ইসলাম টাইমস ডেস্ক: গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাঝে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা হয় এবং ইসরাইল পশ্চিম তীরে তাদের কিছু পদক্ষেপ মুলতবি করে।
ইতিপূর্বে ইসরাইলের সাথে কোনো আরব রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিলো না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তির ঘোষণা প্রদান করেন। সূত্রমতে, এই চুক্তিতে ফিলিস্তিনের নেতৃবৃন্দ বড় হতাশ হয়েছেন। আরব নিউজের সংবাদ অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আরব লীগকে এই বিষয়ে বৈঠকের আহ্বান জানান। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই চুক্তির কারনে ইসরাইলের সাথে অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক জোরদার হবে। আর আরবদের শান্তি চুক্তিতে এর প্রভাব পড়বে।
তার এই হতাশা যথাযোগ্য। কেননা, আমিরাতের এই সিদ্ধান্তে অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়া সন্তোষজনক নয়। মিশর ও জর্ডান ইতিমধ্যে আরব আমিরাতকে সাধুবাদ জানিয়েছে। এই প্রদক্ষেপ উপসাগরীয় অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য সহ আরো অনেক দেশের পারস্পরিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে। তন্মধ্যে ভারত উল্লেখযোগ্য।
আরব দেশগুলোতে এর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইসরাইলে অবস্থানরত সিনিয়র সাংবাদিক হরিন্দর মিশরা বলেন, বর্তমানে মুসলিম দেশগুলো তিন ভাগে বিভক্ত: কিছু দেশ ইরান কেন্দ্রিক। এরা সবাই ইসরাইলের বিষয়ে শক্ত অবস্থানে। আরেক দল সৌদি আরব ও আরব আমিরাত কেন্দ্রিক। আরেক ভাগ হলো, তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তান। এই চুক্তির কারনে সামগ্রিকভাবে মুসলিম দেশগুলোর বিভক্তি আরো বাড়বে। আরব দেশগুলোর সাথে ইরানের শত্রুতা ধর্মকেন্দ্রিক। ইরান শিয়া মতবাদ লালন করে আর আরবরা সুন্নী মতবাদ।
ইসরাইল ও আমিরাতের চুক্তির যে প্রভাব ভারতের ওপর পড়বে
টাইমস অফ ইন্ডিয়ার সম্পাদক ইন্দ্রানী বাগচির মতে, ‘ইসরাইল ও আমিরাতের সাথে ভারতের সম্পর্ক ভালো। মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়ে ভারত ও ইসরাইলের মতৈক্য রেয়েছে। আরব আমিরাত এক উদীয়মান শক্তি। তাই এই দুই দেশ চুক্তিবদ্ধ হলে ভারত তাদেরকে সাধুবাদ জানানোই স্বাভাবিক। এই দুই দেশ এক হলে অপরদিকে আরব-পাকিস্তান সম্পর্কচ্ছেদ ঘটার আশঙ্কা নেই তো? এই বিষয়ে ইন্দ্রানী বলেন, এটা অনস্বীকার্য যে, ইসলামি দেশগুলোর ওপর বরাবর পাকিস্তানের প্রভাব রয়েছে। পাকিস্তান একমাত্র ইসলামি দেশ যাদের আছে পারমাণবিক শক্তি। তাই অপরাপর ইসলামি দেশগুলো পাকিস্তানকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করে। তবুও আজ পাকিস্তান কিছুটা একা হয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী তাদের নিজেদের বিভিন্ন পলিসি।
হরিন্দর মিশরা বলেন, এযাবত পাকিস্তান-আমিরাতকে একজোট মনে করা হতো। কিন্তু কিছুকাল ধরে আমিরাতের সাথে ভারতের সম্পর্ক পাকিস্তানের চেয়ে ভালো। উদাহরণ স্বরূপ তিনি গত বছরের ও আই সি সম্মেলনের কথা উল্লেখ করেন। যেখানে পাকিস্তানের না চাওয়া সত্ত্বেও ভারতকে বিশেষ পরিদর্শক হিসেবে আহ্বান করা হয়েছিলো। পাকিস্তান এই আহ্বানের বিরোধিতা করলেও আরব আমিরাত তাতে কর্ণপাত করেনি। সুদীর্ঘ পাঁচ দশক পর এই প্রথম ভারতকে এ সম্মেলনে আহ্বান করা হলো। শুধু তাই নয়, এই বছর ও আই সি সম্মেলনে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে ইসলামোফোবিয়ার দাবি তুললে সেটা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় মালদ্বীপ ভারতের পক্ষে অবস্থান নেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ওআইসির কাছে কাশ্মীরের ৩৭১ ধারা বাতিল নিয়ে প্রশ্ন তুললে সৌদি আরব স্পষ্ট বলে দিয়েছে, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। পাকিস্তানের এই শক্ত অবস্থানের কারণে সৌদি সরকার পাকিস্তানকে ঋণ দেওয়া এক বিলিয়ন ডলার ফেরত চেয়েছে। যা ২০১৮ সালে পাকিস্তান নিয়েছিলো।
২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদিকে আমিরাত সর্বোচ্চ রাস্ট্রীয় সম্মাননা দিয়েছিলো। এসকল কর্মকাণ্ড থেকে বোঝা যায়, সৌদি-আমিরাতের সাথে ভারতের সম্পর্ক বেশ ভালো। এবার ইসরাইল এদের সাথে যুক্ত হলে নিঃসন্দেহে ভারতও এসব মুসলিম দেশের সাথে হাত মিলাবে। অন্যান্য উপসাগরীয় অঞ্চল, যারা এই চুক্তির পক্ষ নিবে তাদের সাথেও ভারতের সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে। ফলে পাকিস্তান কোণঠাসা হয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়, সমগ্র বিশ্ব এখন ঐকিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে। এই সুযোগে সৌদি, আমিরাত, ভারত মিলে একটি শক্তিশালী ঐক্য তৈরী হবে।
হরিন্দর মিশরা এই চুক্তির বড় আরেকটি প্রভাব দেখছেন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরীতে ভারত-ইসরাইলের মাঝে বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উপসাগরীয় অঞ্চলগুলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উল্লেখযোগ্য বাজার। তাই ইসরাইল-ভারতের তৈরী করা প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের চাহিদা ব্যাপক হবে। ইতিমধ্যে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ‘স্বনির্ভর ভারত’ এই স্লোগান যুক্ত করা হয়েছে।
আরব আমিরাতের পর সৌদির পালা
সৌদি ও আমিরাতের সম্পর্ক ভালো। তাই অনেকের মতে সৌদিও আমিরাতের পথেই হাঁটবে। কিন্তু ইন্দ্রাণীর মতে, সৌদি আরব আমিরাতের মতো খোলাখুলি ইসরাইলের সাথে হাত মিলাবে না। তার কারণ হিসাবে তিনি বলেন, ধর্মীয় দিক থেকে সৌদি হলো মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রবিন্দু। তাই অতীতের অনেক বিষয়ের কারণে সৌদি খোলাখুলি ইসরাইলের সাথে মিলতে পারবে না। যদিও রাজনৈতিকভাবে ইসরাইলের সাথে সৌদির ঘনিষ্ঠতা অনেক বছরের। তিনি আরো বলেন, ভারত-ইসরাইল এয়ারলাইনস স্থাপনের জন্য সৌদি আরব ইতিমধ্যে তাদের আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে দিয়েছে। এর থেকেই বোঝা যায় সৌদি-ইসরাইল ঘনিষ্ঠতা।
কিন্তু হরিন্দর মিশরা ভিন্ন মত ব্যক্ত করে বলেন, প্রবাদ আছে, বন্ধুর বন্ধুও বন্ধু হয় আর শত্রুর শত্রুও বন্ধু হয়। ইরান ইসরাইল-সৌদি দুই দেশেরই শত্রু। সেই সুবাদে ইসরাইল-সৌদি সম্পর্ক ভবিষ্যতেও ঘনিষ্ঠ থাকবে। বৃহস্পতিবার সৌদি সরকারের সংবাদ সম্মেলনেও সেদিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চুক্তির পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট মিডিয়াকে বলেন, ‘এখন যেহেতু বরফ গলেই গেছে তাই আমি আশাবাদী যে, অন্যান্য আরব দেশগুলোও আমিরাতের অনুসরণ করবে।’
সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক
মূলতঃ ইসরাইল প্রধান নেতানিয়াহু নিজেই চান সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হোক। সম্প্রতি তার ঘুষ খাওয়া, প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা ও করোনা মোকাবেলায় ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করে তার পদত্যাগের দাবীতে দেশজুড়ে আন্দোলন চলছে। এহেন পরিস্থিতিতে তিনি চাচ্ছেন, যত বেশী বহিঃশক্তির সমর্থন তিনি পাবেন ততই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং ফিলিস্তিনের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়ার সুযোগ তৈরী হবে।
এছাড়াও, সৌদি-ইসরাইল দুই দেশেরই প্রধান শত্রু ইরান। সেই সুবাদে দুই দেশকেই পারস্পরিক সহযোগিতামূলক অনেক পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে। আমেরিকার মিত্র হওয়ায় ইসরাইলকে ইরান সর্বদা টার্গেটে রাখে। এবার আমিরাত-ইসরাইল চুক্তির কারণে ইরান-ইসরাইল অস্থিরতা আরো বেড়ে যাবে। ইসরাইলের সেনাপ্রধানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের বিভিন্ন বক্তব্যে এই বিষয়টি ফুটে উঠেছে যে, এই চুক্তিতে দুই দেশেরই লাভ-‘মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের ঘোরতর শত্রু ইরান। আমরা একসাথে ইরানকে ঘায়েল করতে সক্ষম হবো।’ দুই দেশ ইতিমধ্যে ইরান বিষয়ক গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান শুরু করেছে। ইসরাইল এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিবিসি উর্দু অবলম্বনে নূরুদ্দীন আজিম
















