝে তওয়াফ করছে। যেন প্রয়োজন হারামের, প্রয়োজন মানুষের নয়! যেন হারাম শরীফে কিছু মানুষের ইবাদত পাওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার দায় পড়ে গেছে! (নাউযুবিল্লাহ)

কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা হযরত ইবরাহীম আ. কে খেতাব করে ইরশাদ করেছেন:

.وأذن فى الناس بالحج يأتوك رجالا وعلى كل ضامر يأتين من كل فج عميق

অর্থ: এবং মানুষের মাঝে হজ্বের ঘোষণা করে দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রমকারী উটের পিছে সওয়ার হয়ে, যেগুলো (দীর্ঘ সফরের কারণে) রোগা হয়ে গেছে। [সূরা হজ্ব: (২২) : ২৭]

এরপর থেকেই হজ্বের জন্য মক্কা মুকাররমায় মানুষের আগমন অব্যাহত ছিল। হঠাৎ কখনো বিশেষ বড় কোনো প্রতিবন্ধকতার জন্য স্থগিত হলেও কোনো মুসলিম শাসক এভাবে হুকুম দিয়ে মানুষের গমন বন্ধ করার নজির নেই। এবার যখন তারা হজ্বে যোগ না দেওয়ার এমন একটি সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলেন, দুনিয়ার নানা প্রান্তে বসবাসরত হজ্ব-গমনেচ্ছু মানুষ হৃদয়ে আঘাত পেয়েছেন। শাশ্বত ধারা ও নীতিকেই থামিয়ে দেওয়ার নজির স্থাপিত হলো। সাম্প্রতিক সৌদি আরবে এজাতীয় বেদনার প্রেক্ষাপট কি হঠাৎ এসেছে, না এরও কোনো পটভূমি রয়েছে? একটু পেছনে ফিরে দেখা যেতে পারে।

সৌদি শাসনের অতীত-বর্তমান

কিতাবের তাকে এনে রাখা সৌদি আরবের ইতিহাস বিষয়ে ১৫ খণ্ডের একটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ নামিয়ে গত কয়েকদিন উল্টে দেখেছি। গ্রন্থটির নাম المملكة العربية السعودية في مائة عام

১৫ খণ্ডের এই কিতাবটির মোট পৃষ্ঠা-সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি। মূলত বাদশাহ আবদুল আযীয ১৯০২ সালে রিয়াদ দখল করার শত বছর পূর্তিতে গ্রন্থটি প্রকাশ করা হয়েছে। এর প্রথম খণ্ডেই (গ্রন্থ প্রকাশকালীন) রিয়াদের গভর্নর সালমান ইবনে আবদুল আযীযের একটি ভূমিকামূলক আলোচনা রয়েছে। তিনি তখন রিয়াদের গভর্নর এবং সৌদি আরব শত বর্ষপূর্তির আয়োজনের চেয়ারম্যান। তার আলোচনায় তিনি খুব স্পষ্ট করে বলেছেন, সৌদি আরবের দেশ পরিচালনা ও শাসনতন্ত্রের ভিত্তি হলো কুরআনে কারীম। তার ওই বক্তব্যে ফুটে উঠেছে, সৌদি রাষ্ট্রটির বুনিয়াদ ইসলাম ও কুরআনের ওপর।

তার ভূমিকামূলক লেখাটি ছাড়াও প্রথম খণ্ডে উপস্থাপিত দীর্ঘ সূচিপত্রে বর্ণিত বিভিন্ন রচনার শিরোনামেও সৌদি রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি ও বন্ধনকে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর চেষ্টা চোখে পড়েছে। রিয়াদের সেই গভর্নর সালমানই এখন সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান। অথচ তিনি আর তার ছেলে এমবিএস (মুহাম্মদ বিন সালমান) মিলে এখন তাদের বর্ণিত সেই সৌদি আরবকেই কোথায় থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন! আধুনিকতা আনয়নের নামে সৌদি আরবের দ্বীনী বৈশিষ্ট্যের উজ্জ্বলতাকে কীভাবে তারা ম্লান করে দিচ্ছেন!

বিভিন্ন দেশের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে বা যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করে বিজাতি সুপার পাওয়ার রাষ্ট্রের সৈন্যবাহিনীকে তো আগেই অনেকটা স্থায়ী জায়গা করে দেয়া হয়েছে সৌদি আরবে। তার সাথে এখন ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং তাহযীব ও তামাদ্দুনেরও সর্বনাশ ঘটানো হচ্ছে।

প্রসঙ্গত এখানে এ বিষয়টি উল্লেখ করা দরকার যে, সৌদি আরবের উত্থান বা জাযীরাতুল আরবের উত্থান অথবা অন্যশব্দে বললে, জাযীরাতুল আরবে সৌদি শাসকদের দখল ও বিজয়ের পর্বটিকে সমগ্র দুনিয়ার মুসলিম মনীষীরা দুঃখ ও বেদনা নিয়েই পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম মনীষীরা গভীর মর্মবেদনা অনুভব করেছিলেন এজন্য যে, বর্তমান সৌদি শাসকদের পূর্ব-পুরুষেরা উসমানী সালতানাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিদ্রোহ করে, বৃটিশ শক্তির সঙ্গে আঁতাত করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। আর এদিকে ভারতীয় উপমহাদেশের আলেম নেতৃত্ব ও মুসলিম মনীষীরা বৃটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছিলেন। তারা চাচ্ছিলেন, তুরস্ক ভিত্তিক ইসলামী খেলাফত টিকে থাকুক। সেসময় খেলাফতের প্রতিনিধিদের সরিয়ে সৌদি আরব প্রতিষ্ঠাতাদের ক্ষমতা দখলের ঘটনাটিকে ভালো চোখে দেখার সুযোগ ছিল না। এসব কারণে সৌদি আরবের প্রতি মুসলিম বিশ্বের মনীষীদের ধারণা ও মূল্যায়ন বহাল ছিল।

কিন্তু এরপর যখন ধীরে ধীরে তাদের শাসনব্যবস্থা ও দেশপরিচালনায় ইসলামী বিধানের অনুসরণ দেখা গেল, ইনসাফের নীতির চর্চা শুরু হল এবং প্রকাশ্যে শরীয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড চলতে দেয়া হল না, যদিও তাদের নীতিতে অনেক কঠোরতা ও প্রান্তিকতার মিশ্রণ ছিল- তবুও প্রকাশ্যে গুনাহের কাজ করতে না দেওয়া, শরীয়া নীতি অনুসরণ করা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রপরিচালনার ধারা দেখে মুসলিম বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও জনসাধারণ সৌদি শাসকদের প্রতি ধীরে ধীরে কোমলতা অবলম্বন করেছেন। সমর্থন ও সহযোগিতার মনোভাব পোষণ করেছেন। কিন্তু চলতি শতাব্দীতে এসে এ কোমল মনোভাবে আবার ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে। সৌদি আরবের শাসকদের প্রতি মুসলিম দেশে দেশে বিরূপ ধারণা নতুন করে তৈরি হচ্ছে।

বাদশাহ আবদুল্লাহর পর সালমান ইবনে আবদুল আযীয যখন সৌদি আরবের মসনদে বসলেন, এরপর থেকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ঘটনা ঘটতে দেখা গেল। প্রথমে যুবরাজ বা বাদশাহ পরবর্তী উত্তরাধিকারী বানানো হলো বাদশাহর এক ভাতিজাকে। পরবর্তী সময়ে দেখা গেল, ওই যুবককে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় বসানো হলো বাদশাহর ছেলেকে। এরপর থেকেই জাগতিক বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি সৌদি আরবে অনুসৃত শরীয়া বিধি ও নীতিকে রাতারাতি পাল্টে দেওয়ার নানা রকম উদ্যোগ শুরু হলো। প্রকাশ্য গুনাহের আয়োজনে রাষ্ট্রীয় মদদ যু্ক্ত হলো। শুরু হলো সৌদি আরবের দ্বীনী সংস্কৃতি ও জীবনাচারে পাশ্চাত্যায়নের খোলামেলা মহড়া। বড় শহরে ইউরোপীয় ধাঁচে প্রতিষ্ঠা করা হলো সহশিক্ষার পরিবেশপুষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়। সে বিশ্ববিদ্যালয় সফরের সুযোগ হয়েছে আমার। সে যেন পুরোপুরি পশ্চিমা সংস্কৃতির একটি অঙ্গন সৌদি আরবের বুকে!

এই বাদশাহ ও তার পুত্রের এসব কর্মকাণ্ড দেখে অনুমান করা যাচ্ছিল, সৌদি আরবের দ্বীনী সংস্কৃতি ও প্রাধান্য ব্যাপকভাবে বদলে যেতে পারে। আশংকা করা হচ্ছিল, ওই পবিত্র ভূমি থেকে রূহানিয়াতপূর্ণ পরিবেশ ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকবে। সেটারই প্রকাশ এখন ঘটছে।

কোভিড-১৯ যখন এল, সৌদি আরবের অবস্থা এমন দাঁড়ালো, যারা ইমান-আকীদার ‘সবক’ অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোতে দেওয়ার চেষ্টায় রত, তারাই عدوى বা ছোঁয়াচে রোগের ধারণায় সবচেয়ে বেশি হাবুডুবু খেতে লাগলো। যে সৌদি আরবের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পড়াশোনা করে আসা ব্যক্তিরা বিভিন্ন দেশে শিরক ও বিদআর বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ-ভূমিকা পালন করতে গিয়ে নানারকম কঠোর কথাবার্তা বলে থাকেন, বাড়াবাড়ি করে থাকেন, সেই সৌদি আরবের শাসকদের মধ্যেই ছোঁয়াচে রোগের ভীতি প্রকট হয়ে উঠলো।

এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সবার আগে কঠোর লকডাউনের ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করলো সৌদি আরব এবং তা অব্যাহত রাখল গত মাসের শেষ পর্যন্ত। তারপরও কিন্তু জনসংখ্যার অনুপাতে সেখানে কোভিড-১৯ আক্রান্তের হার বেশি। আক্রান্তের সংখ্যা সোয়া লক্ষ পার হয়ে গেছে এরই মধ্যে। তাহলে এই কঠোর লকডাউন এবং এভাবে ওমরা, তওয়াফ-যিয়ারাহ সব বন্ধ করে দেওয়ায় কী লাভ হলো? আসলে এর প্রধান কারণ হচ্ছে ভীতির আধিক্য। একজন বড় আলেম এ প্রসঙ্গে বলছিলেন, মুসলমান যখন আকীদা-বিশ্বাস ও দ্বীন থেকে দূরে সরে যায়, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রক্ষা করার অনুভূতি ও অবস্থান থেকে দূরে সরে যায় তখন তার অন্তরে ভীতি বাসা বাঁধে। কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসের এই সময়ে তাদের এতসব কঠোরতা ও ইবাদতবিমুখ-ব্যবস্থাপনার পেছনে এজাতীয় ভীতির ভূমিকাই বড়।

হজ্ব: স্বেচ্ছাচারের অধিকার কি আছে?

এই যে দ্বীন এবং দ্বীনী চেতনা-বিশ্বাস ও অবস্থান থেকে সৌদি শাসকদের এত দূরে সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে এবং ঘটেছে, এরপর তাদের ‘খাদেমুল হারামাইন আশশরীফাইন’ পরিচিতি বহন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সৌদি আরব নামক একটি রাষ্ট্র তারা শাসন করছেন, এটুকু চাইলে তারা করুন। তাদের এই শাসন-নিয়ন্ত্রণ আইনি ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বৈধ না অবৈধ, সেটা ভিন্ন তর্ক। সে তর্কের মীমাংসার জন্য স্বতন্ত্র আলোচনার প্রয়োজন। কিন্তু হারামাইন শরীফাইনের ব্যবস্থাপনায় তাদের এই ভীতিকাতরতা ও দুর্বলচিত্ততা এ প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছে যে, হারামাইনের খাদেম হওয়ার যোগ্যতা তাদের আছে কিনা, এ পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার অধিকার তাদের আছে কিনা।

হৃদয়ের আক্ষেপ আর আত্মিক তাড়না থেকেই আমরা কথাগুলো বলছি। কারণ, অসংখ্য মুসলমানের অন্তরে এই কষ্ট ও বেদনাটা আছে। হারামাইন বন্ধ করে রাখা, হ্জ্ব বন্ধ করে রাখায় লাখ লাখ মুসলিমের প্রাণ কাঁদছে। হয়তো তারা তাদের মনের বেদনাভরা কথাগুলো বলার সুযোগ পাচ্ছেন না। লাখ লাখ মানুষ অপেক্ষায় ছিলেন। হারামাইনে হাজির হবেন। বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করবেন। সেখানে নামায আদায় করবেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র মসজিদ ও রওজায়ে আতহার যিয়ারত করবেন। আল্লাহ তাআলার কাছে এই দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্য দুআ করবেন। আল্লাহর প্রেমিকদের দুআয় আল্লাহ তাআলা দুনিয়াবাসীর প্রতি দয়া করবেন। কিন্তু তা সম্ভব হলো  না, কারণ ওমরাহ তওয়াফ বন্ধ করে রাখা হলো। এখন হ্জ্ব পালনেও নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেওয়া হলো!

যেদিন ওমরা আদায়ের উপর নিষেধাজ্ঞা এল সেদিন আমার ঘনিষ্ট মানুষদের একটি পরিবার সব প্রস্তুতি নিয়েও শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় আর ওমরায় যেতে পারেননি। তাদের হৃদয়ে এখনো কান্না। শাসক হিসেবে, খাদেমুল হারামাইন হিসেবে এই ধরনের অধিকার সৌদি আরবের শাসকরা রাখেন না।

আরো পড়ুন: এবার হজ্ব ‘নিষিদ্ধ’ না করে বিকল্প যা করতে পারত সৌদি আরব

সৌদি আরবের প্রশাসন চাইলে নিজ দেশে এবং সৌদি আরবের বিমানবন্দরে পরীক্ষা করে কোভিড-১৯ নেগেটিভ ব্যক্তিদের জন্য ওমরা করার সুযোগ খোলা রাখতে পারত। এমনকি ওই দেশে বসবাসরত বহু মুত্তাকী, আল্লাহওয়ালা মুসলমান আছেন, যারা  নফল ইবাদত ও দান-খয়রাতে নিমগ্ন থাকেন তাদের জন্য হারামের দরজা খুলে রাখতে পারত। হারাম বন্ধ থাকায় সেখানে বসবাসরত বহু মানুষের অন্তরে ও চোখে কান্না। এসব নেককার মানুষ হারামে প্রবেশ করতে পারলে সেখানে গভীর অনুতাপ ও অন্তরের বিগলন নিয়ে ইবাদত করতেন, দুআ করতেন। কিন্তু সৌদি আরবের প্রশাসন এককভাবে সবকিছু বন্ধ করে দিল এবং বন্ধ করে রাখল।

পবিত্র সব স্থান বন্ধ করে রাখার পাশাপাশি সৌদি প্রশাসন আরেকটি উদ্ভট কাজ করছে এবং গণমাধ্যমে প্রচার করছে। সেদিন পরপর দেখানো হচ্ছে, হারাম শরীফ জীবাণুমুক্ত করা হচ্ছে। তাদের আচরণে মনে হচ্ছে, কত কত জীবাণু যেন সেখানে গিজগিজ করছে! পবিত্র হারাম সম্পর্কে একটা ভুল চিত্র ও অনুভূতি এতে তৈরি করা হচ্ছে।

আচ্ছা, একটু ভেবে দেখুন তো, স্বাভাবিক সময়ে ওমরা ও হজ্বে কত লাখ লাখ লোক সেখানে হাজির হন? সমবেত হওয়া সব মানুষ কি সুস্থ থাকেন? ওমরা এবং হজ্ব উপলক্ষে হারামে সমবেত মানুষের মাঝে বহু জন কি অসুস্থ থাকেন না? চিকিৎসাবিদ্যার পরিভাষায় যেসব রোগ-ব্যধিকে ‘ছোঁয়াচ’  বলা হয়, এমন রোগ-ব্যধি নিয়েও কি মানুষ হ্জ্ব-ওমরা করতে হারামে হাজির হন না? নিজের দেশ থেকে নামকাওয়াস্তে একটা টিকা নিয়ে হারামে হাজির হয়ে যান লাখো লাখো মানুষ। এর মধ্যে বহু মানুষই বিভিন্ন ‘ছোঁয়াচে’ রোগেও আক্রান্ত থাকেন। কিন্তু এমন কি হয়েছে যে, ওইসব রোগীদের সংস্পর্শে এসে হাজার হাজার সুস্থ মানুষ নিজ দেশে এসে অসুস্থ হয়ে গেছেন? এমন কোনো রিপোর্ট ও পরিসংখ্যান নেই। আসলে হারামের বরকতে আল্লাহ তাআলা অনেককেই হেদায়াত করে থাকেন। কিন্তু সৌদি আরবের সরকার এসব কিছুর বিবেচনা না করে ওমরা, তওয়াফ, যিয়ারাহ এবং হজ্ব বন্ধ করে দেওয়ার মধ্যেই সমাধান খুঁজে পেল। এ এক আশ্চর্যজনক বিষয়! সবচেয়ে বেশি কষ্টদায়ক ঘটনা হলো হজ্ব ‘বন্ধ’ করে দেওয়া। বাইরের কোনো দেশ থেকে কেউ এবার হজ্বে যেতে পারবেন না- এমন সিদ্ধান্ত তারা হঠাৎ করেই চাপিয়ে দিলেন।

হারামাইন বিশ্ব মুসলিমের মর্যাদাপূর্ণ সম্পদ। মুসলমানদের কোনো খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হলে হারামাইন তাদের ব্যবস্থাপনার আওতায় যেতে পারে, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকা বা ভূখণ্ডকে যেসব রাজা-বাদশাহরা নিয়ন্ত্রণ করবে, হারামাইন তাদের একক নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে না। রাজা-বাদশাহরা তাদের মনমতো হারামাইনের ব্যবস্থাপনা আঞ্জাম দিবে। ইচ্ছে হলে মানুষকে প্রবেশ করতে দিবে, ইচ্ছে হলে আটকে দিবে- শরীয়তের দৃষ্টিতে ও নৈতিকভাবে এই সুযোগ তাদের নেই।

তাই আমরা বলতে চাই, হারামাইন শরীফাইনের ব্যবস্থাপনায় সৌদি সরকারের উচিত স্বেচ্ছাচারিতামূলক একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা এবং সতর্ক হওয়া। তাদের কোনো পদক্ষেপে যেন বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে আঘাত না লাগে- এ ব্যাপারে তাদের পূর্ণ সতর্কতা ও সচেতনতা বজায় রাখতে হবে।

(এ বছর হজ্বকে ‘প্রায় নিষিদ্ধ’ না করে সৌদি সরকার কী কী বিকল্প পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারত, এ প্রসঙ্গে সামনের লেখায় আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।)

পূর্ববর্তি সংবাদমাস্ক-পিপিই দুর্নীতি: জেএমআই এমডিকে জিজ্ঞাসাবাদ দুদকের
পরবর্তি সংবাদতুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইট গেঁথে রাস্তা বন্ধ, ১২ দিন ধরে অবরুদ্ধ ৬ পরিবার