স্কুলের সিলেবাসে ইসলাম ও নৈতিকশিক্ষা: দুটি কথা

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক ।।

ব্রিটিশ বেনিয়া শক্তি ভারতীয় মুসলমানদের যে চরম ক্ষতিগুলো করেছে তার মধ্যে অন্যতম এই যে, তারা মুসলিম তরুণদের চিন্তাচেতনায় ধর্মবিমুখতা ও ধর্মদ্রোহীতার বিজ বপন করেছে। তাদের চিন্তা-চেতনায় এই ধারণা বদ্ধমূল করে দিয়েছে যে, ইলমে দ্বীন ও জাগতিক বিদ্যার মধ্যে রয়েছে অলঙ্ঘনীয় বৈপরিত্য। ইলমে দ্বীন চর্চার অর্থই হল, জীবন ও জগত সম্পর্কে অজ্ঞতার শিকার হওয়া …! …! পক্ষান্তরে জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা সম্ভবই নয় যদি না বৈষয়িক ভাবনায় সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন থাকা হয় এবং আল্লাহকে ও তাঁর ইবাদত-বন্দেগী, ইতাআত ও আনুগত্য পরিহার করা হয়!!

মুসলিম উম্মাহর দুর্ভাগ্য যে, মানবতার দুশমন খোদাদ্রোহী এ সম্প্রদায় তাদের উদ্দেশ্য হাসিলে সফল হয়েছে। তারা জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য যা ছিল একটি প্রয়োজনীয় ও উপকারী বিষয় এমন পরিবেশ ও পাঠ্যক্রম উদ্ভাবন করেছে, যাতে আল্লাহর পরিচয় এবং তাঁর মর্যাদা ও মহববত অন্তরে সৃষ্টি হওয়ার কোনো অবকাশই থাকে না।

একই সঙ্গে বহু ক্ষতিকর বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি ঘটিয়ে বিষয়টাকে আরো জটিল করা হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় এমনসব উপাদান সন্নিবেশিত হয়েছে, যার দ্বারা মুসলমানের সন্তানেরা শুধু ইসলাম থেকেই দূরে সরে যায় না; বরং তারা ধর্মদ্রোহীতা ও চারিত্রিক অবক্ষয়ের শিকার হয়ে যায়।

ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা ইংরেজদেরকে এ অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করেছি, কিন্তু ইংরেজ দাসত্ব থেকে এখনও আমরা মুক্ত হতে পারিনি।

আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো আমরা তাদের অন্ধ আনুগত্য বজায় রেখেছি।

আমাদের শিক্ষাসিলেবাসে ‘ইসলাম শিক্ষা’ নামে সাতটি বই রয়েছে, নবম ও দশম শ্রেণীর জন্য একটি বই রাখা হয়েছে। বেশ কিছু দিন ধরেই আমার ইচ্ছা ছিল যে, এই বইগুলোর ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার। কোনো কথা সংশোধনের প্রয়োজন হলে সে ব্যাপারে সতর্ক করার। এদিকে কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু বর্তমান সিলেবাসের এ সাতটি বইয়ের কপি পাঠিয়ে দেন এবং কাজটির জন্য বিশেষভাবে তাকিদ দেন। এ উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে আমি প্রথমে বইগুলোতে একবার চোখ বুলাই। তাতে এমন কিছু ভালো বিষয় নযরে এসেছে যা প্রকৃত পক্ষেই প্রশংসাযোগ্য। পাশাপাশি এমন কিছু বিষয় নযরে এসেছে যেগুলো সংশোধন করা একান্ত জরুরি। নিম্নে এ ব্যাপারে কিছু মৌলিক কথা বলা হল :

১. এ বইগুলোতে দ্বীনের ফরযে আইন বিষয়গুলো পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এমনকি দশম শ্রেণীতেও না।

২. এ বইগুলো পড়ার পর একজন শিক্ষার্থীর দ্বীনে ইসলাম সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও সহীহ ধারণা কখনোই হবে না।

৩. আশ্চর্যের বিষয় এই যে, দ্বীনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক কথাও তাতে আসেনি। ঈমানের কালেমারও কোনো সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা এখানে নেই। সর্বশেষ বইতেও তাওহীদ ও শিরক এবং সুন্নত ও বিদআতের স্পষ্ট কোনো পরিচয় দেওয়া হয়নি। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন ও শরীয়ত যার নিজস্ব তাহযীব তথা সংস্কৃতি রয়েছে। অথচ এ সম্পর্কে কোনো আলোচনা এখানে নেই। ঈমানের শাখা-প্রশাখা এবং কবীরা ও সগীরা গুনাহের কোনো তালিকাও এখানে দেওয়া হয়নি।

এছাড়া যা কিছু লেখা হয়েছে সেগুলো সহীহভাবে লেখার যথাযথ ইহতিমাম করা হয়নি। কোনো হাদীস সর্ম্পূণ সূত্রবিহীন হওয়ার পরও লেখা হয়েছে। দ্বীনী পরিভাষাসমূহের সংজ্ঞা প্রদানের ক্ষেত্রে বহু ভুল হয়েছে। কোনো কোনো বুনিয়াদী বিষয়ের পরিচয় খুবই ত্রুটিপূর্ণভাবে বা ভুলভাবে করা হয়েছে। যেমন সুদ ও ঘুষের পরিচয়ের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে।

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ‘ইবাদত’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা মূলত ‘ইতাআত’-এর সংজ্ঞা। ‘ইবাদত’ যা একটি কুরআনী পরিভাষা, তার কোনো শরয়ী পারিভাষিক সংজ্ঞা কোথাও দেওয়া হয়নি। এরকম আরো ছোট বড় ভুলত্রুটি রয়ে গেছে।

এ সমস্যার কারণে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার দ্বীনিয়াত সংক্রান্ত সিলেবাসের বর্তমান এবং পূর্ববর্তী বইগুলো (যা যোগাড় করা সম্ভব হয়) শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গভীরভাবে অধ্যয়ন এবং সব ধরনের ভুল চিহ্নিত করে সেগুলো সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সাথে সাথে এই বিষয়কে সফল ও মানোত্তীর্ণ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তাবনা পেশ করা প্রয়োজন। যেন ভবিষ্যতে এ বিষয়টি ত্রুটিমুক্ত হতে পারে এবং স্বীয় উদ্দেশ্যে সফল হতে পারে। আর ইতোপূর্বে যে সকল শিক্ষার্থী ঐ বইগুলোর ভুল থেকে প্রভাবিত হয়েছেন তারাও যেন সহীহ দিক-নির্দেশনা লাভ করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা এই নেক কাজকে কবুল করুন এবং ইখলাস ও ইতকানের সাথে এই দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়ার তাওফীক দান করুন। (প্রবন্ধটি আরো বিস্তারিত পড়ৃন মাসিক আল কাউসার থেকে)

সৌজন্যে: মাসিক আল কাউসার, সংখ্যা- জুন ২০০৯, সংক্ষেপিত

ইজে