অসহায় মূর্তির পরিণতি দেখে ইসলামগ্রহণ

মাওলানা শাহাদাত সাকিব ।।

মদীনার ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়েছে ধীরে ধীরে। মূর্তিপূজার অন্ধকার কেটে গেছে অনেকটাই। শিশিরস্নাত ভোরের মতো পবিত্র হয়ে উঠছে সবাই। তবে কেউ কেউ এখনো রয়ে গেছে অজ্ঞতার আঁধারে। এখনো মূর্তির উপাসনা করছে অন্ধের মতোন। আমর ইবনে জামূহ ছিল এমনই একজন।

নিজ গোত্রে গুণীলোক হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। তাই তার ঘরে ছিল ‘মানাত’ নামের স্পেশাল একটা কাঠের মূর্তি। এটা ছিল সর্দার শ্রেণির লোকদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তারা জাহেলি যুগে ঘরের ভেতর আলাদা মূর্তি রাখতো।

বনী সালামার বেশ কয়েকজন যুবক তখন ইসলাম গ্রহণ করেছে। মুয়ায ইবনে জাবাল ছিলেন তাদের অন্যতম। আমরের ছেলেও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ছেলের সাথে মিলে এলাকার মুসলিম যুবকেরা আঁটল এক ফন্দি। আমরের ‘প্রভুকে’ একটা শিক্ষা দিতে হবে। কাজটা সারতেও হবে রাতের আঁধারে।

গভীর রাত। সবাই ঘুমে। কিন্তু কয়েকটি চোখে ঘুম নেই। অপেক্ষার প্রহর গুনছে। আমর হারিয়ে গেছে স্বপ্নের জগতে। সুযোগ বুঝে তারা ঢুকলো আমরের ঘরে। যেখানে মূর্তি ছিল চুপিচুপি সেখানে গেল। আমরের মূর্তি নিয়ে তারা উধাও।

সকাল হয়েছে। ভোরের আলোয় ঘুম ভেঙেছে আমরের। প্রভুর মুখ দেখে দিন শুরু করার জন্য আমর গেল তার মূর্তির ঘরে। সেখানে গিয়েই তার চোখ তো ছানাবড়া! একী! ঘর যে একদম খালি! প্রভু নেই। আমর চিৎকার করা শুরু করল, সর্বনাশ হোক! তারা আমার প্রভুকে চুরি করে নিয়ে গেছে। এরপর সে বের হলো হারানো প্রভুর (!) খোঁজে। একটু দূরেই ছিল বনী সালামার ময়লা ফেলার স্থান। নানান আবর্জনার স্তুপ জমে আছে সেখানে। আমরের সৌভাগ্য এবং দুর্ভাগ্য (!) যে, সেখানেই সে তার উপাস্যকে খুঁজে পেল। উপুড় হয়ে পড়ে আছে বেচারা মূর্তি।

হায় হায়! কে করেছে এমন কাজ? যদি বজ্জাতটাকে হাতে পেতাম ওর খবর করে ছাড়তাম। আমর তার ‘প্রভুকে’ আদর করে কোলে তুলে ঘরে ফিরে এল। ধুয়ে মুছে আবার বসাল প্রভুর আসনে।

যুবকেরা দূর থেকে সবকিছু দেখছিল আর মুখ টিপে টিপে হাসছিল।

সেদিন রাত হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছে আমর। আজও তারা বের হলো একই উদ্দেশ্যে। আমরের প্রভুকে তুলে নিয়ে ফেলল ডাস্টবিনে। পরের দিনেও ঘুম থেকে উঠে আমরের চক্ষু চড়কগাছ! আজও প্র্রভু হারিয়ে গেছে। তবে আজ তাকে খুঁজে পেতে খুব একটা কষ্ট হলো না। কোথায় থাকতে পারে একটা ধারণা আগেরদিন হয়ে গেছে তার।

পরপর কয়েকদিন ঘটল একই ঘটনা। রাত হলে বেচারার প্রভু হারিয়ে যায় আর দিন হলে ডাস্টবিনে তার সন্ধান পাওয়া যায়। প্রতিদিন এভাবে খুঁজতে খুঁজতে আমরও বিরক্ত হয়ে গেল একদিন। রাগ করে মূর্তির গলায় একটা তরবারি ঝুলিয়ে দিয়ে বলল, প্রতিদিনই দেখছি তোর সাথে কী সব কাণ্ড ঘটছে। আজ তোর গলায় ঝুলিয়ে দিলাম তরবারি। যদি পারিস (!) এটা দিয়ে নিজেই নিজেকে রক্ষা করিস।

তরবারি পেয়েও শেষ রক্ষা হল না। আবারও ‘মানাত’ হারিয়ে গেছে। সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন ‘উপসর্গ’-তরবারির পরিবর্তে ঝুলে আছে একটা ‘কুকুর ছানা’। এ যেন মরার ওপরে খাঁড়ার ঘা! মরা পঁচা একটা কুকুর রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে বেচারা মূর্তির গলায়।

সকাল বেলা হারানো ভগবানকে খুঁজতে আমর ছুটে গেল বনী সালামার ডাস্টবিনে। নিজ প্রভুর এ করুণ দৈন্যদশা দেখে আমরের বিবেক জেগে উঠল। ধাক্কা দিতে লাগল মনের বদ্ধ দুয়ারে। হায়! এ কাকে আমি এতদিন প্রভু বানিয়ে রেখেছি? কার উপাসনা করেছি এতদিন! সে তো নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। আমাকে ক্ষমা-দয়া-অনুগ্রহ করবে কী করে?

বিবেকের আঘাতে খুলে গেল আমরের মনের দুয়ার। সেখানে ঝিরঝির করে বইতে শুরু করল ইসলামের শীতল বাতাস। আমর গোত্রের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের কাছে এল এবং ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হলো।

এমএসআই