আলেমদের তাচ্ছিল্য: ‘ভেতরে থাকা ইসলাম বিদ্বেষেরই বহিঃপ্রকাশ’

নুরুদ্দীন তাসলিম।।

কুরআনের স্পষ্ট ভাষ্যমতে আলেমগণ নবীদের ওয়ারিস। কুরআনের বাণীর অনুসরণে শত প্রতিকূল পরিবেশেও আলেমরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন, আপামর জনতার কাছে পৌঁছে দেন ইসলামের সঠিক বার্তা। মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছাতে গিয়ে সব যুগেই বাধা-বিপত্তি আর কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে ওরাসাতুল আম্বিয়া আলেমদের।

সম্প্রতি বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে মনে হয়েছে দেশের আলেম সমাজ যেন পার করছেন বাধা-বিপত্তি আর প্রতিকূলতার এক সন্ধিক্ষণ। স্বাধীনতার ৫০ বছরে কুরআনের স্পষ্ট বিধান জানাতে গিয়ে অত্যাচার, জেল-জুলুমের হুমকির মুখোমুখি হওয়া এদেশের আলেম সমাজের জন্য নতুন কিছু নয়। তবে বর্তমানে ৯৫% ভাগ মুসলমানের দেশে শুধুমাত্র কুরআনের বিধান জানানোর কারণে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন দায়িত্বশীল ও ইসলাম বিদ্বেষী কথিত প্রগতিশীল মহল যেভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে আলেম সমাজকে নিয়ে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে তা যেন এক অবিশ্বাস্য চিত্র।

‘‘অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় মিডিয়ায় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে আলেম-উলামা, ইসলামি রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় নেতারা।’’

বর্তমানে দেশের আলেম সমাজ যে অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় একটি ক্রান্তিকাল পার করছেন তার চিত্র এভাবেই নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তুলে ধরেছেন ইসলামী সাংবাদিক মুফতি এনায়েতুল্লাহ।

কুরআনের বিধান ও ইসলাম সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় মানুষকে জানানোর কারণে আলেম সমাজকে নিয়ে বাম এবং কথিত প্রগতিশীলদের এই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ বলছেন, মস্তিষ্কের বিকৃতি ও হৃদয়ের বক্রতার কারণেই আলেম-সমাজকে নিয়ে বামদের এই জ্বালাপোড়া।

তিনি বলছেন, যখন কেউ সৎ সঙ্গ পায় না এবং ক্ষমতার লোভ কাউকে পেয়ে বসে তখন তাদের মস্তিষ্কের বিকৃতি ও হৃদয়ের বক্রতা থেকেই এসব উদ্ভট আচরণ প্রকাশ পায়।

তিনি কুরআনের সূরা আনআমের ১২৫ নম্বর আয়াত- (وَمَن يُرِدْ أَن يُضِلَّهُۥ يَجْعَلْ صَدْرَهُۥ ضَيِّقًا حَرَجًا …-আল্লাহ তায়ালা যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ… )  উল্লেখ করে বলছেন, এজাতীয় মানুষেরা হৃদয়ের বক্রতার কারণে ইসলাম এবং ইসলাম সংশিষ্ট বিষয় মানতে পারেন না। মানুষের জন্য আকাশে বিচরণ করা যেমন কঠিন এই লোকদের জন্যও হেদায়েতের বাণী গ্রহণ করা কঠিন।

এদের অধিকাংশই হয়তোবা হারাম উপার্জন, দুর্নীতি ও মানুষের অধিকার হরণে লিপ্ত বলছেন ইসলামী রাজনীতিবিদ অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ।

অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছের ভাষায়, ইসলাম নিয়ে এক শ্রেণীর মানুষের গাত্রোদাহ আজকে নতুন কোন বিষয় নয়, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ থেকে ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে ইসলাম বিদ্বেষীদের এমন কারসাজি দেখে এসেছে পৃথিবী। এদের আস্ফালন সাময়িক সময়ের জন্য অনেক বড় মনে হলেও সঠিক সময়েই আল্লাহ তায়ালা তাদের পাকড়াও করেন।

তিনি বলছেন, এসব বোঝার জন্য বেশি দূরে যেতে হবে না, বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলেই দেখা যাবে যারাই সীমালঙ্ঘন করেছে এবং আলেমদের সাথে বিদ্বেষমূলক আচরণ করেছে তারাই পরবর্তীতে এর শাস্তি ভোগ করেছে।

আল্লাহ তায়ালা ইসলাম বিদ্বেষীদের ছাড় দিলেও কখনো ছেড়ে দেন না উল্লেখ্য করে এ ইসলামী রাজনীতিবিদ বলছেন, বর্তমান সময়ে আলেমদের অবশ্যই আদর্শ ঠিক রেখে ধৈর্য্য ও অবিচলতার পরিচয় দিতে হবে।

এছাড়া ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের কোন ব্যাপার থাকলে তা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বোঝাপোড়ার মাধ্যমেই সমাধানের পরামর্শ এই রাজনীতিবিদের।

আলেমদের ব্যক্তিগত কোন বিষয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমের মতো পাব্লিক প্লেসগুলো ব্যবহার করে সেখানে আলোচনা সমালোচনার বিষয়টিকে ডাকাতের কাছে অস্ত্র বিক্রির চোখে দেখছেন অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদ।

তার মতে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের বিষয়গুলো ওপেন করে দেওয়ার মাধ্যমে ইসলাম ও আলেমদের  বড় ধরণের আক্রমণের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে বিদ্বেষী মহল। তাই অবাধ তথ্য-প্রবাহের এই যুগে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের বিষয়গুলো পাব্লিক না করে ব্যক্তিগত বোঝাপোড়ার মাধ্যমেই সমাধানের পরামর্শ দিলেন মাওলানা ইউনুছ আহমাদ।

বর্তমানে মাহফিল বন্ধসহ আলেমদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের যেই অপসাংস্কৃতি শুরু হয়েছে তা বন্ধে সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছেন মাওলানা ইউনুছ আহমাদ।

তিনি বলছেন, দেশের মানুষের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম-সমাজের সাথে এমন বিদ্বেষমূলক আচরণ বন্ধ করতে না পারলে সরকারকে চরম খেসারত দিতে হবে। সমাজে সবথেকে বেশি সম্মানিত ও শ্রদ্ধাশীল আলেমদের লাগামহীন ভাষায় কথা বলার ব্যাপরটি যদি স্বাভাবিক হয়ে যায় তাহলে অন্যকোন সেক্টরের দায়িত্বশীলদের দেশের মানুষ আর সম্মান করবে না।  জাতি বেপরোয়া হয়ে উঠবে, সরকার প্রধানকেও হয়তোবা তখন সম্মান প্রদানের কথা ভাববে না আর কেউ। তাই বিদেশী শক্তিকে খুশি করতে ভবিষ্যতের ইতিহাসে মীর জাফর, জগৎশেঠদের জায়গায় নাম না লেখাতে আলেমদের ব্যাপারে কথা বলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিকদের লাগাম টানার পরামর্শ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুছ আহমাদের।

এদিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার শিক্ষাসচিব মুফতি আশরাফুজ্জামান বলছেন, নিছক ইসলামী বিষয়ে আলেমদের সাথে বৈরিতা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য যেন ধর্মের সাথেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যতা প্রদর্শন।  আর ধর্মের সাথে বৈরি আচরণকারীদের বিষয়ে ইসলামের বিধান ভয়াবহ। তাই আলেমদের সম্পর্কে মুখ খোলার সময় শুধু সতর্কতা নয় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বণের কোন বিকল্প নেই বলছেন শিক্ষাবিদ মুফতি আশরাফুজ্জামান।

শিক্ষাবিদ মুফতি আশরাফুজ্জামানের ভাষায়, কোন আলেমের সাথে জমি-জমা সংক্রান্ত ব্যক্তিগত বিরোধের ব্যাপার থাকলে তা ভিন্ন কথা। কিন্তু শুধুমাত্র ইসলামের বিধান জানানোর কারণে একজন আলেমকে কটাক্ষের পরিনাম কখনোই ভাল নয়। তাছাড়া ব্যক্তিগত বিরোধ থাকলেও তো ওরাসাতুল আম্বিয়া আলেমদের ব্যাপারে শব্দ চয়নে সতর্কতা চাই বলেছিলেন তিনি।

দেশের আলেম-সমাজ ও কওমী মাদরাসা কখনো সরকারের কাছে অনুদান প্রত্যাশী নয় এবং প্রতিষ্ঠান চালাতে কারো অনুগ্রহও কামনা করে না, তারপরেও আলেমদের নিয়ে একশ্রেণীর মানুষের এমন অবান্তর কথাবার্তা ইসলামের প্রতি তাদের এলার্জীরই প্রমাণ বহন করে বলছেন মুফতি আশরাফুজ্জামান।

বর্তমানে যারা আলেমদের সাথে এমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের আচরণ করছেন তা কি শুধুমাত্র দলীয় স্বার্থে?

এমন প্রশ্নের জবাবে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার শিক্ষাসচিব মুফতি আশরাফুজ্জামান বলছেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন দায়িত্বশীলরা নিছক দলীয় স্বার্থ বা ক্ষমতা রক্ষার জন্য আলেমদের সাথে বিরূপ আচরণ করছেন ব্যাপারটা আসলে এমন, বরং এটা তাদের ভেতরে লালন করা ইসলাম এবং আলেম বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।

তিনি বলছেন, রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে এবং ইতিপূর্বে দেশের ক্ষমতায় ছিলেন এমন দলগুলোরও এক হাত দেখে নিয়েছেন বর্তমান ক্ষমতাসীনরা। তাই আলেমদেরকে নিজেদের ক্ষমতার জন্য হুমকি ভেবে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বশীলের মুখে আলেম বিদ্বেষী কথা শোনা যাচ্ছে ব্যাপারটা এমন নয়।

বিদেশী চিহ্নিত কিছু চক্রকে খুশি করতে ও তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই কথিত প্রগতিশীল ও ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বশীলরা আলেমদের ব্যাপারে এমন বেপরোয়া ভাষা ব্যবহার করছেন; তবে তাদের এমন বেপরোয়া কথাবার্তা দেশ ও জাতির জন্য ভয়াবহ- বলছেন জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার শিক্ষাসচিব মুফতি আশরাফুজ্জামান।

-আরএম